হ ত ভা গা র চি ঠি ১৭

নতুন রেসিপির অপেক্ষায় মানুষ

শামীমুল হক | মতামত
মার্চ ১৫, ২০২৫
নতুন রেসিপির অপেক্ষায় মানুষ

প্রিয় হাসু আপা, আপনাকে নিয়ে কতো যে আলোচনা বাংলাদেশে তা যদি নিজ কানে শুনতেন কি প্রতিক্রিয়া দেখাতেন তা দেশবাসী ভালো করে জানেন। কারণ প্রায় ষোল বছরে আপনি আপনার ক্রোধ, হিংসা আর লালসার আগুনে দেশকে পুড়ে ছাই করে গেছেন। ফোকলা দেশটা এখন টেনে নিচ্ছেন দায়িত্বশীলরা। তারপরও ক্ষান্ত হননি আপনি এবং আপনার দলের নেতাকর্মীরা। তারা এখনো হুমকি দেয়- যে রাজধানীতে দিনের বেলা আমরা ঘুরতে পারবো না, সেখানে রাতের বেলা মানুষকে ঘুমাতে দেবো না। এটাই কি আপনার দেশের প্রতি ভালোবাসা। আপনার নেতাকর্মীদের দেশের প্রতি ভালোবাসা। দুঃখজনক হলো দেশের মানুষ ২০০৮ সালে আপনাকে বড় আপন করে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কারণ আপনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন দেশের মানুষকে। কিন্তু এ স্বপ্নের কথা যে, আপনার অন্তরের না সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু কি করার! দেশের মানুষ যে বড়ই দুর্বল। তারা কার কাছে যাবে? সারা দেশটাকেই তো বানিয়ে ফেলেছিলেন এক অগ্নিকুণ্ডে। ওদিকে আপনার প্রতিপক্ষ বিএনপি বড় বোকা। ওরা আপনার মতো চাপা মারতে পারে না। ওরা সরকারে থাকাকালীন সারা দেশে বোমা বিস্ফোরণ হলো। আপনি চাপা মেরে ওদের ওপর দোষ চাপালেন। রমনা বটমূলে বোমা হামলা হলো সেখানেও তাই করলেন। এমন সব ঘটনা ওদের ওপর চাপিয়ে দিলেন চাপার জোড়ে। আবার ওরা বিরোধী দলে থাকাকালে বাসে, গাড়িতে আগুনের দায়ও ওদের উপর চাপালেন। ওরা আপনার চাপার জোরে হেরে যায়। উত্তরটাও ভালো করে দিতে পারে না। যাকগে সেসব কথা। এগুলো সব রাজনৈতিক কৌশল। রাজনীতিতে কৌশলের খেলা চলে। এ কৌশলের খেলায় আপনি এবং আপনার দল এগিয়ে ছিলেন বহুগুণ। এতে আপনার দল একশ’তে একশ’ নাম্বার পেয়ে গেছে। 


আপা, আপাগো, রমজান চলে যাচ্ছে। কিন্তু একটা জিনিস খুব মিস করছি। আপনার রেসিপি। আপনি মাংসের বদলে কাঁঠালের যে রেসিপি দিয়েছিলেন তা আজও মানুষ ভুলতে পারে না। পিয়াজ ছাড়া রান্নার রেসিপিও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বেগুনের বদলে মিষ্টি কুমড়ার বেগুনি খাওয়ার রেসিপি নিজেও খেতেন বলে জানিয়েছিলেন। মাছের কাঁটা খাওয়ার যে রেসিপি দিয়েছিলেন তা বড্ড চমৎকার। এ কাঁটা শিশুদেরও খাওয়াতে বলেছিলেন। একটু শুনে আসি আপা আপনার জবানিতে এসব রেসিপির কথা- পিয়াজের দাম যখন আড়াইশ’ টাকা কেজি তখন আপনি এক নতুন রেসিপি নিয়ে আসেন জাতির সামনে। সেদিন বলেছিলেন আমরা কিন্তু পিয়াজ ছাড়াও রান্না করে খেতে পারি।  অনেক তরকারি আছে যা পিয়াজ ছাড়াই করা যায়। বেগুনের ব্যাপারে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বেগুন দিয়ে বেগুনি না খেয়ে আরও সহজলভ্য জিনিস তা দিয়ে বেগুনি খেলেই হয়। আমরা তা-ই খাই। মিষ্টিকুমড়া দিয়েও বেগুনি বানানো যায়। সেভাবে আমরা করি। সেভাবেও করা যায়। আবার বলেছিলেন অনেকেই কিন্তু মাংস খেতে চায় না। মাংসের পরিবর্তে এখন কাঁঠাল। এই কাচা কাঁঠালের কাবাব হয়, কাঁঠালের বার্গার হয়। আমরা মাংসের পরিবর্তে কাঁঠাল বারো মাসই খেতে পারি। এখনো কিন্তু করি আমাদের বাড়িতে। কাঁঠালের কাবাব করি। ওই কাঁঠালটা দিয়ে শামী কাবাব বানানো বা বার্গার বানানো এসবই করি। এটা কীভাবে করতে হয়- যখন কাঁঠালের সিজন আসে তখন কাঁচা কাঁঠাল কেটে একটু হলুদ দিয়ে সিদ্ধ করে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়ে বারো মাস ব্যবহার করি। কাজেই একটা জিনিস যেটা জাতীয় ফল হিসেবে জাতির পিতা দিয়ে গেছেন তা আমরা মাংসের পরিবর্তে ব্যবহার করতে পারি। কাঁচা মরিচ নিয়েও কিন্তু আপা আপনি সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন। বর্ষাকালে কাঁচা মরিচ হয় না। তখন কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে যায়। তাই আপনি বলেছিলেন-এখন থেকে কম দামের সময়ে কাঁচা মরিচ কিনে রোদে শুকিয়ে নেবেন। যখন দাম বাড়বে এ কাঁচা মরিচ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে তা কাঁচা হয়ে যায়। তা সুন্দর করে খাওয়া যায়। সহজ বুদ্ধি। টমেটোও এভাবে রেখে দেন। ডিমের ক্ষেত্রেও দিয়েছিলেন দেশবাসীকে জ্ঞানগর্ভ বুদ্ধি। ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে দেন। যখন দাম বাড়বে তখন তা খাবেন। এ ডিম রান্না করার সময় আরামে রান্না করে খাওয়া যায়। ভর্তা করেও খাওয়া যায়। সব কিছুর বিকল্প ব্যবস্থা আছে। আমরা রাখি, খাই বলে বলি আর কি। আবার এও বলেছিলেন- এগুলো সব নিজে থেকে শেখা। মাছের কাঁটা খাওয়ার ব্যাপারে যে রেসিপি দিয়েছেন তা শুনে তো দেশবাসী অবাক। আপনি বলেছিলেন-আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। এই মাছে- ভাতে বাঙালি হিসেবেই যেন থাকতে পারি। আর এখন মাছের কাঁটা একটা সমস্যা। অনেকে মাছ খেতে চায় না। প্রক্রিয়াজাত করতে কিন্তু এই কাঁটাও কিন্তু নরম করে ফেলা যায়। এবং খাওয়া যায়। সেটা বেশি কঠিন নয়। আপনারা যদি প্রেসার কুকারে মাছ একঘণ্টা দশ মিনিট সিদ্ধ করেন মাছের কাঁটা নরম হয়ে যায়। মাছ মাছের মতোই থাকবে এবং কাঁটা নরম হয়ে যাবে। আপনারা সেই নরম কাঁটা বাচ্চাদেরও খাওয়াতে পারবেন। কোনো অসুবিধা হয় না। আমরা কিন্তু এটা করি। বিশেষ করে ইলিশ মাছ একটু বেশি সময় লাগে। অন্য মাছ একটু কম সময় হয়ে যায়। 


আপা, আপনার এ রেসিপির কথা শুনে আপনার কোনো কোনো মন্ত্রীও কিন্তু আমজনতাকে জ্ঞান দিতে শুরু করে। আপনার এক মন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন ইফতারে আঙুর লাগবে কেন? আপেল লাগবে কেন? বড়ই দিয়ে ইফতার করা যায় না। আমাদের দেশি ফল দিয়ে ইফতার করা যায় না। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন আপনার সহযাত্রী হাসানুল হক ইনু। যাই হোক সব মিলিয়ে আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন- আমরা বেহেশতে আছি। সত্যিই আপা, আমরা আপনার আমলে বেহেশতে ছিলাম। দিন-রাত আতঙ্কে ছিলাম। পুলিশ প্রশাসনের আতঙ্ক। গুম হওয়ার আতঙ্ক। খুন হওয়ার আতঙ্ক। সন্তান বাইরে গেলে ঘরে ফিরে আসবে কিনা সে আতঙ্ক। আতঙ্ক আর আতঙ্ক। বিরোধী দল দমনে আপনি যে কৌশল নিয়েছিলেন তা ছিল অতুলনীয়। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই এমনভাবে বিরোধী দলকে দমাতে পারেনি। গুমও করতেন প্রকাশ্যে। মানুষের সামনে। পরে থানা, পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি, গোয়েন্দা সংস্থা সবাই অস্বীকার করতো। এমন কৌশল কীভাবে আয়ত্তে আনলেন আপা। আর কতো কৌশলের কথা বলবো বলুন। কোনো ঘটনা ঘটলেই আপনি নিজ মুখে বলে দিতেন এগুলো জামায়াত-বিএনপি’র কাজ। তদন্ত হওয়ার আগেই আপনার এ বক্তব্য তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করতো। তারাও সেভাবেই এগিয়ে যেতো। চার্জশিট দিতো। আপা, আপনি দেশের মানুষের হতে পারেননি। আপনি আপনার দলের হতে পারেননি। দলের নেতা যদি হতেন এভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের না জানিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতেন না। তাদের অন্তত জানিয়ে যেতেন। আপনার এই একটি কারণে আপনার অনেক ত্যাগী নেতা এখন আপনাকে মন্দ বলে। ঘৃণা করে। এমনকি অনেকে আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। প্রকাশ্যে আদালতে আপনার মন্ত্রিসভার সদস্য একাধিকবারের এমপি কামাল মজুমদার জীবনে আর আওয়ামী লীগ না করার কথা বলেছেন। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। আপা, আপনি দেশের বারোটা বাজিয়ে গেছেন। এ দেশকে ৫০ বছর পেছনে নিয়ে গেছেন। পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড ওলটপালট করে দিয়ে গেছেন। এখন দেশের প্রশাসনে যেন কেউ কার কথা  শুনছে না। আপনি সত্যিই এক খেলোয়াড়। আসল খেলা খেলে আপনি পালিয়েছেন। এখন দেশে না আসলেও কিছু যায় আসে না। ভিন দেশে বসে উস্কালেই হবে। যেটা আগুনে ঘি ঢালার মতো হবে। 


প্রিয় হাসু আপা, আপনি ঘি ঢালতে থাকুন। আর আমরাও দেখতে থাকি। দেশ কোন দিকে যায়। ফোকলা করে যাওয়া দেশটাকে নিয়ে বর্তমানরা কতোটা এগুতে পারে। যদিও আপনি দূর থেকে অপেক্ষায় আছেন দেশের অমঙ্গলের। এটা আপনার ফাঁস হওয়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও বলবো, এখনো সময় আছে-একটু ভাবুন। ঘুমিয়ে চিন্তা করুন। আপনি দেশের কতোটা মঙ্গল করে গেছেন। কতোটা ভালো করে গেছেন। এটা যত দিন অনুধাবন করতে পারবেন না ততদিন আপনি শুদ্ধ হতে পারবেন না। ভালো থাকুন দূর দেশে। এ প্রত্যাশায় আজ শেষ করছি। খোদা হাফেজ। 

মতামত'র অন্যান্য খবর