দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া উচিত। এ দাবি করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিবও। দলটির সংসদীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের দুইদিন পর গুলশানের নির্বাচনী কার্যালয়ে দ্য ওয়্যার’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে কবির বলেন, পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি। সিলেটের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বৃটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তিনি বরিস জনসন ও ঋষি সুনাকের সময়ে বৃটেনের কেবিনেট অফিসে কাজ করেছেন এবং ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে লন্ডন থেকে বিএনপি’র আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পরিচালনা করেছেন। তিনি স্বীকার করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। তার মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ১৫ বছর ধরে ভারতের সম্পর্ক ছিল একচেটিয়াভাবে হাসিনার সঙ্গে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে নয়। নিচে সাক্ষাৎকারটি পরিষ্কার বোঝার স্বার্থে হুবহু অনুবাদ দেয়া হলো-
প্রশ্ন: শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার কারণে ভারত নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। এই পরিস্থিতি কি নতুন সরকারের জন্য দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? সম্পর্ক পুনর্গঠনে কি ভারতের প্রথম পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
হুমায়ুন কবির: হ্যাঁ, বিষয়টি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের ১৫ বছরে ভারতের সম্পর্ক ছিল একচেটিয়াভাবে হাসিনার সঙ্গে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে নয়। ফলে ভারতের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ দেখেছে, শেখ হাসিনা সবসময় ভারতের নাম ব্যবহার করে নিজেকে রক্ষা করতেন। এর ফলে ভারতের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে। এখন ভারতের উচিত প্রথম পদক্ষেপ নেয়া এবং স্বীকার করা যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশের ক্ষমতায় নেই। তাদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যাতে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী বা অস্থিতিশীল কার্যক্রম চালাতে না পারে। শেখ হাসিনা একজন সন্ত্রাসী। হাজারো মানুষ হত্যার পর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে অপরাধমূলক ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তার সঙ্গে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীও সেখানে রয়েছেন। তাদের এমন কিছু করতে দেয়া উচিত নয় যা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। ভারত যদি সম্পর্ক পুনর্গঠনের মানসিকতা রাখে, তাহলে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সম্ভব।
প্রশ্ন: শেখ হাসিনা যদি ভারত থেকে বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রাখেন, তাহলে কি তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে?
কবির: এটি ভারতের সিদ্ধান্ত। ভারত ইতিমধ্যে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। তিনি বাংলাদেশের আদালতে অভিযুক্ত। একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডও হয়েছে। তিনি কতো মানুষ হত্যা করেছেন এবং কতো অর্থ লুট করেছেন- তা বিবেচনা করা উচিত। ভারতকে এমনভাবে দেখা উচিত নয় যে তারা একজন সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে আশ্রয় দিয়ে প্রতিবেশী দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দিচ্ছে।
প্রশ্ন: সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য ভারতের কাছ থেকে কি ধরনের পদক্ষেপ দেখতে চান?
কবির: ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। জনগণের আস্থা স্বীকার করা একটি ভালো পদক্ষেপ। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ। এমন ছোট ছোট পদক্ষেপ সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সংযম বজায় রাখা গেলে জনমতের পরিবর্তনও সম্ভব।
প্রশ্ন: শেখ হাসিনা ইস্যুকে ‘স্থগিত’ রেখে কি দুই দেশ অন্য খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে পারে?
কবির: শেখ হাসিনার অপরাধের বিচার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা করবে। তাকে ফেরত আনার দাবি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলবে। তবে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য নতুনভাবে শুরু করা দরকার- নতুন পৃষ্ঠা, নতুন সূচনা দরকার।
প্রশ্ন: পানি বণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যু কীভাবে সমাধান করবেন?
কবির: আমাদের মধ্যে বহু অমীমাংসিত বিষয় আছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে এক বিলিয়নের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। আমাদের সামনে তাকাতে হবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সামাজিক সহযোগিতায় বাস্তববাদী সমাধান খুঁজতে হবে।
প্রশ্ন: নির্বাচনী প্রচারণায় আপনাদের বিরুদ্ধে ভারতঘেঁষা হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কি বলবেন?
কবির: এগুলো নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। ভারতে নির্বাচন হলে যেমন পশ্চিমবঙ্গ বা আসাম ইস্যু ওঠে, তেমনি কিছু উগ্র উপাদান মুসলিম বা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কথা বলে। এগুলো নির্বাচনী কৌশল। বিএনপি কখনো দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেবে না।
প্রশ্ন: অতীতে বিরোধী দলে থাকাকালে কি দিল্লির সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?
কবির: সরাসরি সরকারি পর্যায়ে নয়। তবে বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আমরা তখনই বলেছিলাম, এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে সম্পর্ক গড়া ঠিক নয়।
প্রশ্ন: গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে আপনার বক্তব্য?
কবির: দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলছে। পাকিস্তানে এর প্রভাব রয়েছে। ভারতে একই প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশেও সে দিকে যাচ্ছিলো। আমাদের এটি বন্ধ করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার।
প্রশ্ন: ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ নিয়ে কিছু বলবেন?
কবির: আমি সেই ফোনালাপে উপস্থিত ছিলাম। এটি ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ। তিনি বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতে সফরের আমন্ত্রণ জানান। রমজানের শুভেচ্ছাও জানান।
প্রশ্ন: তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোথায় হবে?
কবির: এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আঞ্চলিক পরিসর আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: সার্ক ও বিমসটেক নিয়ে আপনার অবস্থান?
কবির: আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতায় আগ্রহী। সার্ক পুনরুজ্জীবন এবং বিমসটেক সক্রিয় করার বিষয়ে আমরা ইতিবাচক।
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা সংকট?
কবির: এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার শীর্ষ অগ্রাধিকার। শক্তিশালী জনমতের ভিত্তিতে আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করতে পারবো।
প্রশ্ন: ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখবেন?
কবির: কে কাকে পছন্দ করে, সেটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা আমাদের উন্নয়ন করবো। ভারতের, আমেরিকার বা চীনের ইচ্ছার কারণে আমরা উন্নয়ন থামাবো না।