প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ইতিহাসের গুণগত উত্তরণ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন অসম্ভব

কাজল ঘোষ | সাক্ষাৎকার
আগস্ট ১, ২০২৬
ইতিহাসের গুণগত উত্তরণ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন অসম্ভব

নূরুল কবীর। গণমাধ্যমের লড়াকু এক কর্মী। নিকট অতীতে দেশের পটপরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলে নিজস্ব চিন্তা ও বিবেক নিয়ে লড়েছেন। তিনি অকুতোভয় এক যোদ্ধা। অন্তর্বর্তী জমানায় ড. ইউনূসকে ক্ষুরধার প্রশ্ন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। একই জমানায় ডেইলি স্টার ভবনে দুর্বৃত্তদের আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জীবন-ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সুশাসন, মত প্রকাশের অধিকার আদায়, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নব্বইয়ের স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন, ওয়ান ইলেভেনের পর গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার নূরুল কবীর চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধেও ছিলেন প্রতিবাদী। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি দৈনিক নিউএজ-এর সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নেতৃত্ব দিচ্ছেন সম্পাদক পরিষদেরও। ‘জনতার চোখ’কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণে দেখেছেন জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী দু’বছর। বিস্তারিত নিম্নে- 
 

প্রশ্ন: জুলাই শিক্ষার্থী-গণ-অভ্যুত্থানের দু’বছর পূর্ণ হলো। কেউ কেউ বলছেন অভ্যুত্থান ফলপ্রসূ হয়েছে, কেউ বলছেন হয়নি। আপনার মতামত কি?
 

উত্তর: জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ যেকোনো দেশের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সকল গণজাগরণ বা অভ্যুত্থান অভিন্ন মাত্রায় ফলপ্রসূ হয় না, কম-বেশি হয়। কোনো গণ-অভ্যুত্থান কি মাত্রায় ফলপ্রসূ হবে তা নির্ভর করে কখন, কেন এবং কাদের। কোন শ্রেণির নেতৃত্বে সেই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। চব্বিশের শিক্ষার্থী-গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক লীগ সরকারের পতন ও লীগ নেতৃত্বের পলায়নের ভেতর দিয়ে অভ্যুত্থানের আশু লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী রক্তাক্ত আন্দোলন বিস্তারের সময়কালে, শিক্ষার্থী-গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হওয়ার ঐতিহাসিক পরিক্রমায় অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনতার সংগ্রামী চৈতন্যের দ্রুত বিকাশের পটভূমিতে, 

সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসা সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হয়নি।
 

সরকারি চাকরির পুরনো বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার যুক্তিসঙ্গত পুনর্বিন্যাসের দাবিতে অগ্রসরমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে দমনের জন্য ২০২৪-এর মধ্য জুলাইতে লীগ সরকার যখন ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ সশস্ত্র হামলার পথ বেছে নেয়, ১৬ই জুলাই যখন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রতিবাদী শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পরিষ্কার লক্ষ্য করে, স্বল্প দূরত্ব থেকে গুলি করে হত্যা করে, ঠিক তখন থেকেই সীমিত পরিসরের শিক্ষার্থী আন্দোলনটি গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে শুরু করে- কোটা-ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি পেরিয়ে লীগের পতনের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। প্রতিদিন পুলিশের গুলিতে প্রতিবাদী তরুণদের লাশ পড়তে শুরু করলে, প্রতিবাদী মিছিলে সমাজের অপরাপর অংশের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে, মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, ব্যাপক হারে নারীরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন, আর সেই সঙ্গে লীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের দাবি জোরদার হতে থাকে। অচিরেই গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। 
আর, এ সময় থেকে মিছিলে মিছিলে সয়লাব ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান নগরীর দেয়ালগুলো নতুন নতুন স্লোগান আর গ্রাফিতে ভরে উঠে; নতুন নতুন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড আর ফেস্টুন আবির্ভূত হয়, রচিত হতে থাকে নতুন নতুন কবিতা ও গান, আর এইসব সংগ্রামী রক্তস্নাত স্লোগান, গ্রাফিতি, কবিতা ও গানের ভেতর দিয়ে অভিব্যক্ত হয় এক নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা- যেখানে লীগ শাসনের অবসানের মধ্যদিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতর স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি ও দুর্নীতিপরায়ণ অর্থনীতির পুনরাবির্ভাবের শর্তগুলোও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
 

গণ-অভ্যুত্থানের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে মাথা নুইয়ে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট, লীগ নেতৃত্ব ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। লীগ শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে লীগের প্রতি রাজনৈতিকভাবে অনুগত নানা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরভক্ত ব্যক্তিবর্গের খুন-গুমের অবসান ঘটে, অর্থনৈতিক লুটপাটের মাধ্যমে জনগণের সম্পদ আত্মসাতের প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়ায়, সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ও দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়, বিচার বিভাগের ওপর রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয় এবং অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পরিচালিত জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিবর্গের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এগুলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আশু লক্ষ্য পূরণেরই পরিচায়ক। কিন্তু, আগেই বলেছি, গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে সঞ্চারিত নতুন রাজনৈতিক চেতনাসঞ্জাত আকাঙ্ক্ষা, বিশেষত পুরনো ঔপনিবেশিক আইন-কানুনসহ নিপীড়নমূলক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ও বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থেকে যায়। ফলে, পুরনো সব শোষণ-নিপীড়ন পুনরার্বিভাবের সম্ভাবনাও বিদ্যমান থাকে। রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর নিরন্তর চাপ জারি রাখার মাধ্যমেই কেবল সেই অশুভ সম্ভাবনা রুখে দেয়া সম্ভব। কিন্তু আমাদের ইতিহাসের গুণগত উত্তরণ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন অসম্ভব।
 

প্রশ্ন: ইতিহাসের এই গুণগত উত্তরণের পথ কি? এবার তা হলো না কেন?
 

উত্তর: দেখুন, কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস যখন নড়ে উঠে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য আড়মোড় ভাঙে, তখন সমাজের কোনো অংশের ‘স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষার’ ধার ধেড়ে অগ্রসর হয় না, নিজের মত এগুতে থাকে; কিন্তু এগিয়ে গিয়ে কোন পথে আর কোন লক্ষ্যে অগ্রসর হবে, তা নির্ভর করে সমাজের কোন অংশ ‘সচেতনভাবে’ ইতিহাসের পথনির্দেশ করে, তার ওপর। কোনো লড়াকু সংগ্রামের গণ-আন্দোলনে পরিণত হওয়া, আবার সেই গণ-আন্দোলনের গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণের ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সক্রিয় থাকে, কিন্তু জনগণের সেই ‘স্বতঃস্ফূর্ত ঐক্যবদ্ধতার’ ধাক্কায় চলমান ইতিহাস কোনদিকে অগ্রসর হবে, আর কোথায় গিয়েই বা থমকে দাঁড়াবে, আগেই বলেছি, তা আন্দোলনে শক্তিসমূহের ‘সচেতন’ আকাঙ্ক্ষা, শক্তি ও দিকনির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। 
 

বিগত গণ-অভ্যুত্থানে সমাজের যে সব রাজনৈতিক পক্ষ অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে ইতিহাসের গুণগত উত্তরণপ্রয়াসী বামপন্থি প্রগতিশীল অংশ সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে ছিল সবচেয়ে দুর্বল, তাছাড়া ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত তাত্ত্বিক সামর্থ্যও তাদের ছিল না। স্বভাবতই, গণ-অভ্যুত্থানের গতিপথ নির্ণয়ে তাদের কোনো নির্ধারক ভূমিকা ছিল না। ফলে, এই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আমাদের ইতিহাস যাবতীয় শোষণ-নিপীড়নমূলক আইনকানুন ও প্রতিষ্ঠান সহ বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে জনস্বার্থপরায়ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি।
 

অন্যদিকে, যে তরুণ শিক্ষার্থীগণ অসমসাহসিকতার সঙ্গে এই আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব যুগিয়েছেন, তারা কোনো সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত ছিলেন না, তারা কেউ বাম, মধ্য বা ডানপন্থি ভাবাদর্শের অনুগামী ছিলেন। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন অতি দ্রুতগতিতে অগ্রসর হওয়ার ফলে, এবং ভীষণ নিপীড়নমূলক পরিস্থিতিতে তাদের নেতৃত্ব দেয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে, আন্দোলনকে ঠিক কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালনা করবেন, সংঘবদ্ধভাবে তা বিচার-বিবেচনা করার সুযোগও তাদের ছিল না। ফলে, আন্দোলন এগিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে- সচেতনভাবে আন্দোলনের গতিমুখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। সর্বোপরি, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের ও পরিস্থিতির ওপর তাদের প্রভাব থাকলেও, সমন্বিত রাজনৈতিক ভাবাদর্শিক অবস্থানের অভাবে, তাদের চিন্তা রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার’ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে- বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাময় দিগন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। অভ্যুত্থানের মুখে লীগ-শাসনের অবসানের ছয় মাস পর এই তরুণরা যখন একটি প্রচলিত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক মঞ্চে সমবেত হন, জাতীয় নাগরিক পার্টি নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন, তখনো, এমনকি এখনো পর্যন্ত, তারা তাদের রাজনৈতিক-ভাবাদর্শিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন নি- তাদের দলের কোনো ‘ঘোষণাপত্র’ না থাকাটাই তার অকাট্য প্রমাণ। সর্বোপরি, নির্বাচনের প্রাক্কালে মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী দল ও ডানপন্থি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক দরকষাকষি এবং শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপনের মধ্যদিয়ে ধর্মাশ্রয়ী ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি তাদের সুবিধাবাদী দুর্বলতার অভিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই ডানপন্থির রাজনীতির অন্তর্নিহিত ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা কখনই কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রয়াসী চিন্তা ও তৎপরতার সহগামী হতে পারে না।
 

ওদিকে, জাতীয়তাবাদী দল, যে নিজেকে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করে, গণ-অভ্যুত্থানে তার ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনৈতিক বর্তমান জমানায় মধ্যপন্থি দলগুলোর ডানপন্থার প্রতি খানিকটা অনুরক্ত থাকার ঝোঁক থাকে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাছাড়া, সবাই নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, অন্তর্গতভাবেই রক্ষণশীল এই জাতীয়তাবাদী দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘সংস্কার’ নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সর্বদা ‘সচেতন থেকেছে, যাতে ওই নীতিমালা তাদের সংকীর্ণ দলীয় সংস্কার কর্মসূচির সীমা অতিক্রম না করে। যেখানেই সংস্কার প্রস্তাবনা তাদের দলীয় নীতির সীমা অতিক্রম করেছে, সেখানেই তারা ‘লিখিত আপত্তি’ প্রদান করে রেখেছেন। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির যথাযথ গণতান্ত্রিক বিকাশে জাতীয়তাবাদী দলের এই রক্ষণশীল বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাধা হিসেবে এখনো সক্রিয় রয়েছে।
 

আবার লীগবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে প্রক্রিয়ায়, আকারে ছোট হলেও, সবচেয়ে সংঘবদ্ধ রাজনীতি-সচেতনতা নিয়ে সক্রিয় ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থি সংগঠন- জামায়াতে ইসলামী। গণ-অভ্যুত্থানের গোটা প্রক্রিয়ায়, এমনকি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও, সুসংগঠিত জামায়াত অত্যন্ত সচেতনভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতর তার দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়ে কায়েম রাখতে সমর্থ হয়েছিল। এই প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ এখনো অনেকটাই বহাল রয়েছে। ওদিকে, ডানপন্থির প্রতি ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থা জাতীয়তাবাদী দলের পূর্বোল্লিখিত অন্তর্নিহিত দুর্বলতাই এইসব পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয়তা জারি রাখতে সহযোগিতা করে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের সমাজে সংঘটিত নানা প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডের পেছনে জামায়াতি তৎপরতা এখনো সক্রিয় রয়েছে।
 

এমতাবস্থায়, এইসব যাবতীয় বাধাবিপত্তি ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সমাজে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির পর্যাপ্ত বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো, শাসক শ্রেণির একাধিক দলের অধীনে খাড়াখাড়িভাবে বিভক্ত বিদ্যমান গোটা সমাজকে শাসক ও শাসিতে, শোষক ও শোষিত, গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শক্তিতে সমান্তরালভাবে মেরুকৃত করার সচেতন রাজনীতি বিকশিত করার মাধ্যমে, শত্রু-মিত্রের পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে, নতুন ভাব সংঘটিত লড়াকু সংগ্রামের বিজয়ের মাধ্যমেই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের যথাযথ গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব হয়ে উঠবে।
 

প্রশ্ন: আপনি কি ধরনের ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতার কথা বলছেন?
 

উত্তর: আপনার নিশ্চয় মনে আছে যে, গণ-অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ায় তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর উপস্থিতি ছিল, জনগণের ভেতর থেকেও অসংখ্য নারী প্রতিবাদ মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানপরবর্তী কালে জামায়াতসহ অপরাপর কিছু ডানপন্থি সংগঠনের নারী-বিদ্বেষী আচরণ ও বক্তৃতাবাজির কারণে রাজনীতিতে এই সংগ্রামী নারীদের প্রান্তিকীকরণ ঘটে। আবার, নারীর গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ব্যাপারে তাদের প্রকাশ্য নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতা, এমনকি ডানপন্থি তরুণদের নারী স্বাধীনতাবিরোধী দঙ্গলবাজির কারণে, সমাজে নারীর মুক্ত চলাচলের ব্যাপারেও এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অবাধ প্রচারণা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উপাসনালয়ে আক্রমণ, গণতান্ত্রিক চিন্তা ও ভাবাদর্শের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাদের ধর্মাশ্রয়ী-রাজনীতিভিত্তিক একরৈখিক চিন্তা প্রতিষ্ঠার আগ্রাসী মনোভাব, মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেয়া, জুলাইয়ের নারী যোদ্ধাদের প্রতীকী ভাস্কর্য ঢেকে দিয়ে কালিমা লিপ্ত করা, ভিন্নমতাবলম্বী বামপন্থি প্রগতিশীল রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির বিরুদ্ধে অশ্লীল ভাষায় কুৎসা প্রচার, মাজারপন্থি ও বাউলদের ওপর হামলা, প্রভৃতি সমাজে বিপজ্জনক ডানপন্থার আগ্রাসী উত্থানের পরিচায়ক। এইসব পশ্চাৎপদ প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংঘটিত করা, সমাজ ও রাষ্ট্রের যথার্থ গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য, এক অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে।
 

প্রশ্ন: অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
 

উত্তর: গণতন্ত্র প্রয়াসী গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে, অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের সম্মতি এবং প্রধানত জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতের সক্রিয় সহযোগিতায়, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মোহম্মদ ইউনূস তার অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন- যা প্রায় ১৮ মাস রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। অধ্যাপক ইউনূস নিজে একজন রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন দল নিরপেক্ষ ব্যক্তি, আর কয়েকজন অরাজনৈতিক, এমনকি রাজনীতিবিরোধী ব্যক্তি, জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতের সমর্থক ব্যক্তিবর্গ এবং দু’-একজন প্রাক্তন বামপন্থি ব্যক্তি- যারা তাদের পুরনো রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে বহু পূর্বেই সরে এসেছেন, তাদের নিয়ে তিনি তার সরকার গঠন করেছিলেন। স্বভাবতই, এই সরকারের নিজস্ব কোনো সমন্বিত রাজনৈতিক-ভাবাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না, ছিল না রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাও। এই রকম একটি সরকারের নেতৃত্বে সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর আশা করা রীতিমতো বোকামি। তথাপি, ইউনূসের সরকার রাষ্ট্রের খানিকটা গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের জন্য কতোগুলো ‘সংস্কার কমিশন’ তৈরি করে কিছু কিছু সংস্কার প্রস্তাব সংকলিত করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই সব কমিশনের বিভিন্ন দলীয় প্রতিনিধিরা আপন আপন আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে সংস্কার প্রস্তাবগুলো তৈরি করেছেন। তবে, অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচিত সরকার ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে, বাকি অনেকগুলো সংকলনের ওপর ধুলো জমতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে প্রয়োজনে রাস্তায় নামতে হবে।
 

ওদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা ডানপন্থি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাব ও প্রতাপ বৃদ্ধি পেয়েছিল, আর এই সব অগণতান্ত্রিক শক্তি ওই সরকারের একাংশের প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা ভোগ করেছে। বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, বর্তমান সরকার ও ডানপন্থার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো রাজনৈতিক-ভাবাদর্শিক অবস্থান গ্রহণ করেনি।
 

প্রশ্ন: গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের একাংশ একসময় গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তির সঙ্গে ‘রিকনসিলিয়েশনের’ মাধ্যমে, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে, দেশকে এগিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ কি দেখতে পাচ্ছেন?
 

উত্তর: আমি মনে করি রাজনৈতিকভাবে পরাজিত কোনো শক্তির সঙ্গে ‘রিকনসিলিয়েশনের’ উদার ধারণাটি দেশের জন্য একটি মঙ্গলজনক প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, বর্তমান ক্ষেত্রে, গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তি আওয়ামী লীগ ও তার রাজনৈতিক দোসরগণই এর সবচেয়ে বড় বাধা। রিকনসিলিয়েশনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো পরাজিত শক্তির দিক থেকে তার অপরাধ স্বীকার করা, মারাত্মক অপরাধীদের আইনের আওতায় বিচারের অধীন করা ও অপরাধের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু লীগ নেতৃত্ব, যে কি-না দেশের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে, মানুষের ‘ভোটাধিকার’ হরণ করে, বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শিবিরভুক্ত ডজন-ডজন মানুষকে গুম-খুন করেছে, হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে, সংবাদ মাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরেছে, আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে, বিচার ব্যবস্থাকে আপন স্বার্থে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করেছে এবং সর্বোপরি, অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, চব্বিশের মধ্যজুলাই থেকে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে, সহস্রাধিক প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা করেছে, বিশ সহস্রাধিক মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে, সেই লীগের ভেতর এখনো পর্যন্ত কোনো অনুশোচনার বিন্দুমাত্র লক্ষণও দেখা যায়নি। উল্টো, আমাদের ইতিহাসের গণতান্ত্রিক মুক্তিপ্রয়াসী এক তাৎপর্যপূর্ণ গণ-অভ্যুত্থানকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে, নিজেদের সেই ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন ও প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। লীগের অবস্থা অনেকটা জামায়াতের মতোই- জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি গণহত্যাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতের ভেতর কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি- ক্ষমা ভিক্ষা তো দূরের কথা। স্পষ্টতই, লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে এদেশের গণতন্ত্রপ্রয়াসী জনগণের রিকনসিলিয়েশনের ন্যূনতম পূর্বশর্তটিও এখনো পর্যন্ত পূরণ হয়নি। ফলে, রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়াটিরও যথাযথ সূত্রপাত ঘটেনি। যদি এই পূর্বশর্ত পূরণ হয়, আমি মনে করি, একটি রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে।
 

প্রশ্ন: সম্পাদক পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন, সে অবস্থায়, অধ্যাপক ইউনূসের জমানায়, পত্রিকা অফিসে সহিংস হামলার মুখে সংবাদকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বর্তমানে, নির্বাচিত জাতীয়তাবাদী দলের শাসনামলে, গণমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
 

উত্তর: পরিষদের সভাপতি হিসেবে উগ্র-ডানপন্থি মববাজদের লাগিয়ে দেয়া অগ্নিগোলক ও ধোঁয়ার জালে আটকেপড়া একটি পত্রিকার মরণাপণ্ন সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো আমার কর্তব্যেরই অন্তর্গত ছিল। সুতরাং সেটা নিয়ে আমার আদিখ্যেতা করার কিছু নেই।
 

যাইহোক, আমি আগেই বলেছি, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশ ও বিশ্লেষণ ছাপানোর ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ও সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়েছে। আমার ধারণা, এই ব্যবস্থা আর সহজেই ফিরে আসবে না। কিন্তু, একথা আমাদের ভুললে চলবে না যে, বাংলাদেশের শুরু থকে প্রচলিত বহু জনস্বার্থবিরোধী অসভ্য ঔপনিবেশিক আইন ও বিধি এখনো এ দেশের সংবাদমাধ্যমের মাথার উপর ইউক্লিভের তরবারির মতো ঘুরে চলেছে। যেমন ধরুন, যেকোনো পত্র-পত্রিকা প্রকাশের জন্য যে সরকারি অনুমোদন গ্রহণ করতে হয়, তাতে প্রকাশককে এই মর্মে একটি লিখিত মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে হয় যে, ওই পত্রিকায় সরকারের স্বার্থবিরোধী কোনো তথ্য বা মন্তব্য ছাপা হবে না। এই চরম অগণতান্ত্রিক ও অবাস্তব আইনটি ১৯৭৩ সাল থেকে এখনো অব্যাহত আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে, আমি ইতিমধ্যেই  এই আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছি। প্রতি-উত্তরে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করবেন। কিন্তু বাতিল না করলে, কিংবা গড়িমসি করলে, আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চয় সংগ্রামী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
তাছাড়া, অতীতের অন্যান্য সরকারও, বিশেষত লীগ সরকার, এমন আরও কতোগুলো স্বৈরতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন ও জারি করেছে, যা নাগরিকদের বাক্‌, ব্যক্তি ও ভাব প্রকাশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। আমরা এসব আইন বাতিলের জন্য কাজ করে যাবো।

 

সাক্ষাৎকার'র অন্যান্য খবর