আইন-আদালত

জুলাই গণহত্যার মামলা কেন যাবে আইসিসিতে?

ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার | মতামত
মার্চ ১৫, ২০২৫

বাংলাদেশ সরকার জুলাই গণহত্যার মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) করবে কিনা তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। এবার  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌঁসুলির বিশেষ উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধ মামলায় কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই আইন বিশেষজ্ঞ ৬ই মার্চ  ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি এই সুপারিশ তুলে ধরেন। জুলাই গণহত্যার মামলাগুলো নেদারলান্ডসের দ্য হ্যাগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানো হবে কি-না, বাংলাদেশ সরকার শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। টবি ক্যাডম্যানের সুপারিশের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যেহেতু জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গত মাসে জানিয়েছিল যে, অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবে যে, তারা জুলাইয়ের নৃশংসতার বিষয়টি আইসিসিতে পাঠাবে কি-না।
আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের এই সুপারিশের পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে গত জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র  করে গড়ে ওঠা ছাত্র বিক্ষোভে। যে আন্দোলনের কারণে স্বৈরাচার  শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।  ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ তাদের চোখ হারিয়েছে। এ ছাড়া ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ।


আর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ এসেছিল দেশের সর্বোচ্চ স্থান থেকে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী  স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্র আন্দোলন দমন করতে এসব হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। তীব্র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে কয়েক শতাধিক মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও (বাংলাদেশ) (আইসিটি) শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে ও আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
এদিকে বাংলাদেশে গত জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার ও পরে সরকার পতন আন্দোলনের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার আইসিসিতে কীভাবে করা যায় সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।  নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন  আইসিসি’র  প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান। সেখানে তারা এ বিষয়ে কথা বলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধ, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় সংঘটিত অপরাধ রোম চুক্তির ৫ এবং ৭ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে। তাই শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত, বিচার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিচারিক আদালত।


আইসিসি সাধারণত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের (রোম চুক্তি, অনুচ্ছেদ ৫) বিচার করে থাকেন। আইসিসি’র সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অপরাধকে গণহত্যা বলা কঠিন। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অপরাধ রোম চুক্তির ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলা বেশি যৌক্তিক। জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্টেও তাই  বলা হয়েছে।
রোম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ, বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আইসিসিতে মামলা করা। আইসিসি এই ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক সংস্থা। সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইসিসিতে অভিযোগ করলে আইসিসি’র প্রসিকিউটর অফিস আইসিসি’র প্রি-ট্রায়াল চেম্বার থেকে অনুমতি না নিয়েই তদন্ত শুরু করতে পারবে। এ ছাড়া আইসিসিতে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য মামলা করলে বেশ কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। 


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রচলিত ফৌজদারি আদালত বা আইসিটিতে হলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে, যেমন অতীতে হয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এলে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারে বা অপরাধীদের ক্ষমা করে দিতে পারে। আইসিসিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলেও বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা এরই মধ্যেই বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও ভারতে পালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে তাদের শাস্তি হলেও বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা কঠিন হবে। অন্যদিকে বর্তমানে আইসিসি’র সদস্য রাষ্ট্র ১২৪টি। আইসিসি অভিযুক্ত/অপরাধীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অপরাধীকে আইসিসি’র কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকবে।


এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা তৈরি করতে পারে যদি তারা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হয়ে থাকেন। কেননা, বর্তমানে ১১২টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ২৩শে অক্টোবর ২০১৮)। ফলে ফৌজদারি আদালত বা আইসিটি মৃত্যুদণ্ড দিলে অপরাধী বিদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকলে তাকে ফিরিয়ে এনে শাস্তি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। কারণ সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন না করলে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন চুক্তি থাকলেও সে দেশ অপরাধীকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না। আইসিসি’র ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। কারণ আইসিসিতে মৃত্যুদণ্ড নেই। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আইসিসি ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারে।
বাংলাদেশের আদালত অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার করতে পারেন। এটি আরেকটি সমস্যা তৈরি করতে পারে। অপরাধীর অনুপস্থিতিতে বিচার করা হলে এবং শাস্তি দেয়া হলে অপরাধী বিদেশে থাকলে তাকে ফিরিয়ে আনতে বেশ জটিলতায় পড়তে হবে।


আইসিসি যেকোনো ব্যক্তির বিচার করতে পারেন, অপরাধী যে পদেই থাকুন না কেন। আইসিসি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন এবং বিচার করতে পারেন। দেশীয় আদালত এবং ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে বিচার করা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ আইসিসিতে মামলা করলে বিচার প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি বিপুল আর্থিক খরচ থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পাবে। সেই অর্থ দেশ পুনর্গঠনে ব্যবহার করা যেতে পারে।  জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জাতিসংঘ জড়িত হয়েছে।  জুলাই গণহত্যা নিয়ে জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। ৫ই মার্চ সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।  জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী  ২০২৩ সালের ১লা জুলাই থেকে ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত ১৪০০ জনের মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
আইসিসিই একমাত্র বিচারিক আদালত, যা ভিকটিম ও অভিযুক্ত উভয়ের জন্য ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে পারেন। এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে জুলাই গণহত্যার মামলা আইসিসিতে করবে কি-না? এটা সত্য যে আইসিসিই একমাত্র আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান যা সব পক্ষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। তবে আইসিসি’র বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ। এটাই আইসিসি’র অন্যতম প্রধান নেতিবাচক দিক। 
 

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আইনের গবেষক

 

মতামত'র অন্যান্য খবর