বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের দাবি তার ভারত থেকে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, এই দাবি কেবল প্রত্যর্পণ আলোচনাকে স্থগিত করবে না, বরং ভারতে তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের সম্ভাবনাকেও আরও জোরদার করবে। তার বিরুদ্ধে এই মামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ওপর তার সরকারের পরিচালিত নৃশংস দমনপীড়নের অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই দমন অভিযানে কমপক্ষে ১৪০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অস্থিরতা এটি।
গত সপ্তাহে ঢাকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এক শুনানিতে প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম যুক্তি দেন, শেখ হাসিনা ‘১৪০০টি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য’। তিনি বলেন, যেহেতু তা মানবিকভাবে সম্ভব নয়, তাই আমরা কমপক্ষে একটি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি। তাজুল ইসলাম আদালতে বলেন, হাসিনার লক্ষ্য ছিল নিজের ও তার পরিবারের জন্য আজীবন ক্ষমতায় থাকা। তিনি আরও মন্তব্য করেন, সাবেক এই নেত্রী এক কঠোর অপরাধীতে পরিণত হয়েছেন এবং তার সংঘটিত বর্বরতার জন্য সামান্যতম অনুশোচনাও প্রকাশ করেননি।
হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং আদালতের ফেরার নির্দেশ অমান্য করেছেন। গত বছর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার আদেশ দিয়েছেন। এর ফলে আন্দোলন বেগবান হওয়ার পর তিনি দেশত্যাগ করেন।
তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক। আর সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বর্তমানে হেফাজতে আছেন। তিনি দোষ স্বীকার করেছেন। প্রসিকিউশন বলছে, কামালের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক জিওফ্রি ম্যাকডোনাল্ড বলেন, দমন অভিযানের ভয়াবহতার কারণে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনা ও তার সাবেক কর্মকর্তাদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করার ক্ষেত্রে প্রবল রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, হাসিনা ভারতে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়াচ্ছে। ভারত এখন পর্যন্ত হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর কোনো আগ্রহ দেখায়নি। আর মৃত্যুদণ্ডের দাবি প্রত্যর্পণ আলোচনাকে আরও পিছিয়ে দেবে।
নির্বাসনে থাকলেও হাসিনা দেশে ও বিদেশে উভয় জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে খবরে জানা যায়। এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে হাসিনার নামে প্রচারিত এক অনলাইন ভাষণে তিনি তার সমর্থকদের অন্তর্বর্তী সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেন, যার পরপরই দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে এখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নির্বাচনে অংশগ্রহণও বন্ধ। এ মাসের শুরুতে হাসিনার সামাজিক মাধ্যমে দেয়া ‘প্রতিরোধে নামুন’ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমর্থকরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হঠাৎ বিক্ষোভ আয়োজন করে। দেশটি এখন আগামী ফেব্রুয়ারিতে সম্ভাব্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বছর আগস্টে হাসিনা যখন নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেন, তখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারত সরকারের কাছে তাকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠায়। ভারত এখনো সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে এই যুক্তিতে যে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভারত দীর্ঘদিন ধরে হাসিনার সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র, বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে নিরীহ মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ মৃত্যুদণ্ডের যুক্তি তৈরি করে। তবে তিনি যোগ করেন, একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের দাবি ভারতে তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনকে আরও জোরদার করে তোলে। যদি আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়, তবে তার প্রত্যর্পণ সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে। ইয়াসমিন আরও বলেন, অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় কেবল মৃতের সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনার পৃথক প্রেক্ষাপটও বিচারযোগ্য।
ম্যাকডোনাল্ডের মতে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বর্তমানে কতোটা নিরপেক্ষ তা বিচার করতে পারবে, এ নিয়ে যুক্তিসঙ্গত উদ্বেগ রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিচার প্রক্রিয়া ‘রাজনীতিকীকরণের’ শিকার।
হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিচারব্যবস্থা ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফ্রিডম হাউস-এর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসিনার শাসনে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক প্রয়োগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিকৃতির মাধ্যমে দুর্বল করা হয়েছে। বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতির অভিযোগ আনার ঘটনা তখন নিয়মিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে দ্রুতগতিতে দুর্নীতি মামলা পরিচালিত হয়। এর ফলে তিনি দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানায়, বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের এবং মত প্রকাশ দমনের জন্য আইন ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক প্রবণতা ছিল। তারা আরও বলে, এখন বাতিল হওয়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট একসময় ব্যবহার করা হতো ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘মানহানিকর’ অনলাইন পোস্টের জন্য কর্মী ও সমালোচকদের গ্রেপ্তারে।
লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশ একসময় জাতিসংঘের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু হাসিনা দেখিয়েছেন, মানবীয় প্রকৃতি ও নারীর প্রকৃতি আলাদা নয়। তার গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তাকে কেবল নারী নেত্রী হিসেবেই নয়, সামগ্রিকভাবে এক ভিন্ন মাত্রায় দাঁড় করিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফি মো. মোস্তফা বলেন, হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের জন্য প্রসিকিউশনের তড়িঘড়ি মনোভাব তার অভিযোগের গুরুত্ব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিচার ও দায়বদ্ধতার অগ্রগতি প্রদর্শনে প্রসিকিউশন চাপে রয়েছে, যদি প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি অনির্ধারিতও থেকে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ফলাফল দেখানোর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
(লেখক একজন অভিজ্ঞ চীনভিত্তিক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক। তিনি পূর্ব এশিয়া বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তার এ লেখাটি অনলাইন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুবাদ)