২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ও দেশত্যাগের পর অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়েছে।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর ২০১৭ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। ঢাকায় তার প্রত্যাবর্তন ছিল বিশাল জনসমাগমে উচ্ছ্বসিত। নির্বাচনী প্রচারে তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণের অনুরণন টেনে বলেন-‘...আমার বাংলাদেশের জন্য একটি পরিকল্পনা আছে।’
এখন ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায়।
ভারতের প্রথম পদক্ষেপ
শুক্রবার সকালে চীন বা পাকিস্তানের আগে নয়াদিল্লি নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানায়। ঢাকাকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রভাব-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বলে বিশ্লেষকদের মত। তারেক রহমান ও তার দলকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, এ বিজয় ‘বাংলাদেশের মানুষের আস্থা’ প্রতিফলিত করে। তিনি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’-এর প্রতি ভারতের সমর্থনের আশ্বাসও দেন। বার্তাটি আনুষ্ঠানিক হলেও অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত স্পষ্ট- গত ১৮ মাসের অস্থিরতা, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার উদ্বেগ পেরিয়ে ভারত স্থিতিশীল কর্মসম্পর্ক চায়।
ভারত কী দেখছে
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের দৃষ্টিতে তিনটি আন্তঃসংযুক্ত ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ:
১) পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ অক্ষের আশঙ্কা: যদি নতুন প্রশাসন দিল্লির তুলনায় ইসলামাবাদ ও বেইজিংমুখী হয়, তবে আঞ্চলিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী জোটসঙ্গী হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তবে (বিএনপি’র) স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তা আপাতত নেই। পাকিস্তান-সংযোগের প্রসঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর (অপ্রমাণিত)। আর চীনের উপস্থিতি ইতিমধ্যে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দৃশ্যমান, যেমন মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বাণিজ্যিক প্রকল্প ভবিষ্যতে দ্বৈত ব্যবহার (সামরিক) সুবিধায় রূপ নিতে পারে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের
নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়।
২) সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: ভারত-বাংলাদেশের ৪১০০ কিলোমিটার সীমান্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের আগে অবৈধ অনুপ্রবেশ বড় ইস্যু। হাসিনা আমলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা ছিল। তবে ২০২৪ পরবর্তী সময়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে বলে তথ্য ইঙ্গিত দেয়। তারেক রহমান সরকার গঠন করলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান ও সহিংসতা দমনে কতোটা কঠোর হবেন, তা দিল্লি নিবিড়ভাবে দেখবে।
৩) সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: শেখ হাসিনাকে অপসারণের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়েছে। বাড়ি, ব্যবসা ও মন্দির লক্ষ্য করে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিছু মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও বলেছেন, অধিকাংশ ঘটনা অসাম্প্রদায়িক কারণে ঘটেছে। ভারত অন্তত ২৩ জন হিন্দু সংখ্যালঘু নিহতের কথা বলেছে এবং দৃশ্যমান সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে। তারেক রহমান সুরক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিএনপি’র ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে সম্পর্ক দিল্লির নজরে থাকবে।
বাণিজ্য: সুযোগ ও ঝুঁকি
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। ভারতের উদ্বৃত্ত প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কাঁচা তুলার সুতা আমদানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে ভারত থেকে। সম্পর্ক শীতল হলে ঢাকার ‘সরবরাহ-বৈচিত্র্য’ কৌশল বেইজিংমুখী হতে পারে, যা ভারতীয় রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে। তবে নির্বাচনের পর অর্থনীতি পুনর্গঠনে স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খলই ঢাকার কাছে অগ্রাধিকার হতে পারে, যা উল্টো ভারতীয় রপ্তানিতে গতি আনতে পারে।
বেসলাইন ও উপসংহার
হাসিনার শাসনে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক স্থিতিশীল ছিল। বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও পানি-বণ্টন চুক্তিতে অগ্রগতি হয়। যদিও দিল্লি হয়তো সেই ধারাবাহিকতাই চাইতো, তবু নেতৃত্ব পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ কৌশল নিয়েছে।
সারকথা: ভারতের নজর দুই বিষয়ের ওপর- ক্ষমতা ও উদ্দেশ্য। নতুন সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অনুপ্রবেশ রোধ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে কতোটা সহযোগী হবে, তা-ই নির্ধারণ করবে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়।
(অনলাইন এনডিটিভি থেকে অনুবাদ)