বিদেশি মিডিয়া

টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্ট, তারেক রহমানের সামনে ৫ চ্যালেঞ্জ

চার্লি ক্যাম্পবেল | অনুবাদ
ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬
টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্ট, তারেক রহমানের সামনে ৫ চ্যালেঞ্জ

১৭ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর বড়দিনে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩০০ আসনের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট স্বৈরশাসনের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপসারিত হওয়ার পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। জানুয়ারির শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, তার প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। তিনি বলেন, দেশকে এক করতে না পারলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। নিচে তার সাক্ষাৎকার থেকে পাঁচটি মূল দিক তুলে ধরা হলো।


১. জাতির ক্ষত সারিয়ে তোলা
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন। গত ১৫ বছরে আরও প্রায় ৩৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো- বিভিন্ন বাহিনী, আদালত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী দলীয়করণে আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। তারেক রহমানকে সেই আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার নজির রয়েছে। তবে এবার তিনি প্রতিশোধ নয়, ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। তার ভাষায়, ‘প্রতিশোধ কিছু ফিরিয়ে আনবে না। সবাইকে এক রাখতে পারলে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব।’


২. অর্থনীতি ঠিক করা
হাসিনার শেষ মেয়াদে জিডিপি ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে। এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও টাকা দুর্বল হয়ে পড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। যুব বেকারত্ব ১৩.৫ ভাগ।
৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যে। বিএনপি’র ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি আছে। তবে অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তারেক রহমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সুযোগ বাড়াতে সংযোগব্যবস্থা উন্নত করতে চান, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে চান এবং বিদেশে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিককে দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণ দিয়ে উচ্চ আয়ের কাজের সুযোগ বাড়াতে চান।


৩. ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন
রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক শক্তিধর ভারত ও প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনা ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ। তার পতনের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। ডিসেম্বরে তারেক রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন চুক্তিতে অসাম্য রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য, বাংলাদেশের স্বার্থ আগে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও শুল্ক ইস্যুতে টানাপড়েন ছিল। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রথমে ৩৭ ভাগ ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনা করে তা কমানো হয়। তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং বিমান বা জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন।


৪. উত্থানশীল ইসলামপন্থা সামলানো
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে বিএনপি’র পর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী জামায়াতে ইসলামী। দলটি শরিয়া আইনকে সমর্থন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। সমালোচকরা সন্দিহান। তবে বিএনপি’র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইসলামপন্থিদের প্রভাব সীমিত রাখবে। তারেক রহমানের মতে, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে দেশ ৫ই আগস্ট-পূর্ব অবস্থায় না ফিরে যায়।


৫. ছাত্রদের ভবিষ্যৎ
জুলাই বিপ্লব শুরু হয়েছিল চাকরির কোটা ইস্যুতে ছাত্র আন্দোলন দিয়ে। পরে তা রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে গণবিপ্লবে রূপ নেয়। ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় অনেকে হতাশ হন। ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর প্রাধান্যে তরুণদের একাংশ বিমুখ।
তাসনিম জারা সাবেক এনসিপি নেতা। তিনি বলেছেন, প্রকৃত বিকল্প রাতারাতি আসবে না; স্থানীয় পর্যায়ে আস্থা গড়ে তুলতে হবে। তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দেয়া মানুষদের স্মৃতি রক্ষায় তার ‘অত্যন্ত বড় দায়িত্ব’ রয়েছে।
 

উপসংহার
তারেক রহমানের সম্ভাব্য নেতৃত্ব শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, ইসলামপন্থার উত্থান নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জন- এই পাঁচ ক্ষেত্রেই তার সাফল্য নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ। 


(লেখক: টাইম ম্যাগাজিনের এডিটর অ্যাট লার্জ। লেখাটি অনলাইন টাইম থেকে অনুবাদ)

অনুবাদ'র অন্যান্য খবর