দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যেন বোমা ফাটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন চায়ের কাপে ঝড়। ইউএসএইডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার সহায়তা বন্ধ করেছে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে দেয়া হয়েছে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার। ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে দেয়া হয়েছে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার। তিনি এসব কথা প্রকাশ করেই থামেননি। প্রশ্ন তুলেছেন, এই সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ? এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে, সেখানকার নির্বাচনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি আরও খোলাসা করে বলেছেন, বাংলাদেশে এই অর্থ দেয়া হয়েছে অখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাতে আবার কাজ করেন মাত্র দু’জন ব্যক্তি। এরপরই শুরু হয়েছে সেই দুই ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান কে এই প্রশ্ন। কারণ, বিষয়টির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি জড়িত। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক এক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন দম্ভ প্রকাশকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর রাজনীতির মাঠ প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্ররা নতুন দল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। শুধু বাংলাদেশ নিয়েই ট্রাম্প মন্তব্য করে ক্ষান্ত হননি। তিনি ভারতের প্রসঙ্গকে সামনে এনেছেন। বলেছেন, ভারতকে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তা নিয়ে ভারতের রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিরোধী কংগ্রেস বাকযুদ্ধে নেমে পড়েছে। এরই মধ্যে নানা রকম তথ্য ভাসছে বাতাসে। অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই অর্থ ভারতকে নয়, দেয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। এ তথ্য সঠিক নাকি মিথ্যা তা যাচাই করা যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় বিশ্লেষকরা দাবি তুলেছেন এই সহায়তা নিয়ে যেহেতু বোমা ফাটিয়েছেন ট্রাম্প নিজে, ফলে তারই উচিত কারা কারা এই সহায়তা পেয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে তা প্রকাশ করে দেয়ার। নিশ্চয়ই তার কাছে এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ থাকার কথা। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২০শে জানুয়ারি শপথ নিয়ে বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা পৃথিবীকে উল্টাপাল্টা অবস্থায় ফেলেছে। তিনি গ্রিনল্যান্ড, ফিলিস্তিনের গাজাকে কিনে বা দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। গালফ অব মেক্সিকোর নাম বানিয়েছেন গালফ অব আমেরিকা। বার্তা সংস্থা এপি এটাকে গালফ অব মেক্সিকো হিসেবে তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করার কারণে এপি’র ফটোগ্রাফার ছাড়া সাংবাদিকদের নিষিদ্ধ করেছেন ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে তার প্রশাসন। সহসাই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক হওয়ার কথা ট্রাম্পের। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব আলোচনায় ডাকা হয়নি ইউক্রেনকে। এই দেশটি এবং ইউরোপকে বাইরে রেখে চালানো হচ্ছে যুদ্ধ বন্ধের কৌশল। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে যেকোনো রকম শান্তি প্রক্রিয়া মেনে নেবেন না। শুধু এখানেই থেমে থাকেন নি ট্রাম্প। তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করিয়েছেন। চীনের বিরুদ্ধে শতকরা ১০ ভাগ শুল্ক আরোপ করেছেন। এসব নিয়ে যখন বিশ্ব টালমাটাল তখনই তার গঠিত ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সির (ডজ) প্রধান বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে দেয়া বিভিন্ন রকম সহযোগিতা বাতিল করার ঘোষণা দেন। তাদের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে এ খবর জানানো হয়।
ঘোষণায় যা বলা হয়-
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র বরাদ্দ রেখেছিল ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। নেপালে ফেডারেলিজম এবং জীববৈচিত্র্য বিষয়ক প্রজেক্টে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। দক্ষিণ আফ্রিকায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৫ লাখ ডলার। মালিতে সামাজিক সংহতি বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল এক কোটি ৪০ লাখ ডলার। এমনিতরো বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাক্সদাতাদের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এক্সে ডজ জানিয়েছে এসব বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছে কম্বোডিয়া, সার্বিয়া, মালি, লাইবেরিয়া, মোজাম্বিক, মিশর সহ বিভিন্ন দেশ। এ ঘোষণা দেয়ার পর ট্রাম্প নিজে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করতে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার সহায়তা দেয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদেশি সহায়তা বাবদ ভারত, মোজাম্বিক, নেপাল সহ বিভিন্ন দেশকে ইউএসএইড’র মাধ্যমে যে সহায়তা দেয়া হতো তার সমালোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে দেয়া হয়েছে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার। তা এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে, যার নাম কেউ শোনেনি। তারা পেয়েছে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার। তারা একটি চেক পেয়েছে। আপনারা কল্পনা করতে পারেন? আপনার সামনে একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান আছে। আপনি এখান থেকে ১০ হাজার, ওখান থেকে ১০ হাজার পান। তারপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার পান। ওই প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন দু’জন মানুষ। আমি মনে করি তারা খুব খুশি এবং তারা খুব ধনী। মহৎ হওয়ার জন্য খুব তাড়াতাড়ি তারা একটি ভালো ব্যবসা-বিষয়ক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে চলে আসবেন’। টানা তৃতীয় দিনের মতো তিনি ভারতের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। প্রশ্ন রাখেন কেন বিদেশে এত বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রেই ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য একই রকম প্রচেষ্টা নেয়া যেতে পারে? তিনি বলেন, ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য আমার বন্ধু প্রধানমন্ত্রী (নরেন্দ্র) মোদির কাছে যাচ্ছে প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ ডলার। আমরা ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার দিচ্ছি। এতে আমাদের কি উপকার হবে? আমারও তো ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য আমাদেরকে কেন দুই কোটি ১০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হবে? আমার তো মনে হয় তারা কাউকে নির্বাচিত করার চেষ্টা করছিল। ভারত সরকারকে আমাদের বলতে হবে। কারণ, যখন আমরা শুনতে পাই যে, আমাদের দেশে রাশিয়া প্রায় দুই হাজার ডলার খরচ করে, তখন বিষয়টি একটি ‘বিগ ডিল’। দুই হাজার ডলারে তারা ইন্টারনেটে কিছু বিজ্ঞাপন দেয়। এর পুরোটাই মাইলফলক। এর একদিন আগে এই তহবিলকে একটি ‘কিকব্যাক স্কিম’- বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। বলেন, এসব অর্থ কোথায় যাচ্ছিল সে সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা নেই।
ভারতে রাজনৈতিক বিতর্ক
ডজ-এর বিবৃতি এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পর ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই বরাদ্দকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’- বলে অভিহিত করেছে এবং তারা এই হস্তক্ষেপ পাওয়ার জন্য বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টিকে দায়ী করেছে। রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। বিজেপি’র সমালোচনার জবাবে কংগ্রেস অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ট্রাম্পের দাবিকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছে। দাবি সমর্থনের পক্ষে কোনো রকম তথ্য-প্রমাণ দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ওদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ট্রাম্পের দাবিকে গভীর হতাশাজনক বলে দেখতে পেয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, এই পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দেয়া অপরিপক্ব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে বিশ্ব জুড়ে মানবিক সহায়তা তদারকি করে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্সি ইউএসএইড। এবার তাদের বিরুদ্ধে দমননীতি গ্রহণ করেছে ট্রাম্প সরকার। তবে এই ইউএসএইডকে ইলন মাস্ক অভিহিত করেছেন একটি ‘ক্রিমিনাল সংগঠন’ হিসেবে। এ ঘোষণা দিয়ে তিনি এর অধীনে বেশ কিছু প্রকল্প বাতিল করে দেন। এর মধ্যে আছে- ‘কনসোর্টিয়াম ফর ইলেকশন্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল প্রসেস স্ট্রেঙ্গদেনিং’ প্রকল্পে ৪৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ভারতে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার ব্যয় করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক সপ্তাহ আগে প্রথমবার ওয়াশিংটন সফর করেন। তারপরই এমন মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। ভারতকে সহায়তা হিসেবে দেয়া অর্থের বিষয়ে নানা রকম সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। মিয়ামিতে গভর্নরদের এক সামিটে ট্রাম্প বলেছেন, আমার মনে হয় তারা কাউকে নির্বাচিত করার চেষ্টা করেছেন। ভারত সরকারকে এটা বলতে হবে আমাদের।
২০২৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে লন্ডনে একটি ইভেন্টে বক্তব্য রাখেন- কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তার একটি ক্লিপ ট্রাম্পের বক্তব্য দেয়ার একই দিনে শেয়ার করেছেন বিজেপি নেতা অমিত মালভাইয়া। ওই ক্লিপে রাহুলকে বলতে শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোর মতো বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছে অস্পষ্ট ছিল যে, গণতান্ত্রিক মডেলের জন্য বিপুল অংশ ভারতের জন্য বাতিল করা হয়েছে। রাহুলের এ বক্তব্য নিয়ে এক্সে পোস্ট দিয়েছেন অমিত মালভাইয়া। তিনি বলেছেন, লন্ডনে গিয়ে রাহুল গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে বিদেশি শক্তিগুলোকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। জবাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়কালে গত এক দশকে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইউএসএইড’র সহায়তার রিপোর্ট প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি সরকারের প্রতি। এ বিষয়ে ভারতের পোল প্যানেল কোনো উত্তর দেয়নি। তবে সাবেক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা এসওয়াই কুরেশি তার সময়কালে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এমন কোনো তহবিল পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। এর আগে অমিত মালভাইয়া অভিযোগ করেন, এসওয়াই কুরেশির অধীনে ২০১২ সালে নির্বাচন প্যানেল জর্জ সরোস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত একটি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। তাদেরকে প্রাথমিকভাবে অর্থ সহায়তা দেয় ইউএসএইড। এটা করা হয়েছিল ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর প্রচারণায়। তবে এ তথ্যকে মিথ্যা দাবি করে তা উড়িয়ে দিয়েছেন কুরেশি। বলেছেন, ওই চুক্তিকে কোনো আর্থিক বা আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না কোনো পক্ষ থেকে। এমন অবস্থায় বিজেপি নেতা, আইনজীবী এবং সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট মীনাক্ষী লেখি দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন দ্য প্রিন্টে। তাতে তিনি ভারতের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। বলার চেষ্টা করেছেন, কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের ওই সহায়তা পেয়েছেন। তুলেছেন বাংলাদেশের প্রসঙ্গও। এতে তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করেছেন। তাতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ভারতকে যে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে ভারত নয়, বাংলাদেশের জন্য দেয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্ম এবং রাজনৈতিক সমর্থনে ব্যবহার করা হয়। এমন মন্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি পরিশেষে দাবি তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের উচিত হবে যেসব দেশ এসব সহায়তা পেয়েছে সেখানকার কোন কোন ব্যক্তি, এনজিও বা অন্যান্য এনটিটি সহায়তা পেয়েছে তা প্রকাশ করে দিতে।
বাংলাদেশে কে পেয়েছে এই সহায়তা
রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশে ব্যাপক কৌতূহল দেখা দিয়েছে। কে পেয়েছে এই সহায়তা। ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী এই সহায়তা পেয়েছে অখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান, যার নাম কেউ জানেন না। তাতে আছেন দু’জন কর্মকর্তা। ফলে সর্বত্র একটি প্রশ্ন- কোন প্রতিষ্ঠান বা কারা এই অনুদান পেয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। এসব সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার অনুদানের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে মানবজমিন পত্রিকা ২৪শে ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ট্রাম্প যে অনুদানের তথ্য দিয়েছেন তা দুই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসে থাকলেও নির্বাচন নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে খরচ হয়ে থাকতে পারে। কারণ নির্বাচন নিয়ে কাজ করে এমন অনেক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহায়তা পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান গত জাতীয় নির্বাচনের আগে তৎপর ছিল। এ ছাড়া নির্বাচনের পরও কোনো কোনো সংগঠন সেমিনার, গোলটেবিল সহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণার আয়োজন করে।
ওদিকে, ২২শে ফেব্রুয়ারি ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অনুদান নির্দিষ্ট দেশগুলোতে দেয়া হয়। ২০০৮ সাল থেকে ভারতে ইউএসএইড’র অর্থায়নে সিইপিপিএস’র কোনো প্রকল্প পরিচালিত হয়নি। ২ কোটি ১০ লাখ ডলার তহবিলের সঙ্গে ইউএসএইড’র অনুমোদিত অনুদান কেবল সিইপিপিএস’র মাধ্যমে (যার ফেডারেল অ্যাওয়ার্ড নম্বর ৭২০৩৮৮২২এলএ০০০০১) বাংলাদেশে দেয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে ‘আমার ভোট আমার’ নামে একটি প্রকল্পের জন্য যা অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই বছরের নভেম্বরে এই প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘নাগরিক (সিটিজেন) প্রোগ্রাম’। গত বছরের ডিসেম্বরে ইউএসএইড’র ঢাকার উপদেষ্টা লুবাইন মাসুম যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নাগরিক প্রকল্পের জন্য ২ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদান পাওয়ার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন। এই অনুদানের মধ্যে ইতিমধ্যে ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে। অনুদান পাওয়া তিন সংস্থা হলো- ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস), ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই)।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আইনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তিনি মাইক্রো গভর্ন্যান্স রিসার্চ (এমজিআর) নামে একটি গবেষণা সংস্থার পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। আইনুল ইসলাম আইএফইএস’র সিনিয়র কনসালটেন্টের দায়িত্বেও রয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাবের (এডিএল) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হন তিনি। গত ১১ই সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, হ্যালো বাংলাদেশ ২.০! গত দুই বছরে এমজিআর, সেইভ ইয়ুথ ও ডিএফটিপি দেশ জুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তরুণদের জন্য ৫৪৪টি অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। কর্মশালার আকার, প্রশিক্ষণ, কথোপকথন, সামিট, অ্যাকশন প্রকল্পসহ তরুণ গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সংশ্লিষ্টতার জন্য সরাসরি ২২১টি অ্যাকশন প্রকল্প, ১৭০টি গণতন্ত্র সেশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজার ২৬৪ তরুণের কাছে পৌঁছেছিল এমজিআর, সেইভ ইয়ুথ ও ডিএফটিপি!
এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন নাগরিক প্রোগ্রামের আওতায় ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস) এবং ইউএসএইড বাংলাদেশের উদার সমর্থন ও অংশীদারিত্বে সম্ভব হয়েছে বলে লেখেন তিনি। ইউএসএইড ও আইএফইএস’র সহায়তায় এই ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সিইপিপিএস’র মাধ্যমে নাগরিক প্রোগ্রামে ইউএসএইড’র অর্থায়নের তথ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে নিশ্চিত করেছেন তিনি। ইলন মাস্ক নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি ইউএসএইড’র তহবিল বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি ধাক্কা। তবে ল্যাবটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে এবং আমরা আশাবাদী এটি চালু থাকবে।
গত বছরের ২রা ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে এনডিআই সদর দপ্তর পরিদর্শনের পর ইউএসএইড ঢাকার পলিটিক্যাল প্রোসেসেস উপদেষ্টা লুবাইন চৌধুরী মাসুম লিংকডইনের একটি পোস্টে ইউএসএইডের ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের তহবিলের প্রতিশ্রুতির তথ্য নিশ্চিত করেন। পোস্টে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এনডিআইয়ের উপস্থিতি না থাকলেও সংস্থাটি ইউএসএইড’র ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের সিইপিপিএস/নাগরিক প্রকল্পের অধীনে আইআরআই ও আইএফইএস-সহ তিনটি প্রধান অংশীদারদের একটি। এনডিআই/সিইপিপিএস/নাগরিক প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে প্রি-ইলেকশন অ্যাসেসমেন্ট মিশন (পিইএএম) ও টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট মিশনে (টিএএম) অংশ নিয়েছে; যা আমি পরিচালনা করি। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও মাসুম সাড়া দেননি বলে জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।