অনুসন্ধান

টালমাটাল এনসিপি

আরিফুল ইসলাম | অনুসন্ধান
জানুয়ারী ১০, ২০২৬
টালমাটাল এনসিপি

ভোটের হাওয়া শুরু হতেই দুলে উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যখন নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার কথা দলটির, তখনই পড়তে হয়েছে ভাঙনের মুখে। কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলাতেও একের পর এক পদত্যাগ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে এনসিপি। ফলে সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই সংকটের মধ্যে পড়েছে দলটি। দলীয় সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দলটি থেকে ১৭ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের কারণেই তারা পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। কিন্তু জোটে যাওয়ার বিষয়টি একটি নির্বাচনী কৌশলের অংশ। জোটের আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করেনি জামায়াতে ইসলামী তার শরিকদের। এনসিপিকেও কতোটি আসন দেয়া হবে তাও স্পষ্ট না। এ ছাড়াও অন্যান্য শরিকদের মধ্যে কাদেরকে কোন আসনগুলো ছেড়ে দেয়া হবে তাও কোনো পক্ষ থেকেই স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে। এখন প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই বাছাই চলছে। আগামী ২১শে জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। এরপর থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা ও গণসংযোগ করবেন নিজ এলাকাগুলোতে। এনসিপি সূত্র জানায়, এখনো আসনের বিষয়ে স্পষ্ট করা হয়নি। এজন্য এনসিপি কতোটি আসন জোটে ছাড় পাবে- তা প্রকাশ করা হয়নি। জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের মধ্যে আসন নিয়ে দরকষাকষি চলছে। আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়ায় দলের অনেকেই অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই এনসিপি’র ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে। গত দুই সপ্তাহে দলটির অন্তত ১৭ জন জ্যেষ্ঠ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে আরও অনেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, অনেকে পদত্যাগ না করলেও আপাতত দলের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন। ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া দলটিকে এখন নেতৃত্ব সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা ও মনোবল ভাঙনের বাস্তবতায় পড়তে হচ্ছে।
 

জামায়াত জোটই কী একমাত্র ভাঙনের মূল সূত্র: গত ২৮শে ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী মোর্চায় যোগ দেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় এনসিপি। কিন্তু এই ঘোষণার আগের দিনই দলের ভেতরের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জামায়াতের সঙ্গে জোট না করার অনুরোধ জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দেন দলের ৩০ নেতা। এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক শুরু হয় নেতাদের পদত্যাগ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে এনসিপি’র মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মীর আরশাদুল হক। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপি’র সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যেই গত ২৫শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তিনি এনসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। পরে ৭ই জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। 
 

দলীয় সূত্র বলছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়ার কারণে মতাদর্শ ও গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শের জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এনসিপি এমন কথা জানিয়েছেন দলে পদত্যাগ করা নেতাকর্মীরা। এটা সত্য যে, জামায়াত জোটের সঙ্গে যাওয়ার ফলে দলের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়া শুধুই নির্বাচনী কৌশল। এর বাইরে দল থেকে অনেকেই মনোনয়ন নিয়েছিলেন এমপি নির্বাচন করতে। নির্বাচনে আসন না পাওয়াও আরেকটি মুখ্য কারণ। দেশ জুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন এনসিপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচনে নামেন। যদিও তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে এবং বিষয়টি এখন আপিলে রয়েছে। তার সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন তার স্বামী ও দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। পদত্যাগের তালিকা দীর্ঘ। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন নেতা হলেন-যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জাবীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক-উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সৈয়দা নীলিমা দোলা, আসিফ মোস্তফা জামালসহ আরও অনেকে দল ছেড়েছেন। ফেনী জেলা শাখার পাঁচ নেতা পদত্যাগ করেছেন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। এতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দলটির ভাঙন আর কেবল কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মিডিয়া, আইসিটি, অফিস ব্যবস্থাপনা, কৃষক উইং-এনসিপি’র একাধিক কার্যকরী ইউনিট কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়েছে।
 

থেমে আছে ইশতেহার, নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়েও নানা মত: দলের পাশাপাশি নির্বাচন প্রস্তুতিতেও বড় ধাক্কা খেয়েছে এনসিপি। মনোনয়নপত্র জমা দিলেও নির্বাচন পরিচালনা কৌশল, প্রচার পরিকল্পনা ও ইশতেহার প্রণয়নের কাজ শেষ করা যায়নি। দলীয় সূত্র জানায়, পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ পদত্যাগ করার পর ইশতেহার কমিটির কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় নতুন করে কাজ শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মুখ্য সমন্বয়ক ও যুগ্ম আহ্বায়করা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকায় ইশতেহার প্রণয়ন প্রায় স্থবির। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে দেয়া হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেলের দায়িত্ব। এনসিপি’র মুখপাত্র হিসেবে যেসব সেল এবং সাংগঠনিক ইউনিট তার কার্যপরিধির আওতাভুক্ত থাকবে, সেগুলো হলো-মিডিয়া সেল, প্রচার ও প্রকাশনা সেল, ব্র্যান্ডিং সেল, দপ্তর সেল, জনসংযোগ ও সদস্য সংগ্রহ সেল, রিসার্চ ও পলিসি সেল এবং ঢাকা মহানগর (উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিট)। আসিফ মাহমুদ গত ২৯শে ডিসেম্বর এনসিপি’র মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়ের মূল্য এখন চড়া দামে দিতে হচ্ছে। দুই মাস আগে যদি জোট প্রশ্নে সিদ্ধান্ত সুরাহা হতো। তাহলে বেশির ভাগ আসনেই শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হতো। এখনো আমরা মাঠে যথেষ্ট নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জন্ম নেয়া এনসিপি’র প্রতিশ্রুতি ছিল মধ্যপন্থি, মানবিক ও আধুনিক রাজনীতির। আজ দলটি শুধু একটি সাংগঠনিক সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে না। প্রশ্নের মুখে পড়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও। এর আগে গত ২৮শে ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, কেউ দলে থাকবে কিনা বা নির্বাচন করবে কিনা, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। যেকোনো মতামতের ক্ষেত্রে কারও ভেটো (আপত্তি) থাকতে পারে, মতামত থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এনসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটি, সারা দেশের নেতাকর্মীরা এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারা জোটের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একমত। তিনি আরও বলেন, যারা বিরোধিতা করছে, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলবো। তাদের আরও বোঝানোর চেষ্টা করবো। আশা করি, তারা এনসিপি’র এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেই থাকবে।
 

এসব বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম ‘জনতার চোখ’কে বলেন, নির্বাচনের আগে দল থেকে পদত্যাগ করা বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তরুণদের ঘিরে নানা রকম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কয়েকজন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে একটি বড় দলে যুক্ত হয়েছেন। এতে স্পষ্ট কারা দল ভাঙার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তরুণদের একটি বড় অংশই আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা আগামীর রাজনীতি করবো। তিনি বলেন, এই ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির মধ্যদিয়েই ১১ দলীয় জোট নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে সরকার গঠন করবে। নারীদের মধ্যে আমাদের দল থেকে তিনজন সংসদ নির্বাচনে মাঠে আছেন। আরও কিছু নেত্রী আমাদের সঙ্গেই আছেন। নির্বাচনের বাকি সময়টুকুতে অবশিষ্ট সাংগঠনিক শক্তি দিয়েই মাঠে টিকে থাকার লড়াই চালাতে হবে এনসিপিকে। তবে এই টালমাটাল অবস্থায় সেই লড়াই কতোটা কার্যকর হবে-সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। 

অনুসন্ধান'র অন্যান্য খবর