বিশ্লেষণ

জামায়াতের ‘ঢাকা দখল’

সোহরাব হাসান | অনুসন্ধান
ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬
জামায়াতের ‘ঢাকা দখল’

নব্বই পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হলো যারা ঢাকা দখল করতে পারে, তারাই সরকার গঠন করবে। অন্তত বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করে এই উপসংহার টানা যায়।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। তারা সেবার ঢাকা শহরের সবগুলো আসন পেয়েছিল। আবার ১৯৯৬ সালে (১২ই জুন) আওয়ামী লীগ ঢাকা শহরের একটি বাদে সব আসনে জয়ী হয় এবং সরকার গঠন করে। বিএনপি থেকে সাদেক হোসেন খোকা ব্যতিক্রমীভাবে একটি আসনে জিতেছিলেন।
একই ঘটনা আমরা দেখেছি ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও। ২০০১ সালে বিএনপি ঢাকার সব আসন দখলে নিয়েই সরকার গঠন করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ঢাকার সবক’টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
চলতি নির্বাচনেই এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেল। ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ২১২টি আসন পেয়ে মঙ্গলবার সরকার গঠন করলেও তারা ঢাকার সব আসনে জয়ী হতে পারেনি। ঢাকা শহরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৮টিতে জয় পায়। বাকি ৭টি আসন লাভ করে জামায়াতে ইসলামী জোট। এই আসনগুলো হলো- ঢাকা-৪, ঢাকা-৫, ঢাকা-১১, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৬।
 

এখানে আসনওয়ারি ফলাফল দেয়া হলো:
ঢাকা-৪
ঢাকা-৪ আসনে প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মোট ৭৭ হাজার ৩৬৭ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র প্রার্থী তানভীর আহমেদ পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪৪৭ ভোট।
 

ঢাকা-৫
ঢাকা-৫ আসনে প্রাথমিক ফলাফলে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মো. নবী উল্লাহকে হারিয়েছেন।
মোহাম্মদ কামাল হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৬৪১ ভোট। আর মো. নবী উল্লাহ পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৯১ ভোট।
 

ঢাকা-১১ 
আসনের প্রাথমিক ফলাফলে ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। এই আসন থেকে শাপলা কলি প্রতীকে তিনি মোট ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়েছেন।
নাহিদ ইসলামের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি প্রার্থী এম এ কাইয়ুম। তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট। অর্থাৎ নাহিদ কাইয়ুমের চেয়ে ২ হাজার ৩৯ ভোট বেশি পেয়েছেন।
 

ঢাকা-১২
বিএনপি জোটের প্রার্থী ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হারিয়ে ঢাকা-১২ আসনে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী মো. সাইফুল আলম খান মিলন। এ আসনে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি মোট ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়েছেন।
সাইফুল আলমের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক। তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী। তিনি পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট।
 

ঢাকা-১৪ 
আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। তিনি জামায়াতের প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেম মোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৩ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র সানজিদা ইসলাম পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৩২৩ ভোট।
 

ঢাকা-১৫
ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ৮৫ হাজার ১৩১টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৫১৭ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে জামায়াতের আমীর ২১ হাজার ৬১৪ ভোট বেশি পেয়েছেন।
 

ঢাকা-১৬
ঢাকা-১৬ আসনের ভোটে বেসরকারি ফলে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আব্দুল বাতেন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র প্রার্থী মো. আমিনুল হকের চেয়ে ৩ হাজার ৩৬১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন? নির্বাচনে আব্দুল বাতেন মোট ৮৮ হাজার ৮২৮ ভোট পেয়েছেন। আর আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।
যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামী জোট পরাজিত হয়েছে, সেসব আসনেও ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। আড়াই হাজার থেকে ২০ হাজার। বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান জিতেছেন চার হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে।
অথচ এর আগে কোনো নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা ঢাকা শহরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই আসেননি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ঢাকার আসনে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ও সর্বনিম্ন ১ হাজার ভোট পেয়েছে।  ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি’র সঙ্গে জোট বাঁধার কারণে জামায়াত ঢাকার কোনো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতারই সুযোগ পায়নি।


এবারে ঢাকায় তারা বিএনপি’র সঙ্গে সমানে সমান লড়াই করেছে। যদিও সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে তাদের আসন সংখ্যা খুবই কম। তবে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ভালো করেছে।
ঢাকায় জামায়াত জোটের বেশি আসন পাওয়ার কারণ দীর্ঘ পরিকল্পনা ও স্থানীয়দের সঙ্গে নিবিড় যোগ। জামায়াতের কর্মীরা বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জামায়াতের নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের কাছে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। ঢাকার সব এলাকায়ই দলটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তারা ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছেন।
জামায়াতের নির্বাচনী কৌশলও ছিল আলাদা। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় কাজ করেছেন। অন্যদিকে বিএনপি’র নেতৃত্বের মধ্যে এই মনোভাব এসেছিল যে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের সঙ্গে লড়াই করার মতো কেউ নেই। খুব সহজেই জয় পেয়ে যাবেন। তফসিল ঘোষণার পরও নেতৃত্ব প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে একমত হতে পারেননি। বেশ কিছু আসনে একাধিক প্রার্থী ছিল।  তারা সম্বলিত পোস্টার সেঁটে প্রচার করেছেন। আবার কোনো কোনো আসন বিএনপি মিত্রদের জন্য ছেড়ে দিলেও সেটা স্থানীয় নেতারা মেনে নেননি। একাধিক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
কেবল ঢাকা শহর নয়, সারা দেশেই বিএনপিকে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিড়ম্বনা ভোগ করতে হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বেশ কিছু আসন তারা হারিয়েছে। আবার কোনো কোনো আসনে মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।


সব মিলিয়ে বিএনপি’র অতি আত্মবিশ্বাস তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঢাকার দুর্গে জামায়াত আঘাত হানতে পেরেছে। এর পাশাপাশি দলটি প্রচার কৌশলও পরিবর্তন করেছে।  আগে তারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দেশ শাসনের কথা বললেও এবারে ইনসাফকে সামনে এনেছেন। ভোটারদের বুঝিয়েছেন ৫ই আগস্টের পর বিএনপি আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান পূরণ করেছে। বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করছে। তাদের এই নির্বাচনী কৌশল কেবল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়, শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তকেও আকৃষ্ট করেছে।
বিএনপি যদি তার নির্বাচনী কৌশল বদল না করে, তাহলে স্থানীয় সরকার সংস্থা তথা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হওয়া আরও কঠিন হতে পারে। ক্ষমতাসীন বিএনপি’র দুর্বলতা ও ব্যর্থতা তুলে ধরেই যে জামায়াত জোট ঢাকা শহর পুরোপুরি দখল করতে চাইবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। 

অনুসন্ধান'র অন্যান্য খবর