[ইরানে হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র কী চায় তার জবাব এই লেখাটিতে স্পষ্ট করেছেন নোয়াম চমস্কি। তার বিশ্লেষণটি ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। মূল ইংরেজি প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল: ‘দ্য ইরানিয়ান থ্রেট’। ১৬ বছর আগের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও প্রবন্ধের মৌলিক যুক্তিগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-আখ্যান, পারমাণবিক নীতিতে দ্বৈত মানদণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার কৌশল- এসব বিষয় বর্তমান পরিস্থিতিতেও লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান। ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যালোচনার বাইরে থাকা এবং ইরানের ওপর কঠোর নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা-এই বৈপরীত্য এখনো বহাল। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা এবং কূটনৈতিক ভাষ্য ও বাস্তব নীতির মধ্যে ব্যবধান-চমস্কির উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বোঝার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।]
ইরানকে ঘিরে ‘গুরুতর হুমকি’ ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। যা ওবামা প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতিগত সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১০ সালের মার্চে জেনারেল পেট্রেয়াস সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে জানান, ইরানি শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্র-স্তরের প্রধান হুমকি, যা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বাধীন অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। আর সেই অঞ্চলটি মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থের মূল কেন্দ্র। এখানে ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটি তার প্রচলিত কারিগরি অর্থেই ব্যবহৃত। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকা।
২০১০ সালের জুনে কংগ্রেস ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপরও আরও কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ করা হয়। একই সময়ে ওবামা প্রশাসন দ্রুতগতিতে আফ্রিকার দ্বীপ দিয়াগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। দ্বীপটি বৃটেনের দাবি করা হলেও, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সুযোগ দিতে স্থানীয় জনগণকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সেখান থেকেই সেন্ট্রাল কমান্ড অঞ্চলে সামরিক হামলা পরিচালিত হয়।
মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা ওই দ্বীপে একটি সাবমেরিন টেন্ডার পাঠিয়েছে, যা পারমাণবিক শক্তিচালিত গাইডেড-মিসাইল সাবমেরিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত হবে। যেগুলোতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং এগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। প্রতিটি সাবমেরিনের আঘাত হানার ক্ষমতা একটি সাধারণ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধগোষ্ঠীর সমতুল্য বলে ধারণা করা হয়। স্কটল্যান্ডের সানডে হেরাল্ড পত্রিকার হাতে পাওয়া একটি মার্কিন নৌবাহিনীর কার্গো তালিকা অনুযায়ী, ওবামা প্রশাসন বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৮৭টি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা, যা কঠিন ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’-এর পরিকল্পনা বুশ প্রশাসনের সময়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু তখন এগোতে পারেনি। ক্ষমতায় আসার পর ওবামা দ্রুত পরিকল্পনাটি ত্বরান্বিত করেন এবং নির্ধারিত সময়ের কয়েক বছর আগে এগুলো মোতায়েনের উদ্যোগ নেন, বিশেষভাবে ইরানকে লক্ষ্য করে।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির পরিচালক ড্যান প্লেসের ভাষায়, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) সম্পূর্ণভাবে ইরান ধ্বংসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, মার্কিন বোমারু বিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের দশ হাজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। তার মতে, ২০০৩ সালের পর থেকে মার্কিন বাহিনীর আঘাত হানার ক্ষমতা চারগুণ বেড়েছে-যা ওবামা প্রশাসনের অধীনে আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আরব গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, একটি মার্কিন নৌবহর (যার সঙ্গে একটি ইসরাইলি জাহাজও ছিল) সুয়েজ খাল অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরের দিকে গেছে। সেখানে তাদের দায়িত্ব হলো ‘ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা এবং ইরানগামী ও ইরান থেকে আগত জাহাজগুলো তদারকি করা।’ বৃটিশ ও ইসরাইলি গণমাধ্যমে আরও বলা হয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য ইসরাইলি বোমা হামলার জন্য সৌদি আরব একটি আকাশপথ করিডোর দিচ্ছে। যদিও সৌদি সরকার এই দাবি অস্বীকার করেছে। আফগানিস্তান সফর শেষে তিনি (মাইকেল মুলেন) জেনারেল ম্যাকক্রিস্টালকে সরিয়ে তার ঊর্ধ্বতন জেনারেল পেট্রেয়াসকে দায়িত্ব দেয়ার পর ন্যাটো মিত্রদের আশ্বস্ত করতে গিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশল অব্যাহত রাখবে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইকেল মুলেন ইসরাইল সফর করেন। সেখানে তিনি আইডিএফ প্রধান গ্যাবি আশকেনাজি, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এবং গোয়েন্দা ও পরিকল্পনা ইউনিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান বার্ষিক কৌশলগত সংলাপের অংশ। হারেৎজ পত্রিকার মতে, বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ইরানকে সামনে রেখে প্রস্তুতি গ্রহণ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মুলেন জোর দিয়ে বলেন, আমি সব সময় ইসরাইলের দৃষ্টিকোণ থেকে চ্যালেঞ্জগুলো দেখার চেষ্টা করি। মুলেন ও আশকেনাজি একটি সুরক্ষিত যোগাযোগ লাইনের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন।
ক্রমাগত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি বৃদ্ধি করা নিঃসন্দেহে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। বিশেষভাবে, এটি সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৮৮৭-এরও স্পষ্ট লঙ্ঘন। যেখানে সকল রাষ্ট্রকে পারমাণবিক ইস্যু-সংক্রান্ত বিরোধগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে সনদের বিধান অনুযায়ী সমাধান করার কথা বলা হয়েছে। বল প্রয়োগের মাধ্যমে নয়।
যাদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়- এমন কিছু বিশ্লেষক ইরানের হুমকিকে প্রায় প্রলয়ঙ্কর ভাষায় বর্ণনা করেন। তার মধ্যে আমিতাই এটজিওনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের মুখোমুখি হতে হবে, নতুবা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে দিতে হবে- এর কম কিছু নয়। তিনি দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে গেলে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং অন্যান্য রাষ্ট্র নতুন ইরানি ‘সুপার পাওয়ারের’ দিকে ঝুঁকবে। তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় বললে, এর অর্থ হলো-যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একটি আঞ্চলিক জোট গড়ে উঠতে পারে। মার্কিন সেনাবাহিনীর জার্নাল মিলিটারি রিভিউ এটজিওনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার পাশাপাশি অ-পারমাণবিক সামরিক সম্পদ ও অবকাঠামোতেও হামলার আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ বেসামরিক সমাজকেও এর আওতায় আনা হবে। তার ভাষায়, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আসলে নিষেধাজ্ঞার মতোই। এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য একপাশে রাখলে, প্রকৃত প্রশ্ন হলো- ইরানের হুমকি আসলে কী? এর একটি প্রামাণ্য উত্তর পাওয়া যায় ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে কংগ্রেসে উপস্থাপিত সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
নিঃসন্দেহে, কঠোর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা নিজ জনগণের জন্য একটি হুমকি। যদিও এই দিক থেকে অঞ্চলটির যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর তুলনায় ইরানকে বিশেষভাবে শীর্ষস্থানে রাখা যায় না। তবে সামরিক ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের মূল উদ্বেগ এটি নয়। তাদের দৃষ্টি মূলত ইরান আঞ্চলিক ও বিশ্বের জন্য যে চ্যালেঞ্জ তৈরি তা নিয়ে।
প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট করে জানায়, ইরানের হুমকি সামরিক নয়। দেশটির সামরিক ব্যয় আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তো একেবারেই নগণ্য। ইরানের সামরিক নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে ‘প্রতিরক্ষামূলক’, যার লক্ষ্য হলো কোনো আক্রমণকে ধীর করা এবং সংঘাতের একটি কূটনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা। সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রেও ইরানের সক্ষমতা ‘সীমিত’।
পারমাণবিক বিকল্পের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের সম্ভাবনা খোলা রাখার ইচ্ছা তার প্রতিরোধমূলক কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় অংশ। যদিও ইরান সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের মতো কোনো হুমকি নয়, তবুও তা ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। ইরানের প্রতিরোধক্ষমতাকে সার্বভৌমত্বের একটি অবৈধ প্রয়োগ হিসেবে দেখা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের পথে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করে। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রভাবশালী এক নীতিনির্ধারক এ. এ. বার্লে প্রচলিত ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়ে বলেছিলেন, এসব সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে ‘বিশ্বের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ’। তবে ইরানের ‘হুমকি’ কেবল প্রতিরোধক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়, দেশটি তার প্রভাবও বিস্তৃত করতে চাইছে। ইরানের ‘বর্তমান পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমপ্রসারণ, বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এবং প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’ এই পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়, একই সঙ্গে ইসলামী সংহতির পক্ষে অবস্থান নেয়।
সংক্ষেপে, জেনারেল পেট্রেয়াস যে কারিগরি অর্থে ‘অস্থিতিশীলতা’ শব্দটি ব্যবহার করেন, সেই অর্থে ইরান অঞ্চলকে ‘অস্থিতিশীল’ করার চেষ্টা করছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও সামরিক উপস্থিতি হলো ‘স্থিতিশীলতা’, আর ইরানের নিজ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হলো ‘অস্থিতিশীলতা’-এবং তা স্পষ্টতই অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়। উল্লেখ্য, এই ধরনের পরিভাষার ব্যবহার খুবই সাধারণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিষ্ঠিত জার্নাল ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সম্পাদক ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক জেমস চেস ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটি কারিগরি অর্থেই ব্যবহার করেছিলেন, যখন তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, চিলিতে ‘স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশটিকে ‘অস্থিতিশীল’ করা প্রয়োজন (অর্থাৎ নির্বাচিত আলেন্দে সরকারকে উৎখাত করে পিনোশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা)। এই অভিযোগগুলোর বাইরে, প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ইরান সন্ত্রাসবাদ পরিচালনা ও সমর্থন করছে। তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ‘গত তিন দশকের কিছু ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পেছনে রয়েছে’। যার মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা এবং ২০০৩ সালের পর ইরাকে কোয়ালিশন ও ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অনেক বিদ্রোহী হামলা।’
এ ছাড়া, ইরান হিজবুল্লাহ ও হামাসকে সমর্থন দেয়। নির্বাচনী গুরুত্ব বিবেচনায় তারা যথাক্রমে লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। ২০০৯ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে হিজবুল্লাহ-নেতৃত্বাধীন জোট লেবাননে জনপ্রিয় ভোটে স্পষ্ট বিজয় অর্জন করে। ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি নির্বাচনে হামাস জয়ী হয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গাজায় কঠোর ও নির্মম অবরোধ আরোপ করে-একটি অবাধ নির্বাচনে ‘ভুলভাবে’ ভোট দেয়ার জন্য শাস্তি হিসেবে। আরব বিশ্বে এ দু’টিই ছিল তুলনামূলকভাবে একমাত্র অবাধ নির্বাচন। গণতন্ত্রের সম্ভাব্য ‘হুমকি’ নিয়ে এলিট মহলে উদ্বেগ থাকা এবং তা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে এই ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ-বিশেষত যখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক স্বৈরশাসনগুলোকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। ওবামা তার বিখ্যাত কায়রো ভাষণের পথে নির্মম মিশরীয় শাসক হোসনি মোবারকের প্রশংসা করে এই সমর্থনকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
হামাস ও হিজবুল্লাহ’র ওপর আরোপিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলো একই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের তুলনায় অনেকটাই ম্লান-তবুও সেগুলো পর্যালোচনা করা প্রাসঙ্গিক।
২৫শে মে লেবানন তাদের জাতীয় দিবস ‘লিবারেশন ডে’ উদ্যাপন করে, যা ২২ বছর পর দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলের প্রত্যাহারকে স্মরণ করে-এই প্রত্যাহার হিজবুল্লাহ’র প্রতিরোধের ফল। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে আখ্যা দেয় ‘ইসরাইল-অধিকৃত লেবাননে ইরানি আগ্রাসন’ হিসেবে (এফ্রাইম স্নেহ)। এটিও সাম্রাজ্যবাদী ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহার।
ঠিক একইভাবে, প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি দক্ষিণ ভিয়েতনামে ‘ভিতর থেকে আক্রমণ’-এর নিন্দা করেছিলেন, ‘যা উত্তর দিক থেকে পরিচালিত হচ্ছে।’ কেনেডির বোমা হামলা, রাসায়নিক যুদ্ধ, গ্রামীণ জনগণকে কার্যত বন্দিশিবিরে ঠেলে দেয়ার কর্মসূচি এবং এ ধরনের অন্যান্য ‘উপকারী’ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রতিরোধকে তার জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং উদারপন্থি নায়ক অ্যাডলাই স্টিভেনসন ‘অভ্যন্তরীণ আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাষ্ট্র-অধিকৃত দক্ষিণে নিজেদের স্বদেশবাসীদের প্রতি উত্তর ভিয়েতনামের সমর্থনকেও আগ্রাসন হিসেবে দেখা হয়-যা ওয়াশিংটনের তথাকথিত ন্যায্য মিশনে অসহনীয় হস্তক্ষেপ।
কেনেডির উপদেষ্টা আর্থার শ্লেসিঙ্গার ও থিওডোর সোরেনসন- যাদেরকে তুলনামূলকভাবে ‘ডাভ’ বা নরমপন্থি হিসেবে বিবেচনা করা হতো তারাও দক্ষিণ ভিয়েতনামে ‘আগ্রাসন’ প্রতিহত করতে ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপকে প্রশংসা করেছিলেন।
যদিও তারা জানতেন, এটি ছিল স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন; অন্তত তারা যদি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন পড়ে থাকেন।
১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ ‘আগ্রাসন’-এর বিভিন্ন ধরন নির্ধারণ করেছিল, যার মধ্যে ছিল ‘সশস্ত্র আগ্রাসন ছাড়া অন্যান্য আগ্রাসন-যেমন রাজনৈতিক যুদ্ধ।’ উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো পুলিশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ গণ-আন্দোলন, কিংবা এমন নির্বাচন যার ফলাফল পছন্দসই নয়।
এ ধরনের পরিভাষার ব্যবহার একাডেমিক গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও প্রচলিত-এবং তা বোধগম্য হয়ে ওঠে সেই প্রচলিত ধারণার আলোকে, যেখানে ধরে নেয়া হয় ‘বিশ্বটা আমাদেরই।’
হামাস ইসরাইলের সামরিক দখলদারিত্ব এবং অধিকৃত অঞ্চলে তার অবৈধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় (রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না)। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় না বরং কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক ও দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে যাতে ফিলিস্তিন কোনো অর্থবহ রূপে কখনোই রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।
ইসরাইলের ক্ষমতাসীন দল ১৯৯৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যেকোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করে-যা এর এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের তুলনায় এক ধরনের ‘সমঝোতার’ দিকেই অগ্রসর হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল ইসরাইল ও জর্ডানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ‘আর কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ থাকতে পারে না। জর্ডানকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সিদ্ধান্তে একটি ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। সেখানে বসবাসকারী জনগণ ও সরকারের মতামত যাই হোক না কেন।
হামাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা সীমান্তবর্তী ইসরাইলি বসতিগুলোর দিকে রকেট নিক্ষেপ করে-নিঃসন্দেহে এটি অপরাধমূলক কাজ, তবে গাজায়, এমনকি অন্যান্য অঞ্চলে ইসরাইলের সহিংসতার তুলনায় তা সামান্য। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা জরুরি যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল খুব ভালোভাবেই জানে কীভাবে তারা এই সন্ত্রাস বন্ধ করতে পারে, যার বিরুদ্ধে তারা এত জোরালোভাবে কথা বলে।
ইসরাইল নিজেই স্বীকার করেছে যে, ২০০৮ সালে হামাসের সঙ্গে আংশিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সময় কোনো রকেট হামলা হয়নি। হামাস যুদ্ধবিরতি নবায়নের প্রস্তাব দিলেও ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ব্যাপক প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক ‘অপারেশন কাস্ট লিড’ শুরু করে-যা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল। আইনগত বা নৈতিক-কোনো ক্ষেত্রেই যার গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এটি ছিল এক নির্মম আগ্রাসনের উদাহরণ।
গুরুতর সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের একটি মডেল হিসেবে তুরস্ককে বিবেচনা করা হয়, যেখানে তুলনামূলকভাবে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবুও যুক্তরাষ্ট্রে দেশটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ছিল, যখন তুরস্কের সরকার দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ইরাক আক্রমণে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে ওয়াশিংটন থেকে কঠোর সমালোচনা আসে। কারণ তাদের মতে তুরস্ক ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকার কীভাবে আচরণ করা উচিত’ তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের গণতন্ত্রের ধারণায় নীতিনির্ধারণে জনগণের প্রায় সর্বসম্মত মত নয়, বরং ‘প্রভুর কণ্ঠস্বরই’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
ওবামা প্রশাসন আবারো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যখন তুরস্ক ও ব্রাজিল মিলে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদনে ভূমিকা রাখে, যার লক্ষ্য ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাকে লেখা এক চিঠিতে ওবামা এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন- সম্ভবত এই ধারণা থেকে যে, এটি ব্যর্থ হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে প্রচারণার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারবে। কিন্তু চুক্তিটি সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় এবং দ্রুত নিরাপত্তা পরিষদে নতুন নিষেধাজ্ঞা পাস করিয়ে সেটিকে কার্যত ভণ্ডুল করে দেয়। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো এতটাই অর্থহীন ছিল যে, চীন সহজেই এতে সম্মতি দেয়। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, এতে সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা হলো ইরানের সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতায় পশ্চিমা স্বার্থ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। আবারো ওয়াশিংটন দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নেয়, যাতে অন্য কেউ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
অপ্রত্যাশিত নয় যে, তুরস্ক (ব্রাজিলসহ) নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। অন্য আঞ্চলিক সদস্য লেবানন ভোটদানে বিরত থাকে। এসব পদক্ষেপ ওয়াশিংটনে আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ওবামা প্রশাসনের ইউরোপীয় বিষয়ক শীর্ষ কূটনীতিক ফিলিপ গর্ডন তুরস্ককে সতর্ক করে বলেন, তাদের এই আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের বোধগম্য নয় এবং তাদের ‘পশ্চিমা অংশীদারিত্বের প্রতি অঙ্গীকার প্রদর্শন’ করতে হবে। এপি জানায়, ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো মিত্রের প্রতি এটি ছিল বিরল ধরনের তিরস্কার।’
রাজনৈতিক মহলও বিষয়টি একইভাবে দেখেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক স্টিভেন এ. কুক মন্তব্য করেন, এখন মূল প্রশ্ন হলো-‘আমরা কীভাবে তুরস্ককে তাদের সীমার মধ্যে রাখবো?’। অর্থাৎ ‘গণতন্ত্রের একজন ভালো অনুসারী’ হিসেবে নির্দেশ মেনে চলা। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি শিরোনাম এই সামগ্রিক মনোভাবকে ধারণ করে: ‘ইরান চুক্তি ব্রাজিলের নেতার উত্তরাধিকারের একটি দাগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’ সংক্ষেপে-আমাদের কথামতো চলো, নতুবা পরিণতি ভোগ করো।
অঞ্চলের অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে তুরস্কের তুলনায় বেশি সমর্থন করে- এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। উদাহরণস্বরূপ, ইরানের বিপরীত সীমান্তে পাকিস্তান ও ইরান, তুরস্কে বৈঠক করে, সমপ্রতি একটি নতুন পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও উদ্বেগজনক হলো- এই পাইপলাইনটি ভারত পর্যন্ত সমপ্রসারিত হতে পারে। ২০০৮ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে সমর্থন করে তা মূলত ভারতকে এই পাইপলাইনে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইনস্টিটিউট অব পিসের দক্ষিণ এশিয়া উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ এই প্রচলিত ব্যাখ্যাই তুলে ধরেন। ভারত ও পাকিস্তান-এই দুই দেশ তিনটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে রয়েছে যারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি; তৃতীয় দেশটি ইসরাইল। এ তিনটিই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে এবং এখনো করছে।
কোনো সুস্থ মানুষই ইরান বা অন্য কোনো দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক, তা চায় না। এই হুমকি কমানো বা দূর করার একটি সুস্পষ্ট উপায় হলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। ২০১০ সালের মে মাসের শুরুতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এনপিটি সম্মেলনে বিষয়টি আবারো উত্থাপিত হয়। ১১৮টি নিরপেক্ষ আন্দোলনভুক্ত দেশের চেয়ারম্যান হিসেবে মিশর প্রস্তাব দেয়, ১৯৯৫ সালের এনপিটি পর্যালোচনা সম্মেলনে পশ্চিমা দেশগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার ভিত্তিতে ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গঠনের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করা হোক।
(নোয়াম চমস্কি একাধারে একজন ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জনকও বলা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তীক্ষ্ণ সমালোচক।)
মূল: নোয়াম চমস্কি
অনুবাদ: আব্দুল কাইয়ুম