জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে বলে অনেকে মনে করলেও আমার তা মনে হয় না। গণ-অভ্যুত্থানের প্রাথমিক লক্ষ্য অবশ্যই অর্জিত হয়েছে। তা হলো বলদর্পী শেখ হাসিনা সরকারের পতন। পতন এত তীব্র ছিল যে, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূলের বিতর্কিত লোকটিকেও পালাতে হয়েছে। দু’বছর পর কথা উঠেছে অবশ্য, তারা ফিরবেন কিনা আর ফিরলে কীভাবে? সে আরেক প্রসঙ্গ। তা নিয়ে অন্য নিবন্ধে হয়তো আলোচনা করা যাবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আরও একটা লক্ষ্য ছিল বলে অনেকে মনে করেন। তা হলো- ‘মৌলিক সংস্কার’, রাষ্ট্র সংস্কার যার অন্য নাম। সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া সেটির অর্জন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যের কথা সামনে এসেছিল গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে বিক্ষিপ্তভাবে। পরে ৩রা আগস্ট এটা সামনে আসে ঘোষণা আকারে; কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সুবিপুল জমায়েতে। অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা ছাত্র-তরুণদের নেতা নাহিদ ইসলামের মুখে। সমাবেশে উপস্থিত কেউ বলেনি যে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজন নেই।
হাসিনা সরকারের পতন চাওয়া যেকোনো রাজনীতিসচেতন মানুষ জানতো, কীভাবে ওই সরকার জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে তুলেছিল। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এর পতন ঘটানো ছিল অসম্ভব। রাষ্ট্র সংস্কার না হলে দীর্ঘদিন পর আবার হয়তো হাসিনাতন্ত্রের মতো কিছু একটার উদ্ভব ঘটবে, যেটাকে হটাতে আবার নামতে হবে রাজপথে। হয়তো আবার নির্বাচন ব্যবস্থাটাও নষ্ট করে ফেলা হবে আর সে কারণে সরকার বদলও হয়ে উঠবে অসম্ভব! মানুষ জানতো, আর কিছু না হলেও অন্তত নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার এনে সরকার বদলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সেটা করা গেলে ডরেভয়ে হলেও খুব বেশি অপশাসন চাপিয়ে দেয়ার সাহস করবে না কোনো সরকার।
নির্বাচন ব্যবস্থার বাইরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রশ্ন কিন্তু সামনে আনা হয়েছিল আরও আগে; বিএনপি’র ৩১ দফায়। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সহযোগী দলগুলোর সঙ্গে বসে ওই দফা চূড়ান্ত করেছিল বিএনপি জুলাই আন্দোলনেরও বেশ আগে। বিএনপি তখন ভাবতে পারেনি, এত রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান হবে। সেটা কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল! কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শুরুর সময়েও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল, সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সরকারের পতন ঘটাতে চাইবে? সেটা আসলে ঘটিয়ে দিয়েছিল খোদ শেখ হাসিনা গং। আন্দোলন দমনে তারা যেভাবে হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিলেন, তাতে মানুষের আর খালি হাতে ঘরে ফেরার সুযোগ ছিল না। শেখ হাসিনা অবশ্য পারতেন আরও আগে পদত্যাগ করে সরে দাঁড়াতে; কিন্তু পতন ঠেকানোর কোনো সুযোগ তার আর ছিল না।
শেখ হাসিনা চলছিলেন সংস্কারের বিপরীত দিকে; উল্টো সংস্কার করে করে। উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দল দমন; কোনো প্রতিপক্ষকেই দাঁড়াতে না দেয়া। এর পাশাপাশি অর্থনীতিতেও লুটতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট থেকে ব্যাংক লুটের সুযোগ করে দেয়া অব্দি কিনা করেছিলেন শেখ হাসিনা! অথচ তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আয়োজিত নির্বাচনের মাধ্যমে।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটাই ছিল এক বড় ধরনের সংস্কার, হাসিনা গং সুযোগ পেয়েই যা বাতিল করে দেয়। অথচ ওই নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আরেকটি গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে, যেটা ‘নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান’ বলে পরিচিত। তার ফসল আবার ছিল তিন জোটের রূপরেখা। এর বাস্তবায়ন অবশ্য করেনি পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসা কোনো সরকারই। অনেকেই মনে করেন, তিন জোটের রূপরেখার মোটামুটি বাস্তবায়ন হলেও বড় পরিবর্তন আসতো রাজনীতিতে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরবর্তী অবনমন অন্তত রোধ করা যেত। সেই পথেই কিন্তু হাসিনা সরকারের মতো একটি সরকার এসে জনগণের টুঁটি চেপে ধরতে পারলো। নিজের স্বাভাবিক প্রস্থানের সুযোগ রাখার কথাও যে সরকার ভাবলো না!
সংস্কার, এমনকি রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি তাই নতুন নয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন নেতৃত্বাধীন প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অল্পদিনেও এর অন্যতম উপদেষ্টা ড. রেহমান সোবহানের উদ্যোগে দেশের বিশিষ্টজনরা খাতওয়ারি সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু কাজ করে গিয়েছিলেন; যা নাকি পরে কেউ খুলেও দেখেনি। হয়তো রাষ্ট্র সংস্কারের আলাপ সরাসরি আসেনি; কিন্তু উন্নয়নের জন্য সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নানাভাবেই সামনে আনা হচ্ছিল। রাজনীতিকরাও সেটা অনুসরণ না করলেও এর প্রয়োজনীয়তা উড়িয়ে দিতে পারছিলেন না। অবশ্য তাদের অপশাসনের কদর্য রূপটি হাসিনা সরকারের মতো করে সামনে আসেনি বলে রাজনীতিসচেতন মানুষও তখন পর্যন্ত রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে সেইভাবে সোচ্চার হয়নি।
সত্যি বলতে, জুলাই আন্দোলন সেই সুযোগ সৃষ্টি করে। গতানুগতিক রাজনৈতিক নেতৃত্বে ওই ধরনের আন্দোলন সম্ভব ছিল কিনা, এমন প্রশ্ন অবশ্য অনেকে তোলেন। যা ঘটেনি, সেই বিষয়ে যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য দেয়া তো কঠিন। আমরা কেবল পারি যা ঘটে গেছে, তা ব্যাখ্যা করতে। জুলাই আন্দোলনে যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা পরে যে অবস্থানই নিন না কেন- তারাই প্রবলভাবে সামনে এনেছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠে আসা নিয়েও আলাদা নিবন্ধ লেখা সম্ভব। তবে সামনে যেটা এসেছিল, তাতে হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নামা কোনো পক্ষেরই আপত্তি ছিল না। কারণ এর প্রয়োজনীয়তা ছিল স্পষ্ট আর এর একটা ইতিহাসও ছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারও নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের আগে সংস্কারে অগ্রগতি আনার বিষয়টিকে এজেন্ডা বানিয়েছিল। তাদের ঘোষিত কাজ ছিল তিনটি। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। সংস্কারকে ভাগ করেও দেখিয়েছিলেন তারা। যেসব সংস্কার আনতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে না, সেগুলো এক ধরনের। আর মৌলিক সংস্কার হলো সেগুলো, যেগুলোর জন্য সংবিধানে আনতে হবে সংশোধন। এর আগে সংস্কারের প্রশ্নটি কখনো এত গুরুত্ব পায়নি। এটাকেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সার্থকতা বলতে হবে। মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দলই কিন্তু এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা প্রবেশ করেছিল নজিরবিহীন সংস্কার আলোচনায়। অনেক প্রশ্নে তাদের মধ্যে ঐকমত্যও তৈরি হয়েছিল। এখন রাজনীতিসচেতন মানুষের দাবি, ওইটুকু সংস্কার অন্তত হোক।
যেসব প্রশ্নে দলগুলো একমত হতে পারেনি, সেগুলোর বাস্তবায়ন কাউকে দিয়ে জোরপূর্বক করানো যাবে না। এ ধরনের চেষ্টা বরং হঠকারী বলে বিবেচিত হবে। বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার কাছে বরং এই দাবি রাখা যায় যে, দলটি তাদের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করুক। নির্বাচনী ইশতেহারে যা যা বলা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করুক। এসব করে পরবর্তী নির্বাচনে জনতার রায় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতেও সচেষ্ট হোক। এদেশে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় ফেরার নজির নেই। প্রতিশ্রুত সংস্কার করে আর সুশাসন দিয়ে সেই নজির সৃষ্টি করুক বিএনপি। তাকে তো কেউ বাধা দেবে না।
বিএনপি সরকার অবশ্য সংস্কারের পথে হাঁটছে বলে মনে হয় না। গত প্রায় ছয় মাসে তারা কোন কোন ‘মৌলিক সংস্কার’ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করেছেন জানতে চাইলে এর সদুত্তর জোগানো কঠিন। আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে আসার পর সংসদে কেমন বিল পাস হয়, সেটাও দেখতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে কিছু আইনগত সংস্কারের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেখা যাক, এ ক্ষেত্রেও কী হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আসছে স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে সরকার ইসিকে সহায়তা জোগাবে কিনা। এরই মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের কাজটিও মনে হয় শেষ করে ফেলবে বিএনপি। রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু অর্থবহ ক্ষমতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একটু সংযত রাখার বিষয়েও একমত হয়েছিল বিএনপি। ৩১ দফায় অস্পষ্টভাবে হলেও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ছিল। এখন এ ক্ষেত্রে কিছু করতে হলে কিন্তু অস্পষ্টতা রাখা যাবে না।
জুলাই সনদে আবার সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। বিএনপি সরকার সেটা করবে বলে এখনো মনে হচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর কি তারা উচ্চকক্ষ গঠনের দিকে যাবেন? তবে বিএনপি যেভাবে উচ্চকক্ষ গঠনে রাজি হয়েছিল, সেভাবে এটি গঠনের কোনো মানে নেই। দলটি চাইলে অবশ্য তার মতো করেই বিল আনতে পারবে। বিরোধী দল সেখানে কী অবস্থান নেবে, কে জানে। তারা অবশ্য পারেন বিএনপিকে কিছু বিষয় নতুন করে বুঝিয়ে বলতে। সংস্কার চাইলে সেটা যে অর্থবহ আর টেকসই করেই করতে হয়, এটা অবশ্য বিএনপিকে বোঝাতে হবে কেন?
জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী দল না হয়ে ক্ষমতায় যেতে পারলে কতোটা কী সংস্কার করতো, জানি না। আমরা দেখছি, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এবং তারা সংস্কারে আজতক কমবেশি অনিচ্ছুক। গভর্নরসহ বিভিন্ন পদে যেভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাতে সংস্কারের মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে বলা যাবে না। সংসদে যেসব অধ্যাদেশ পাস করেছে আর যেগুলো করেনি, তাতেও সংস্কারের মনোভাব গরহাজির বললে কাউকে দোষ দেয়া যাবে না। বিরোধীদের দিক থেকে উস্কানি থাকলেও তাদেরকে মোকাবিলার ধরনটায় নতুনত্ব আছে কী? যে ধারায় প্রথম বাজেট দেয়া হয়েছে, সেটাকেও পুরনো বললে ভুল হবে না। বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারও মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করাও যে নেতার কাজ, সেটা ভুলে গেলে কি চলে?
মৌলিক সংস্কার না করে তারেক রহমান সরকার কি পারবে সুশাসন দিতে? বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক সংস্থাগুলোয় সংস্কার না এনে সেগুলোকে নিয়োজিত করা যাবে কি ন্যায়বিচার আর জনকল্যাণে? প্রশাসনিক সংস্কার না করে কি কেবল নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের দিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণ সম্ভব?
ধরা যাক, একটি মৌলিক সংস্কারেও আগ্রহ দেখালো না বিএনপি সরকার। সংস্কার না করেও ক্ষমতায় থাকতে পারা যেহেতু যাচ্ছে, সে কারণেও ধরা যাক তারা সংস্কারে অনিচ্ছুক। সে ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক সংস্কার যেন হয়। সেটা হলো ত্রুটিমুক্তভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। এর অপব্যবহারের চেষ্টাও যেন আর পরিলক্ষিত না হয়। তাহলে জনগণের হাতে অন্তত সরকার পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ উপায়টি থাকবে। সেটুকু থাকলেও হাসিনাতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। সংস্কারবিমুখ আর সুশাসনে অনিচ্ছুক হলে জনগণও ক্ষমতাসীন দলকে ফিরতে দেবে না ক্ষমতায়। সেই কারণে একটা ভয়ডর অন্তত থাকবে। সেটা যথেষ্ট না হলেও সামান্য নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট