আনন্দবাজারকে শেখ হাসিনা

‘দেশের মাটিতে ফিরেই মরবো’

জনতার চোখ ডেস্ক | এক্সক্লুসিভ
সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
‘দেশের মাটিতে ফিরেই মরবো’

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমপ্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার-কে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাংবাদিক অগ্নি রায়ের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচন, তার সরকারের বিদেশনীতি, দেশে ফেরা, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেন।

 

জেনেশুনেই বড় ঝুঁকি নিচ্ছি: ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং গ্রেপ্তার বা প্রাণহানির আশঙ্কা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সবদিক বিবেচনা করে জেনেশুনেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে পথেই যাই না কেন, বিমানে বা সড়কে, আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে মেরে ফেলতে পারে। কোনো অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন অত্যাচার চালাতে পারে।’ তবে দেশের মানুষের শোচনীয় পরিস্থিতি ও কষ্টের কথা ভেবেই তার এই সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি। তার কথায়, ‘আমার জীবনে যা-ই হোক, দেশের মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।’


আওয়ামী লীগের দায়িত্বে কে?: দেশে এসে গ্রেপ্তার হলে দল কে চালাবেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যুগ যুগ ধরেই আওয়ামী লীগে একটি কাঠামো রয়েছে। দলের সভাপতি অনুপস্থিত থাকলে পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাই দল পরিচালনা করবেন। শেখ হাসিনা বলেন, এই নিয়ম তিনি তৈরি করেননি, এটি তার বাবা বঙ্গবন্ধুর সময় থেকেই চলে আসছে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘পার্টি সংবিধানে বলা আছে, নেতা না থাকলে পরবর্তী যিনি থাকবেন, দায়িত্ব নেবেন। অথবা সকলে মিলে বসে একটা সিদ্ধান্ত নেবেন।’ ৫ই আগস্টের সংবাদ সম্মেলনের জেরে বর্তমান সরকার প্রধান তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে সফর বাতিলের বিষয়টি হাস্যকর বলেন শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তার একটি সংবাদ সম্মেলনই কি সরকার প্রধানের প্রতিবেশী দেশে আসা আটকে দেয়ার জন্য যথেষ্ট?
 

বিএনপি এবং জামায়াত আলাদা কিছু নয়: জামায়াতে ইসলামীর প্রসার এবং বিএনপি-জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এবং জামায়াত আলাদা কিছু নয়।’ তিনি জানান, স্বাধীনতার সময় জামায়াত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল। আলবদর, রাজাকার বাহিনী তাদের দিয়েই গঠন করা হয়েছিল। তারা এ দেশে গণহত্যা চালাতে পাকিস্তানকে সহায়তা করে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। যেহেতু পাকিস্তান একটি আলাদা রাষ্ট্র, তাই স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাদের বিচার করা হয় পার্লামেন্টে আইন এনে, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। অন্যদিকে তিনি তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার সাধারণ আইনে করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন সেই ট্রাইব্যুনালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
 

আওয়ামী লীগ অংশ নিলে জামায়াতের প্রসার হতো না: ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেয়ার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূস অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি (হাসিনা) অনুরোধ করেছিলেন, তিনি নিজে প্রার্থী না হলেও তার দলকে যেন অংশ নিতে দেয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বা কোনো গণতান্ত্রিক দেশ এ নিয়ে সরব হয়নি। আওয়ামী লীগের ৫০ শতাংশের বেশি ভোটারকে বঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবাই বাহবা দিয়ে ভোটের ফলাফল মেনে নিলেন। জামায়াত ৭০টি আসন নিয়ে সংসদে বসলো। আন্তর্জাতিক সংগঠন যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে চাপ দিতে পারতো, তাহলে আজ জামায়াতের এই প্রসার হতো না।’
বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ ক্রমবর্ধমান- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদেশনীতি ছিল সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব তৈরি করে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের আর্থ-সামাজিক বিকাশ ঘটানোই ছিল তার লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হলে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাদের দায়িত্ব থেকেই যায়’। 
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি তাদের সময়ে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সকলের’ স্লোগানের মাধ্যমে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বজায় ছিল বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময়ই শুদ্ধিকরণের মধ্যে থাকে। তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ’৯০ সালে যিনি ৬ হাজার টাকা বেতনে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হন, আজ বিশ্বব্যাপী তার এত বিপুল সম্পত্তি হলো কীভাবে? আজ চরম দুর্নীতিবাজ যারা, তারা আমাদের দুর্নীতির বিচার করছে।’
 

দেশের মাটিতে ফিরেই মরবো: বাংলাদেশ সরকারের তাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তিনি নিজেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বরাবর মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেছি। এবার যদি মরতে হয়, দেশের মাটিতে ফিরেই মরবো। মানুষ তো মরণশীল। ফলে যত বাধাই আসুক, আমায় যেতেই হবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে।’ বেঁচে থেকে নিজের চোখে নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার দেখে চুপ করে থাকতে পারবেন না বলেও তিনি জানান। 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর