ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক! এটা নিছক সম্পর্ক নয় বরং নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা-বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, ভূ-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি- এমন কোনো উপাদান নেই যা এই সম্পর্কে অনুপস্থিত। পারস্পরিক নির্ভরতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ-বাংলাদেশ ও ভারত।
ইস্যু অনেক। আলোচনা, ভুল বোঝাবুঝি, চুক্তি-সমঝোতা কিংবা টানাপড়েনের ক্ষেত্র অবারিত। কিন্তু সমপ্রতি বহুমাত্রিক সম্পর্কটি যেন আটকে গেছে একটি ইস্যুতে! ঘনিষ্ঠ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে দীর্ঘ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে তার অবস্থান, তাকে ঘিরে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রত্যর্পণের দাবি এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। গত আড়াই বছরের টালিখাতা অন্তত সেটাই বলছে। যদিও পেশাদাররা কোনোভাবেই ‘আটকে থাকার’ বিষয়টি স্বীকার করেন না। একান্ত আলাপচারিতাতেও নয়। কূটনীতির মারপ্যাঁচে বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। নানা ব্যাখ্যা দেন তারা। সম্পর্কের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে বিষয়গুলো স্পষ্ট।
ওয়াকিবহাল সূত্র মতে, হাসিনা ইস্যুই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রায় সব বিষয়কে ছাড়িয়ে গেছে। ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা এখন দুই দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাতেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলছে। ঢাকার কাছে তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ন্যায়বিচার ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। দিল্লি এটাকে ব্যাখ্যা করছে ভিন্নভাবে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ফারাক অনেক। আর এটি যত প্রলম্বিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে অস্বস্তি।
সেগুনবাগিচার কর্মকর্তাদের মতে, ‘ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক’ এখন উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচ্য। হাইকমিশনে পদস্থ কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাদাররা নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন তথা আদান-প্রদান করছেন মাত্র। রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় আলোচনার কাঠামোতে এই পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি তাদের। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সেদিন ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেন- রাজনৈতিক আলোচনায় কখনোই কর্মকর্তারা যুক্ত থাকেন না, এটা উচিতও নয়। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তো নয়ই।
পর্দার আড়ালে অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে হাসিনা ইস্যুটিকে অ্যাড্রেস করার চেষ্টা চলছে- এমন ধারণা দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে বিভিন্ন ফর্মে যে আলোচনা চলছে- সেটা অনুমেয়। কারণ কিছু বিষয় তো ফরেন অফিসকে পাস করতে বলা হয়। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন যে নির্দেশনা আসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘পোস্ট অফিস’ হিসেবে সেটি বাস্তবায়ন করে- দাবি করে ওই কর্মকর্তা বলেন- পেশাদাররা বরাবরই তা করে থাকেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার আশ্রয় প্রশ্নে তেমন রা নেই অভ্যুত্থানে যুক্ত শক্তিগুলোর। কিন্তু ভারতের মাটি ব্যবহার করে তিনি যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে ‘অস্থিতিশীল’ করতে না পারেন তা নিয়ে আগাগোড়াই সতর্ক বর্তমান সরকার। বিদায়ী ইউনূস সরকারও এমন সতর্কতা জারি রেখেছিল শেষ অব্দি। ঢাকা চায় বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে ভারত যেন দ্রুত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করে। কিন্তু দিল্লি এখনো বিষয়টিকে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখেছে। ফলে এ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। বরং পুরনো প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে- দিল্লি হাসিনাকে কীভাবে দেখছে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কতোটা গ্রহণ করছে?
ঢাকা মনে করে দিল্লিতে হাসিনার অবস্থান এখন শুধু প্রত্যর্পণের আইনি প্রশ্ন নয়। বরং এটি দিনে দিনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও অংশ হয়ে উঠছে। তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে বারবার। আগস্টে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এর মাধ্যমে ঢাকা একদিকে হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ভারতকে পুরোপুরি দূরে ঠেলে দিচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী কার্যকর সম্পর্ক ও অব্যাহত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিল্লির কাছে যথেষ্ট। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু পারস্পরিক নির্ভরতার এই জায়গা সংকুচিত হয়ে যায় যখন শেখ হাসিনার মতো রাজনৈতিক ইস্যু সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে।
বাস্তবতা হলো-এই মুহূর্তে হাসিনা ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অমীমাংসিত বিষয়- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দৃশ্যমান বা প্রকাশ্যে যতটুকু বলা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আলোচনা চলছে পর্দার আড়ালে। কূটনীতিতে নীরবতাও ভাষা, অপেক্ষা একটি কৌশল। ফলে বিদ্যমান অবস্থাকে চূড়ান্ত ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। আলোচনার গতিমুখ যখন তখন পাল্টে যেতে পারে। সামনে আসতে পারে নতুন সমীকরণ।