বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান বা ১৯৪৭ থেকে পরের আট দশকের বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকজন অতি জনপ্রিয় সম্মোহনী রাজনৈতিক নেতার দেখা পেয়েছি আমরা। বাংলার মুসলমানরা ১৯৪৬ সালে ভোট দিয়ে পাকিস্তান চাইলেও এর প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম লীগের প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র অবকাশ হয়নি বাঙালির সমীহ ও ভালোবাসা পাওয়ার। তিনি দূরের মানুষই ছিলেন। আর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে বাংলা ভাষার দাবি অগ্রাহ্য করে উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে ঘোষণা দিয়ে বাঙালির মন থেকে আরও দূরে সরে যান। তুমুল জনপ্রিয়তা পান শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও সেকালের তরুণ নেতা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শেখ মুজিবুর রহমান। শেষোক্ত জন বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ইতিহাসে কীর্তি ও জনপ্রিয়তায় বাকি চারজনকেই ছাড়িয়ে যান।
স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরে জনপ্রিয়তা ও দেশকে প্রভাবিত করার দিক থেকে দু’জন নেতা সর্বাধিক উচ্চতায় ওঠেন। তারা পিতা-পুত্রী। প্রথম জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের ২৫ বছর সংগ্রামী জীবন শেষে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে শাসন চালিয়েছেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি সেনাবাহিনীর একটি চক্রান্তকারী গ্রুপের হাতে পরিবারের প্রায় সকল সদস্যসহ নিজ বাড়িতে নিহত হন। তারই মন্ত্রিসভার এক সদস্য খন্দকার মোশ্তাক আহমেদ ও বিদেশি কিছু মহল চক্রান্তে শরিক ছিল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। আর দ্বিতীয় জন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা যিনি টানা ৪৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি রয়েছেন এবং পাঁচ দফায় মোট ২১ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মাঝে কয়েক বছর ছিলেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। তার বোন শেখ রেহানাসহ দু’জনই মাত্র পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকায় ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যান।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনেছেন, আর অনেক প্রতিকূলতা ও চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও শেখ হাসিনা যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশ্বদরবারে দেশকে পশ্চাদপদতা ও স্বল্পোন্নত স্তর থেকে উন্নয়নশীল ও আধুনিকতার স্তরে নিয়ে এসেছেন। স্ব স্ব ভূমিকায় রাজনীতিতে উভয়ের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক ছিল যা তাদেরকে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী অবস্থানে পৌঁছে দেয়, যেখান থেকে তারা গণতন্ত্রের সীমা অতিক্রম করতে থাকেন। স্ব স্ব সময়ে বিশেষ করে তাদের দল, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মধ্যে তারা হয়ে ওঠেন ‘একক নেতা’। দেশে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকারী নেতা হয়েও উভয়ে দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর সময়ের ঐতিহাসিক স্তর ও বাস্তবতার বিবেচনায় তা তেমন ক্ষতিকর না হলেও শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে একক নেতা হিসেবে দেখার ও প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা ঐ দলের নেতাকর্মীদের ‘এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ স্লোগানে প্রতিভাত হয়। বঙ্গবন্ধু কখনো এই স্লোগানকে বারণ বা নিরুৎসাহিত করেননি। গভীরভাবে দেখলে এই স্লোগানের মধ্যে ফ্যাসিবাদী চিন্তার অনুরণন পাওয়া যায়। অথচ রাজনৈতিক-আদর্শবাদী দিক থেকে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী দল নয়, গণতান্ত্রিক ও গণভিত্তিক দল। তাই ঐ প্রবণতাকে আওয়ামী লীগের চরিত্র নয়, বরং স্খলন বলে ধরা যায়। দেশে আওয়ামী লীগেরই প্রবর্তিত সাংবিধানিক সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ও নাগরিকদের সক্রিয়তা থাকলে এই প্রবণতা রোধ করা যায়। ইউরোপ-আমেরিকার পশ্চিমা গণতন্ত্রেও তা-ই হয়।
স্বাধীনতার পরপরই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিগুলো যখন বঙ্গবন্ধুর সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য থানা আক্রমণ, পাটের গুদামে আগুন প্রভৃতি নাশকতামূলক কাজ চালায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অসহযোগিতা করে জরুরি খাদ্য সাহায্য আটকিয়ে দিয়ে দেশে দুর্ভিক্ষ ঘটায়, দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে তখন সে অবস্থা মোকাবিলার জন্য বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগসহ সকল দল নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ শ্রমিক-কৃষক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে জাতীয় দল গঠন করে, সংবিধান সংশোধন করে নিজে রাষ্ট্রপতি হয়ে সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করেন। ঐ ব্যবস্থায় তিনি তার বিখ্যাত উক্তি ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’র স্বপ্নে সমাজতন্ত্রমুখিন জনকল্যাণমূলক অর্থনীতির লক্ষ্যে ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তবে সবকিছু ভেস্তে যায় কয়েক মাস পরে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ায়। পরে আওয়ামী লীগও ঘোষণা দিয়ে বাকশাল পদ্ধতি পরিত্যাগ করে। হিমালয়সম উচ্চতার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের নেতার একক নেতৃত্বের তখন এমনই বাস্তবতা ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর বামপন্থি মিত্ররাও বাকশাল প্রশ্নে দ্বিমত থাকলেও তাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাকে ছাড়া দেশের স্বাধীনতা রক্ষা দুরূহ ছিল। তাই মনে করা হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বের কাছে দেশের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া সাময়িক ব্যাপার। স্বাধীনতা রক্ষা পেলে, পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে।
বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব বা এক ব্যক্তির উপর নির্ভরতার উপায়ান্তর না থাকলেও ওই নির্ভরতার করুণ পরিণতি দেখা গেল শত্রুরা তাকে হত্যা করলে। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু ধসে পড়লো। রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থনীতির ক্ষেত্রে নগ্ন শোষণমূলক পুঁজিবাদ ঠেকানোর পদক্ষেপসহ মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো বিপন্ন হয়ে পড়লো। ঘুরে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগলো। ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারলো, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পথে দেশকে ফেরানোর আংশিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো।
আবার শেখ হাসিনার শাসনামলে বঙ্গবন্ধুকে ‘একক নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার এক অনৈতিহাসিক ভ্রান্ত চেষ্টা চালানো হলো। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তথা পাকিস্তানে বন্দি থাকা অবস্থায় তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী প্রমুখ তার যে যোগ্য সহকর্মীরা প্রবাসী অস্থায়ী সরকার গঠন করে জাতীয়-আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক পর্বতপ্রমাণ বাধা ঠেলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে দেশ স্বাধীন করলেন সেই নেতাদের নীরবে বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ‘একক নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার নানা আয়োজন হলো। এমনকি ২০১৭ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সঙ্গে সরকারের তীব্র ও কুৎসিত দ্বন্দ্বে মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর ‘একক নেতৃত্বে’ হয়েছিল বলে আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল। এসবের ফল ভালো হয়নি।
দীর্ঘ সময় দলের প্রধান থাকা ও একাধিকবার নির্বাচনকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে একটানা প্রধানমন্ত্রী থাকার মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা তার দলের মধ্যে সার্বিকভাবে ‘একক নেত্রী’ হয়ে উঠেছেন। দলে গণতান্ত্রিক চর্চার লেশমাত্র নেই। দলের গঠনতন্ত্র কৌশলে পাশ কাটিয়ে তথা দলের কাউন্সিলে ‘গণতান্ত্রিকভাবে’ সকল ক্ষমতা সভানেত্রীর হাতে ন্যস্ত করে উপর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল কমিটি ও পদ শেখ হাসিনার দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। দলে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনি। হাইব্রিড বলে কথিত নানা বিকৃতি ও দুর্নীতির বিস্তার হয়েছে।
২০২৪ সালে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ঐ বছর ৫ই আগস্ট থেকে শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে রয়েছেন। দলের নেতারাও দেশান্তরী। দলের কার্যক্রম সরকারি আইন দিয়ে নিষিদ্ধ। তৃণমূলের কর্মীরা ঘুরে দঁড়ানোর কষ্টকর চেষ্টা চালাচ্ছেন মামলা হামলা জেল-জুলুম এমনকি বাড়ি আক্রমণের মতো অত্যাচারের মধ্যে। তৃণমূলের নেতাদের প্রেরণাও একমাত্র শেখ হাসিনার কাছ থেকেই আসে। তবে ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ও গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট ও দেশে বিশৃঙ্খলার মধ্যে, মুক্তিযুদ্ধের সকল ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্মারক ধ্বংস করতে উন্মত্ততার মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সহানুভূতি-সমর্থন বাড়ছে। শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়েও আইনি লড়াই লড়তে দেশে আসবেন বলে ঘোষণা দেয়ায় সরকারি মহল, জনগণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ ও দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর রাজনীতিটি সেই শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এর নাজুক দিকটি রয়েই গেছে। এখন যদিও এটা বাস্তব তবু বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বের ওপর গোটা জাতির নির্ভরতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শেখ হাসিনার বয়স এখন ৮০। যতদূর জানা যায় তার স্বাস্থ্য ভালো এবং কর্মক্ষম আছেন। তার অনুসারীদের এটা অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু বয়সজনিত কারণে তার স্বাভাবিক মৃত্যুতেও আওয়ামী লীগের সবকিছু ভেঙে পড়তে পারে। এই দুর্বলতা আওয়ামী লীগকে শুধু দলীয় কারণে নয়, দেশ ও জনগণের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যই দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। একক নেতার ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বর্তমান বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে গভীর আত্মসমীক্ষা করে দলকে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে। মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে তাজউদ্দীন প্রমুখের যেমন নেতৃত্বের একটি জ্যোতিষ্কমণ্ডলী গড়ে উঠেছিল, শেখ হাসিনার চতুর্দিকে তেমনি একটি যোগ্য নেতৃত্বের বলয় তৈরির চেষ্টা করুক দলটি।