আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, চব্বিশের অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ঘোষণা দিয়েছেন ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। তার ঘোষণায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন। ফেসবুকে তাদের উচ্ছ্বাস দেখে তাই মনে হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ একাধিক চিঠি দিয়েছে ভারত সরকারকে। যার কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানাতে গেলে বাংলাদেশস্থ হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কাছেও শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার দাবি উত্থাপন করা হয়। এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই দাবি সামনে আনে। কিন্তু কোনো সদুত্তর আসেনি ভারত থেকে। বরং ভারত থেকে যে প্রতিক্রিয়া আসে তাতে তারা আইনগত দিককে সামনে আনে। এখন প্রশ্ন হলো- আইনগত দিককে সামনে আনা কেন? এখানেই রয়েছে মূল রহস্য। শেখ হাসিনা ভারতে বন্দি নয়। বরং অতিথি হিসেবে রয়েছেন। দিব্যি দেশ-বিদেশে অডিও রেকর্ড প্রকাশ পাচ্ছে তার। নেতাকর্মীদের নানা দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন। যদিও এসবের প্রতিফলন বাংলাদেশে খুব কমই দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। যিনি বাংলাদেশের আদালতের দৃষ্টিতে একজন পলাতক ফাঁসির আসামি। প্রশ্ন হলো- একজন পলাতক ফাঁসির আসামি কি দৌড় দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসতে পারেন? এ প্রশ্নের উত্তর হলো- না। তিনি যত ঘোষণাই দিক বাংলাদেশে ফেরাটা তার এত সহজ নয়। বিষয়টি এমন তো নয় যে, দিল্লি থেকে বিমানে উঠলাম আর ঢাকায় নামলাম। এখানে রয়েছে অনেক হিসাবনিকাশ। প্রশ্ন হলো- বন্দিবিনিময় চুক্তি কি হাসিনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? এখানেও উত্তর না। কারণ তিনি ভারতে বন্দি নন। এ কারণেই ভারত সরকার হাসিনার বিষয়টি হয়তো আদালতের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন। আদালত যে নির্দেশ দেবেন সেভাবেই ভারত কাজ করবে। আর শেখ হাসিনার বিষয়টি আদালতে গেলে এটি যে, অনির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য ঝুলে যাবে এটা নিশ্চিত। ফলে ডিসেম্বরে ফিরে আসার বিষয়টি অলিক কল্পনা। কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনা ফিরে আসার কথা বলছেন তার নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে। অবশ্য নেতাকর্মীরা কতোটুকু চাঙ্গা হচ্ছে দেশবাসী তা দেখছেন। আরেকটি বিষয় শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের কাছে ফাঁসির আসামি। ভারত সরকার জেনে শুনে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবেন- এমনটা মনে হয় না। হাসিনাকে ভারত ফেরত দিলেও তাকে যেতে হবে জেলে। ফাঁসির দণ্ডের আপিল করতে হবে। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট হয়ে একটা রায় আসবে। রায়ের উপর নির্ভর করবে তার পরবর্তী কার্যক্রম কি হয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শেখ হাসিনা বর্ণনা করেন ‘এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী’ হিসেবে। উগ্রপন্থি শক্তি ও বিদেশি শক্তি দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তাকে পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তার ভাষায়, সেই দিন থেকেই দেশ ভয়াবহ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে। মানবাধিকার ধুলায় পদদলিত। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নির্বিঘ্নে সহিংসতা চলতে দেয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশ জুড়ে গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি হচ্ছে অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই। আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শেখ হাসিনার এসব কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় এখন দেশে আয়নাঘর নেই। গুম নেই। সংবাদপত্রে বিশেষ সংস্থার ফোন নেই। এটা যাবে না- ওটা যাবে না- এমন নির্দেশ নেই। সরকারের তল্পিবাহক সাংবাদিক নেই। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ‘জনতার মঞ্চ’ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেই মঞ্চে উঠিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলিয়েছেন- সেটা নেই। হরতাল নেই। বরং দেশটাকে ফোকলা করে যাওয়ার পর বর্তমান সরকার সেই ফোকলা ভরাট করার চেষ্টা করছে।
এটাই ভিন দেশে বসে সহ্য হচ্ছে না? এ জন্যই সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশকে ভালোবাসার নমুনা ষোল বছর মানুষ দেখেছে। এখনো দেখছে। বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াছ আলী গুমের কয়েকদিন পর ইলিয়াছ পত্নী লুনা ও তার সন্তানরা হাসিনার দরবারে গিয়েছিলেন ইলিয়াছকে ফিরিয়ে দিতে। শেখ হাসিনা তাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন সেদিন। কথা দিয়েছিলেন ইলিয়াছ আলীকে ফিরিয়ে দিতে যা যা করার তা করবেন। অথচ হাসিনা দিব্যি জানতেন ইলিয়াছকে হত্যা করা হয়েছে। এতসব কর্ম করে ভারতে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এত এত শহীদ কিংবা তার আমলের অবিচারের জন্য এখনো তাকে কোনো অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। বরং এখনো নেতাকর্মীদের উস্কে দিচ্ছেন বদলা নিতে। নিজেও ঘোষণা দিয়েছেন দেশে ফিরে এসবের বিচার তিনি করবেন। একজন মানবিক মানুষ এমন কথা কখনোই বলতে পারেন না। আওয়ামী লীগের অপকর্মের কতো উদাহরণ দেয়া যায়। এসব দিয়ে এখন কি লাভ! দেশবাসী তো সবই জানেন। এসব মনে করে হলেও তো দেশবাসীর কাছে অনুতপ্ত হওয়া যায়। বাঙালি কোমল হৃদয়ের। তাদের কাছে কান্নাকাটি করে কিছু বললে তারা সব ভুলে যায়। এটা শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন। তাহলে অনুতপ্ত হতে দোষ কোথায়? তাতে উপকারই হবে। অপকার নয়।
তাছাড়া এখন কার্যত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সবাই পলাতক। কিছু নেতা আছেন কারাগারে। তাদের বিরুদ্ধে চব্বিশের অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যার মামলা থেকে শুরু করে দুর্নীতির মামলা ঝুলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের মামলার শুনানি চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলার রায়ও দেয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলার রায় যেকোনো সময়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও আরও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। বিশেষ করে পিলখানা ট্র্যাজেডি মামলাও একটি। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা এখন চরম বেকায়দায় রয়েছেন। এ অবস্থায় ডিসেম্বর কিংবা চটজলদি তার বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যদি না অলৌকিক কিছু ঘটে। শেখ হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণায় গত সপ্তাহে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রংপুরের এক কর্মিসভায় বলেছেন, শুনছি তিনি ফিরে আসবেন। আমরাও তৈরি। জেলখানা উনার জন্য প্রস্তুত।
আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে হয়, শেখ হাসিনা ও তার শীর্ষ নেতাদের পালিয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে তারা অপরাধী। দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর যে কায়দায় শেখ হাসিনা দেশ চালিয়েছেন তা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। গুম, খুন, দুর্নীতি, অনিয়ম, নির্যাতন, নিপীড়ন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে এমন কোনো কাজ নেই যে, তিনি করেননি। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি করার নির্দেশ। আর এ নির্দেশে ১৪০০-এর উপরে আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার দায় কি শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন? কারণ তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর একাধিক ফোন রেকর্ড ফাঁস হয়েছে যেখানে তাকে বলতে শোনা গেছে গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আন্দোলন দমাতে ১৪০০ মানুষকে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক’ বলে উপাধি দিয়েছেন দেশ-বিদেশের মিডিয়া। কোনো কোনো মিডিয়া তাকে নিষ্ঠুরতম স্বৈরশাসক উপাধি দিয়েছেন।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসামপ্রদায়িক শক্তিকে’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, শহীদদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। কথা হলো-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে আর কতো চলবে আওয়ামী লীগ। যে চেতনা করতে করতে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে- সেটা এখন মুখে না বলে মনে রাখলেই ভালো। আর চেতনার মতো কাজ করাটাই মানুষ চায়। আর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথার অর্থ কি আবারো তত্ত্বাবধায়ক তুলে দিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকার যে খায়েশ ছিল সেটা পূরণ করতে চান। এটা যে এখন সহজ কাজ নয় শেখ হাসিনাকে তা অনুধাবন করতে হবে। শেখ হাসিনার এই অডিও বক্তৃতা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর বিভাজনের চিত্রই তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ আগেই ভারতকে এ বক্তব্য প্রচার যেন না হয় অনুরোধ জানিয়েছিল। অন্যদিকে ভারত এ বক্তব্যের পর বলেছে- শেখ হাসিনার বক্তব্য ভারত সমর্থন করে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বকেও শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত নিকট প্রতিবেশী হলেও এখন কিছুটা দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়টি শুধু কথার কথা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।