ষড়যন্ত্র চলমান ঝড়ের মুখে পড়তে পারে দেশ

রাজনৈতিক ভাষ্যকার | এক্সক্লুসিভ
আগস্ট ১, ২০২৬
ষড়যন্ত্র চলমান ঝড়ের মুখে পড়তে পারে দেশ

হঠকারিতা দিয়ে হঠকারিতাকে মোকাবিলা করা যায় না। যেমনটা পারা যায় না সন্ত্রাসের মোকাবিলা করা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের রাজনীতি পর্যালোচনা করলেই এর উত্তর মেলে। স্বাধীনতার পর বিপ্লবের ঝান্ডা ছিল ওদের হাতেই। জাসদের ছাত্র উইং ছাত্রলীগ সবদিক থেকে এগিয়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধে অবদান থেকে শুরু করে লেখাপড়ায়, আন্দোলনে, বক্তৃতা এবং সংগঠনে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম। হঠকারিতা করে তারা শুধু নিজের সর্বনাশই করেনি, একটি নিশ্চিত বিকল্প রাজনীতির মৃত্যু ঘটিয়েছে। প্রাণ গেছে বহু তরুণের। রাজনীতি গেছে বিপথে। ষড়যন্ত্রকারীরা দেশটাকে অন্যপথে নিয়ে গেছে। যে পথ একাত্তরের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এর জন্য বেশির ভাগ দায়ী জাসদ নেতৃত্ব। জাসদ নেতারা বক্তৃতায় উঠেই শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে জুতা বানানোর কথা বলতেন। লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই বলে মানুষকে উস্কে দিতেন। সঠিক রাজনীতির পথে না গিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার পথটাই তারা বেছে নিয়েছিলেন। যে পথ কখনো স্থায়ী হয় না- এটা তারা বুঝেও এই সর্বনাশা পথ থেকে দূরে সরেননি। পল্টন ময়দানের বক্তৃতায় তারা এমন সব আওয়াজ তুলেছিলেন- যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থি। সুযোগ নিয়েছিল অন্যরা। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুজিববিরোধী স্রোতে যোগ দিয়েছিল। বলা বাহুল্য, শেখ মুজিব নিজেও রক্ষীবাহিনী গঠন করে জাসদ রাজনীতির পতন ঘটাতে চেয়েছিলেন। ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ দেয় তখন। জাসদ রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। নেতারা যান জেলে। বিপ্লবের অন্যতম নায়ক সিরাজুল আলম খান প্রতিনায়কে পরিণত হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার মধ্যদিয়ে জাসদ রাজনীতির ইতি ঘটে। 
 

গণবাহিনী গঠন ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। জাসদ নেতারা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছেন বারবার। ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে অপহরণের ঘটনার সঙ্গেও জাসদ নেতারা যুক্ত ছিলেন। শেষ পরিণতিতে জাসদ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। মেধাবী ছাত্রদের যে মহামিলন ঘটেছিল তা হতাশায় ডুবে যায়। বাংলাদেশ সেনাশাসনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। এর আগে অবশ্য বাকশাল গঠন ছিল অন্যতম ঘটনা। যার উদ্দেশ্য ছিল- গণতন্ত্রকে হত্যা করে ক্ষমতা এককভাবে কেন্দ্রীভূত করা।  বলা হয়ে থাকে, জাসদের হঠকারী রাজনীতি বাকশাল গঠনের পথে অনেকখানি ভূমিকা রেখেছিল। গণতন্ত্রী থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন স্বৈরতন্ত্রী। আজকের বাংলাদেশে ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়েও একই কারবার দেখতে পাচ্ছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে জাসদের উত্থান ঘটেছিল। আর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সরাসরি ফসল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সাধারণভাবে ক্ষমতায় যাওয়া তাদের লক্ষ্য ছিল না। অসুস্থ রাজনীতিকে সুস্থ করার জন্য তারা আওয়াজ তুলেছিল। ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছিল। 

 

মানুষ তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিকেই বেছে নেয়। ফলশ্রুতিতে অল্প দিনের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম কলঙ্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মানুষ হয় হতাশ। মব সন্ত্রাসকে তারা বেছে নেয় সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে। তারপরও তাদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বিস্তর। মানুষ মনে করে-একটা নতুন রাজনীতি দেশে আসুক। দুর্ভাগ্য হলো- তারাও হঠকারিতার পথেই হাঁটছে। কিছু কিছু বিষয়ে তারা আপসহীন থাকে বটে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে তারা আপসের পথই বেছে নেয়। ভুল রাজনীতির দিকে পা বাড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়া এখানে অনেকখানি ভূমিকা রেখেছে। তবে কুৎসিত বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে নাহিদ ইসলাম বিরত থাকতে পারলেও অন্যরা কেন পারবেন না- এই নিয়ে হাজারো প্রশ্ন। তাদের কতিপয় নেতানেত্রীর লাগামহীন বক্তৃতা মানুষকে বিচলিত করেছে, হতাশ করেছে। মানুষ রাজনীতির পরিবর্তন চায়। কিন্তু হঠকারিতাকে বেছে নিতে চায় না। কারণ তারা মনে করে এটা স্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। সামপ্রতিক কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করলে এমনটাই দেখা যায়। 
 

’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্র মেরামত। জনঐক্য ছিল প্রধান দাবি। কিন্তু দু’বছরের মাথায় বিপ্লবের মূল শক্তিগুলো বিভক্তির পথ বেছে নেয়। প্রফেসর ইউনূস ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ভুল রাজনীতির কাছে তিনি অসহায় আত্মসমর্পণ করেন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে, তারা একে অপরকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। আর এর সুযোগ নিতে থাকে পরাজিত শক্তি। স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তি জাসদের পেছনে কাতারবন্দি হয়েছিল। তারা চেয়েছিল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে। এখনো অবিকল সেটাই দেখা যাচ্ছে। পরাজিত শক্তি বাহবা দিচ্ছে। এনসিপি’র পালে হাওয়া লাগানোর ফন্দি-ফিকির করছে নানাভাবে। জাসদ নেতারা সেদিন বুঝতে পারেননি। বুঝলে বাংলাদেশ পথ হারাতো না। 
’৭৩-এর নির্বাচনে জাসদ অন্তত ৩০টি আসনে জয়ী হতে পারতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার জাসদের উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি। খোন্দকার মোশ্‌তাক হেরে গিয়েছিলেন জাসদের কাছে। তবে রাতের আঁধারে মোশ্‌তাককে জয়ী করা হয়। যার মূল্য দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ইতিহাস এমনটাই। এনসিপি’র সঙ্গে জাসদের হুবহু মিল না থাকলেও ঘটনা প্রবাহ প্রায় একই। 
 

সঠিক নেতৃত্ব না থাকার কারণে জাসদ আজ ব্র্যাকেটবন্দি। রাজনীতিতে এনসিপি নিজস্ব স্বকীয়তায় দাঁড়াতে চাচ্ছে। নিজেদেরকে প্রমাণ করতে চাচ্ছে বিকল্প শক্তি হিসেবে। জামায়াত এখানে কী করবে? তারা কি এনসিপিকে আলাদা হতে দেবে। নাকি তাদের নিজস্ব স্বার্থে অতীতের মতো এনসিপিকে ব্যবহার করবে। এ নিয়ে বিরোধ  চলছে এনসিপি’র ভেতরে ও বাইরে। জামায়াত চাচ্ছে, যে করেই হোক এনসিপিকে তাদের সঙ্গে রাখতে। হবিগঞ্জের ঘটনায় জামায়াতের ভূমিকায় এনসিপি নেতারা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তারা চেয়েছিলেন- বিবৃতি দিয়ে নয়, জামায়াত সরাসরি তাদের পাশে দাঁড়াক। কিন্তু সেটা ঘটেনি। জামায়াত নিন্দা জানিয়েছে, সরকারকে হুমকি দিয়েছে। অনেকেই অঙ্ক মেলাচ্ছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আওয়াজের সঙ্গে হঠাৎ উত্তপ্ত হওয়া রাজনীতির কোনো যোগসাজশ আছে কিনা। যদিও শেখ হাসিনা নানাভাবে চেষ্টা করছেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে। উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছেন পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করতে। সাহাবুদ্দিনের বিদায় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনেও ষড়যন্ত্রের আলামত আছে। বঙ্গভবন ছাড়ার দিন তিনি তার এক ঘনিষ্ঠজনকে বলেছেন, ধুর! ওসব নিয়ে চিন্তা করিস না। দেখ না কী হয়! সরকার এখানে কী করছে। তারেক রহমানের পাঁচ মাস বয়সী সরকার ইতিমধ্যেই অনেক বিতর্কিত এবং স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা এই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল না। রাজনীতিতে শুধু অস্থিরতা নয়, মূল অস্থিরতা অর্থনীতিতে। 
 

মানুষ সরকারকে সময় দিতে চায়। কিন্তু এও দেখতে চায়- তারা সঠিক পথটি বেছে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন পর্যন্ত বড় কোনো ভুল করেননি। তার আচার-আচরণে মানুষ নতুন কিছুই দেখতে পাচ্ছে। মোটাদাগে বলা যায়, মানুষ খুশি। কিন্তু বেশ কিছু সিদ্ধান্ত তাকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ গঠনে মুন্সিয়ানার ছাপ অনুপস্থিত। কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি তার বেশ কিছু মহৎ কার্যক্রমকে সমালোচনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ নিয়েও নানা প্রশ্ন। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আবেগ নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে বিপদ হতে পারে। দলের ভেতরে হতাশা তৈরি হয়েছে মন্ত্রীদের আচরণে। দল আর সরকার এক হয়ে গেছে। পল্টন বা গুলশানমুখী হচ্ছেন না দলের নেতাকর্মীরা। 
 

সরকারি সংস্থায় যে ক’জন নেতাকে নিয়োগ দেয়া হলো তাতে রীতিমতো ৩১ দফাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। অথচ তারাই একদিন বলেছিলেন, মুক্তির পথ হচ্ছে ৩১ দফা। এই সিদ্ধান্ত সরকারকে কুরে কুরে খাবে। টকশো কিংবা বক্তৃতায় উঠেই সবাই এর সমালোচনা করছেন। এতে করে সরকার কী লাভ করবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় সরে গেছেন। সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা বহাল রাখতেই হবে যেকোনো মূল্যে- এমন চিন্তা আখেরে ভালো ফল দেয় না। গণমাধ্যম স্বাধীন। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষ কথা বলতে পারছে বিনা বাধায়। এর মধ্যে পালাবদলের কিছু ঘটনায় সরকারের ভালো উদ্যোগ নিয়ে মানুষ অনেকটাই সমালোচনামুখর। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন, কোনো কিছুই বদলায়নি। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছাড়া। তার ভাষায়, আগে যারা ঘুষ খেতো, তারা ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। একইভাবে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিতো, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছে। লোকজন ভোল পাল্টাচ্ছে। 

 

ভোল পাল্টানো লোকজনই এখন অনেক বেশি জুলাইযোদ্ধা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি আশাবাদী এই কারণে যে, আমি পরিবর্তন দেখছি একজন মানুষের মধ্যে। সেটা তারেক রহমান সাহেব। তিনি পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি আমরা সামনে নিয়ে যাই সবাই মিলে, তাহলে আমার মনে হয়-হয়তো দেশে পরিবর্তনটা হবে। সবাই মিলে তাকে সমর্থন দেয়া দরকার। অবশ্য তিনি এখন পর্যন্ত কোনো নজির স্থাপন করতে পারেননি। ওদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে মানুষ অস্থির। অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। এর মধ্যে যে কিছু ব্যবসা টিকে আছে তাতেও নানা সংকট। বিশেষ করে মিডিয়া রিলেটেড ব্যবসায় নতুন উৎপাত। নানা দোহাই দিয়ে সকাল-বিকাল চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত আসছে। যা অনেকটাই অস্বস্তিকর। সরকারের জন্য নতুন এক ফ্রন্ট। অতীতে মিডিয়া ফ্রন্টই তাদেরকে বারবার চ্যালেঞ্জ করেছে। কলঙ্কের দাগ লাগিয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ছিল টেবিলে বানানো। গদি মিডিয়া কখনো কারও বন্ধু হয় না। এরা দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ে খেলে শাসকের স্বার্থে। বাংলাদেশ যদি এর বাইরে থাকে তবে দেশটা এগিয়ে যাবে। তা না হলে দেশটি ঝড়ের মুখে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই নানা ষড়যন্ত্র চলমান। া
 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর