বিতর্ক

রাষ্ট্রপতির শপথ পঞ্চদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক বিচ্যুতি

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | মতামত
আগস্ট ২৯, ২০২৬
রাষ্ট্রপতির শপথ পঞ্চদশ সংশোধনীর  সাংবিধানিক বিচ্যুতি

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শেষ পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করতে হয়েছে। একটি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের এই বাস্তবতা কোনো নিছক আনুষ্ঠানিক ঘটনা নয়; এটি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট এক গভীর সাংবিধানিক বিচ্যুতিকে আমাদের সামনে দৃশ্যমান করেছে।
 

প্রশ্নটি ব্যক্তি বা প্রোটোকলের নয়। প্রশ্নটি হলো-একটি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব এমনভাবে নির্ধারিত হতে পারে কি, যার পরিণতিতে সেই শপথ সংসদের একজন ডেপুটি স্পিকারের কাছে গিয়ে পৌঁছায়?
প্রশ্নটি ব্যক্তি নয়; প্রশ্নটি সাংবিধানিক নকশার। প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীরাও রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেন। এসব সাংবিধানিক পদে শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিই একমাত্র নির্ধারিত শপথগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ। কোনো বিকল্প নেই।
 

অথচ রাষ্ট্রপ্রধানের নিজের শপথের ক্ষেত্রে অফুরন্ত বিকল্পের এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় সেই শপথ শেষ পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকার, এমনকি সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্যের কাছেও গিয়ে পৌঁছাতে পারে। কারণ সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
একটি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক স্থাপত্যে এই বৈপরীত্য কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
 

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ছিল ভিন্ন নকশা। এখানেই ১৯৭২ সালের ব্যবস্থার গভীর সাংবিধানিক তাৎপর্য।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতেন। আবার বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিও রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিতেন।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করতেন প্রধান বিচারপতির সামনে; আর প্রধান বিচারপতি তার বিচারিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করতেন রাষ্ট্রপতির সামনে।
 

অর্থাৎ শপথের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক, উভয়ের ওপরেই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল সংবিধানের।
এই সম্পর্ককে বিশ্লেষণাত্মক অর্থে constitutional reciprocity বলা যায়-পারস্পরিক সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মর্যাদার এই বিন্যাসে কেউ কারও অধীন নন; উভয়ের সর্বোচ্চ আনুগত্য সংবিধানের প্রতি। তাই পারস্পরিক শপথ ছিল ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের নয়, সংবিধানের প্রতি পারস্পরিক দায়বদ্ধতার প্রতীক।
এখানেই ১৯৭২ সালের সাংবিধানিক নকশার অসাধারণ সৌন্দর্য।
 

পঞ্চদশ সংশোধনী রাষ্ট্রপতির শপথের ক্ষেত্রে Chief Justice-এর পরিবর্তে “ঝঢ়বধশবৎ” স্থাপন করেছে (এই পরিবর্তনের সাংবিধানিক শিকড় চতুর্থ সংশোধনী)।
দেখতে এটি মাত্র একটি শব্দের পরিবর্তন। কিন্তু সাংবিধানিক অর্থে এটি তার চেয়ে অনেক বড়। স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার আইনসভার অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক পদাধিকারী। রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান; তার সাংবিধানিক অবস্থান আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক ভারসাম্যের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং রাষ্ট্রপতির শপথের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত হবে, সেটি নিছক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হতে পারে না।
আর প্রধান বিচারপতি শুধুমাত্র বিচার বিভাগের প্রধান নন; তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নিকট শপথ নেবেন-এই নকশার মধ্যেই ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার একটি গভীর প্রতীকী প্রকাশ।
 

রাষ্ট্রপতির শপথের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির যে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল, তা সরিয়ে সংসদের স্পিকারকে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান সাংবিধানিক পদের তাৎপর্যপূর্ণ শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির ভূমিকা অপসারণ করে আইনসভার কয়েকজন পদাধিকারীকে স্থাপন করা হয়েছে।
 

অর্থাৎ এখানে ক্ষমতা-কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও ঘটেছে। সংসদ সংশোধন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে; কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার সীমাহীন ক্ষমতা নয়।
আরও রয়েছে স্পিকারকে শপথের কর্তৃপক্ষ করার নকশাগত দুর্বলতা।
 

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের কাঠামো অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে স্পিকার নিজেই রাষ্ট্রপতির কার্যাবলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
অথচ একই সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার কর্তৃত্বও স্পিকারের হাতে দেয়া হয়েছে।
 

এখানে প্রশ্নটি স্পিকারের বা ব্যক্তিগত মর্যাদার নয়। প্রশ্নটি nstitutional design-এর।
যে সাংবিধানিক পদাধিকারী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করতে পারেন, তাকেই কেন রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ করা হবে?
১৯৭২ সালের মূল ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রে এই স্বাতন্ত্র্যটি ছিল।
 

প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করেন না। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে তিনি রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন না। তিনি রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক বা সংসদীয় উত্তরাধিকার-ব্যবস্থার অংশ নন।
তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি।
 

অতএব-রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি-কেউ কারও বিকল্প নন; কেউ কারও উত্তরসূরি নন। উভয়েই সংবিধানের অধীন।
এই দর্শন ছিল মূল সাংবিধানিক নকশার শক্তি।
 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে অবস্থান করেন না। তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান।
তার সাংবিধানিক অবস্থান দল, দলীয় আনুগত্য এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে।
 

সুতরাং রাষ্ট্রপতির শপথের সাংবিধানিক নকশাতেও এই নির্দলীয় ও প্রজাতন্ত্রকেন্দ্রিক অবস্থান প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
সংবিধান শুধু নির্ধারণ করে না- কে কতোটুকু ক্ষমতা পাবে। সংবিধান এটাও নির্ধারণ করে-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোন মর্যাদায়, কোন দূরত্বে এবং কোন পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করবে।
 

তাই বলা যায়- Constitutional design is not merely a design of power; it is also a design of dignity.
সাংবিধানিক নকশা কেবল ক্ষমতার নকশা নয়; এটি সাংবিধানিক মর্যাদারও নকশা।
 

রাষ্ট্রপতির শপথ সেই মর্যাদার একটি দৃশ্যমান সাংবিধানিক অনুষ্ঠান। অতএব সেই অনুষ্ঠানের নকশাও প্রজাতন্ত্রের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
Constitutional dignity: ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা।
 

রাষ্ট্রপ্রধান এমন এক সাংবিধানিক নকশায় শপথ নিচ্ছেন, যেখানে তার শপথের কর্তৃত্ব সংসদের একজন পদাধিকারীর কাছে ন্যস্ত। এটি ব্যক্তি-অপমানের প্রশ্ন নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক মর্যাদা কোন নকশায় প্রকাশিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা ব্যক্তি-সৌজন্য নয়, প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা; আর বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা কোনো বিচারকের প্রতি আনুকূল্য নয়, সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা। এই সংকট অনিবার্য ছিল না। রাষ্ট্রপতির শপথের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পুরনো সাংবিধানিক ভূমিকা বহাল থাকলে আজকের এই নকশাগত সংকট সৃষ্টি হতো না।
রাষ্ট্রপতি তার পদে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতেন।
 

স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করার পরিস্থিতিতে থাকলেও রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার কর্তৃত্ব তার ওপর নির্ভর করতো না। ফলে ডেপুটি স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ যাওয়ার প্রশ্নও উঠতো না।
অর্থাৎ আজকের সংকট কোনো অনিবার্য সাংবিধানিক বাস্তবতা নয়।
এটি পঞ্চদশ সংশোধনীর নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিকৃতির পরিণতি।
 

রাষ্ট্রপতির শপথের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য রক্ষা করার জন্য জরুরি। এটাই constitutional dignity।
এটি আমাদের সামনে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে-
 

যিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে, তার শপথের সাংবিধানিক নকশা কি তাকে সেই মর্যাদাতেই প্রতিষ্ঠিত করছে?
পঞ্চদশ সংশোধনীর বিকৃতির পরিণতি যদি রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে এমন একটি সংসদীয় পদাধিকারীর সঙ্গে যুক্ত করার পথ তৈরি করে, যার ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক দূরত্ব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, তাহলে এই সাংবিধানিক বিন্যাস পুনর্বিবেচনা করা আর কোনো বিলাসিতা নয়; বরং তা সাংবিধানিক সংস্কারের একটি যৌক্তিক ও অনিবার্য দাবি।
রাষ্ট্রপতির শপথ বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রীয় জরুরি কর্তব্য। এটাই সংবিধানের নৈতিক পরীক্ষা।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক faraiæees@gmail.com
 

মতামত'র অন্যান্য খবর