সাফ কথা

তীব্র জ্বালানি সংকটে স্বল্পমেয়াদি সমাধানের দাবি যখন জোরদার

হাসান মামুন | মতামত
আগস্ট ২৯, ২০২৬
তীব্র জ্বালানি সংকটে স্বল্পমেয়াদি সমাধানের দাবি যখন জোরদার

দেশে এই মুহূর্তে যে বিদ্যুৎ সংকট চলছে, তার পেছনে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালানো যাচ্ছে না গ্যাসের অভাবে। চালানো হয়তো যেতো, যদি শিল্পে গ্যাসের চাহিদা কম থাকতো। গ্যাসের অভাবে আমরা তো সার কারখানাও চালু রাখতে পারছি না। সব ধরনের সার আমদানিই বেড়ে গেছে। আমন মৌসুমে সার বিতরণে সংকটের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ‘সার লুটের ঘটনা’ও ঘটেছে। 
গ্যাসের ঘাটতি অবশ্য আগেও ছিল। এর যে পরিমাণ চাহিদার কথা বলা হয়, তার চেয়ে ঘাটতি বরাবরই ৮০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। হালে সেটা হঠাৎ করে বেড়েছে কেন, তা ইতিমধ্যে সবার জানা। মানুষ অপেক্ষা করে আছে গ্যাস সংকট অন্তত সহনীয় হয়ে আসার জন্য। সেটা ঠিক কতোদিনে হবে, তা অবশ্য বলা যাচ্ছে না। 
 

একটা সময় পর্যন্ত আমরা গ্যাস সংকটে ছিলাম না, এটাও সত্য। দেশে যে পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, তার চেয়ে আমাদের চাহিদা কম বলেই সাধারণভাবে মনে করা হতো। তখন এর দামও ছিল কম। বিদেশি কোম্পানির প্ররোচনায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের একাংশ গ্যাস রপ্তানির পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিলেন এক সময়। বলা হচ্ছিল, ‘দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’! যাই হোক, রপ্তানি না হলেও দেশে পাওয়া গ্যাস দিয়ে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মেটাতে শুরু করেছিলাম। নব্বইয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাড়তে থাকে এবং এর চালিকাশক্তি হয় শিল্প ও সেবা খাত। তাতে গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম অবধি বাড়তে থাকে এসিসহ অধিক বিদ্যুৎ পরিভোগকারী ইলেকট্রনিক গুডসের ব্যবহার। প্রায় রীতিবিরুদ্ধভাবে প্রাইভেটকারেও সস্তায় গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সার কারখানাগুলোও গড়ে তোলা হয়েছিল দেশে প্রচুর গ্যাস আছে, এই ধারণায়। আমরা চেয়েছিলাম অন্তত ইউরিয়া সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে, যাতে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা যায়। 
 

এই করতে করতে এখানে গ্যাসের সরবরাহ ও চাহিদায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এক পর্যায়ে। এ অবস্থায়ও বিগত শেখ হাসিনা সরকারের পুরো সময়টায় বড় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জোর দেয়া হয়নি। সেই আমলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হলেও তাদের মতো করে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেয়া হয়নি। এর বদলে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাস বিভিন্ন খাতের ভোক্তাদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। 
 

আন্তর্জাতিক বাজারে তখন এলএনজি’র দাম ছিল বেশ কম। তৎকালীন সরকার হয়তো ভেবেছিল, বাজার এমনই থাকবে আর এভাবেই গ্যাস সমস্যা সামলানো যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথম ধাক্কা আসে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি’র দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে থাকে। বাংলাদেশকে তখন এক পর্যায়ে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দিতে হয়। এলএনজি আসতো দু’টি উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পাদিত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত ছিল না বলে ওই সময়টায় গ্যাস সংকট বেড়ে ওঠে। বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় হাসিনা সরকার এ দুই খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বিপুলভাবে বাড়িয়ে দেয়। তাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ে। শিল্পপণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়। পরিণতিতে বাড়ে মূল্যস্ফীতি। 
 

সেই সরকার নবায়নযোগ্য, বিশেষত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল, বাস্তবে তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। সেই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে ছোট ক্ষেত্রগুলোয় অন্তত বিদ্যুৎ সংকট সহনীয় পর্যায়ে রাখা যেত। জাতীয় গ্রিডের ওপরও চাপ কম পড়তো। সেগুলো হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরও সরকার এলএনজি আমদানি করে সংকট মোকাবিলার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা যে করেনি, তার প্রমাণ মেলে আরও দু’টি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠায় তাদের আয়োজন দেখে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবার নতুন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে সেই আয়োজন বাদ দিয়ে দেয়া হয় জ্বালানি খাতে ‘বিশেষ আইন’ রদ করে। তাদের সময়ে যুদ্ধ কিংবা বড় কোনো দুর্যোগ হয়নি বলে জ্বালানি খাতে বাড়তি সমস্যা অবশ্য পরিলক্ষিত হয়নি। 
 

সমস্যা তীব্র হয়ে ওঠে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার আসার পর। বলা যায়, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে শুরুতে সংকট দেখা দেয় জ্বালানি তেল নিয়ে। সেটা কোনোমতে সামলে ওঠার পর দেখা দেয় গ্যাস সংকট। এর কারণ দু’টি। এক, নজিরবিহীন দুর্ঘটনায় একটি এলএনজি টার্মিনাল পুরো অকেজো হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন মেরামতের আওতায় থাকা। এতে আমদানিকৃত গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ কমে যায় এক ঝটকায়। এমনিতেও প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছিল বলে খবরে প্রকাশ। এর সঙ্গে ৫০-৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ স্থগিত হয়ে গেলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, সেটা সহজে অনুমেয়। 
 

দ্বিতীয় কারণ, এক সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি কাজে ফিরলেও এর মধ্যে অন্য সংকট দানা বেঁধে ওঠে। দেখা যায়, সরকার সময়মতো এলএনজিবাহী কার্গো আনতে পারছে না। আমাদের জন্য এলএনজি’র সবচেয়ে বড় উৎস ‘কাতার এনার্জি’ আগেই বলে দিয়েছিল, তারা প্রতিশ্রুত গ্যাসের বড়জোর অর্ধেক সরবরাহ করতে পারবে। কেননা, ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। এ অবস্থায় স্পট মার্কেটের ওপরই মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকার আবার অস্থির এই বাজার থেকে গ্যাস আনতে চাইছে সাশ্রয়ী দামে। তার অর্থ সংকটের কথা তো অজানা নয়। কিন্তু চতুর্মুখী সংকটে নতুন নতুন বিক্রেতার কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কার্গো মিলছে কমই। এ  ক্ষেত্রে কিছু উটকো শর্তও এসে যুক্ত হচ্ছে। তারেক রহমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার। তবে এর কাজ শুরু করা গেলেও কমপক্ষে দু’বছর নাকি লাগবে সুফল পেতে। আপাতত বিদ্যমান টার্মিনাল দু’টি দিয়েই কাজ চালাতে হবে। পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো এনে সেটাও করা যাচ্ছে না, এটা হলো নতুন সংকটের জায়গা। এলএনজি’র বিকল্প হিসেবে এলপিজি’র ব্যবহার বাড়ানো যায় কিনা, সেই আলাপও তুলছেন কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে নাকি বাড়তি আমদানির সুযোগ রয়েছে। এলপিজি’র দামও কম নয়। এতে শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বৈ কমবে না। 
 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে জ্বালানি তেল ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। তাতে খরচ নাকি একই পড়বে; কারণ এলএনজি’র দাম অনেক বেড়ে গেছে এর মধ্যে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বেশি করে সচল রাখার কথা বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আবার দেশে প্রাপ্ত কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের ওপর জোর দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার যুক্তি হয়তো, দেশে এত কয়লা থাকতে এমন অর্থ সংকটের মধ্যেও আমদানি করতে যাবো কেন? তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় আপাতত কয়লা আমদানি করেই কাজ চালাতে হবে। এলএনজি আমদানির চেয়ে সেটা সাশ্রয়ীও হবে। আর এলএনজি তো বেশি দাম দিয়ে আনা গেলেও তা ‘গ্যাসিফাই’ করতে পারবো না। টার্মিনাল হাতে আছে মাত্র দু’টি। কয়লার ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। রূপপুরের বিদ্যুৎ আমরা কবে স্থিতিশীলভাবে পেতে থাকবো, সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। শীতকাল আসতেও অনেক দেরি। তখন বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমলেও সার কারখানা চালু রাখার ক্ষেত্রে চাহিদা বাড়বে। সামনেই থাকবে বোরো মৌসুম। সারের বিপুল চাহিদা থাকে তখন। বৃষ্টিহীন সময়ে সেচের চাহিদাও বেশি থাকে। কৃষিতে বাড়ে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের চাহিদা। এদিকে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করে আছেন পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে যাওয়ার জন্য। তারা চাইছেন, যে করে হোক গ্যাসের চাহিদা মিটুক। ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাস কীভাবে তাদের কাজে লাগতে পারে, তার সদুত্তর কিন্তু আজ অবধি মেলেনি। চালু গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ অব্যাহতভাবে কমছে, এটাও পুরনো খবর। এ অবস্থায় সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান এবং স্থলভাগে শতাধিক কূপ খননের ঘোষণায় কে কতোটা আশ্বস্ত হবে, কে জানে। 
 

মানুষ সংকটে জেরবার হলে নগদে কিছু পেতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। স্বল্পমেয়াদি অথচ কার্যকর কিছু সমাধানের কথা তাই সরকারের তরফ থেকে দৃঢ়ভাবে জানাতে হবে। জাতীয় সংসদ ও এর বাইরে জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা করে সেইসব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া এখন জরুরি। অপর্যাপ্ত গ্যাস কোন কোন খাতে, কীভাবে ব্যবহার করবো এবং লোডশেডিংও কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেই আলোচনা হতে হবে নির্মোহভাবে। এই দুই খাতে দক্ষতার উন্নয়ন দ্রুত করা যাবে না। তবে অপচয় ও চুরি কমানো যাবে সুশাসন বাড়ানো গেলে। সেটাও সংকটকালে কম জরুরি নয়। 
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

 

মতামত'র অন্যান্য খবর