প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

হাসিনার সামনে তিন চ্যালেঞ্জ

ড. মাহফুজ পারভেজ | মতামত
আগস্ট ২৯, ২০২৬
হাসিনার সামনে তিন চ্যালেঞ্জ

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এন্তার মন্তব্য শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি আওয়ামী-বিরোধী পক্ষও এ বিষয়ে নানা মত দিচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ মন্তব্যই এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে অনুমান, প্রত্যাশা কিংবা আশঙ্কানির্ভর। বাস্তবে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎকে শুধু ‘ফিরবেন’ বা ‘ফিরবেন না’-এই দ্বিমাত্রিক প্রশ্নে বিচার করা যায় না। তার প্রত্যাবর্তন, রাজনৈতিক পুনর্বাসন, বিচারের মুখোমুখি হওয়া, দলীয় নেতৃত্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠা কিংবা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরে থেকে ইতিহাসের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্রে পুনরায় পরিণত হওয়া-প্রতিটি সম্ভাবনাই নির্ভর করবে একাধিক পরিবর্তনশীল উপাদানের ওপর। 
 

বিশেষ করে, দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কতোটা পুনর্গঠিত হয়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনভিত্তি কী অবস্থায় দাঁড়ায়, নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো কতোটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে, নির্বাচনী রাজনীতির চরিত্র কীভাবে বদলায়, রাষ্ট্রীয় বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া কোনদিকে অগ্রসর হয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতির গতিপথ কোনদিকে যায় এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক মনোভাব কোনপথে বিবর্তিত হয়-এসবের সম্মিলিত গতিপথই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। 
 

তাই এখনই তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী করার চেয়ে বলা অধিক যুক্তিসঙ্গত যে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একটি নির্ধারিত পরিণতি নয়, বরং পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক শক্তি, প্রতিষ্ঠান, জনমত ও আঞ্চলিক বাস্তবতার পারস্পরিক ক্রিয়ার ফল। ফলে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার প্রত্যক্ষ শক্তি হিসেবে ফিরে আসবেন, নাকি ক্রমশ ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়ায় পরিণত হবেন-তার উত্তরও নানা পক্ষের কার্যক্রমের নিরিখে অদূর ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসবে।
 

তাছাড়া, জুলাইয়ের দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর প্রশ্নটি কেবল ‘তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন কিনা’-এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, তিনি ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ভূমিকা কী হবে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং ২০২৪-এর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর তার নেতৃত্ব কি পুনরায় কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করতে পারবে?
সামপ্রতিক ঘটনাবলি এই প্রশ্নকে আবারো সামনে এনেছে যখন শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। 
 

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ২০২৪-পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগ ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। বর্তমান সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টা ও চাপ অব্যাহত রেখেছে। 
অতএব, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে তিনটি পৃথক বিষয়কে আলাদা করতে হবে-শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী-রাজনৈতিক পুনর্বাসন। এই তিনটি এক বিষয় নয় এবং একক ভাবে কারও নিয়ন্ত্রণাধীনও নয়।
 

প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা কি রাজনৈতিক কৌশল?
 

শেখ হাসিনার ‘আমি ফিরবো’ ঘোষণা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি রাজনৈতিক মবিলাইজেশন কৌশল। দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশের পরিসরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখা। দেশে তার দল সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, বহু নেতা কারাগারে বা আত্মগোপনে, অনেক নেতা বিদেশে এবং দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। ফলে, দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। 
 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজনীতিতে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা। ক্ষমতায় না থাকলেও কোনো নেতা যদি রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণ করতে পারেন, তার প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। শেখ হাসিনা এখন সেই প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনার এবং পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। তার বক্তব্যের মধ্যে তাই একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা আছে: “আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মুছে ফেলা যাবে না।” এটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রথম স্তম্ভ। 
 

প্রত্যাবর্তন আর পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা  
 

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং তার পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি? তার প্রত্যাবর্তন আর রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সমার্থক মনে করা উচিত হবে কি? এসব প্রশ্নের চটজলদি উত্তর দেয়া অসম্ভব। সমর্থকরা হয়তো বিষয়টিকে আশাবাদী দৃষ্টিতে দেখবেন। তারা ভাবতেই পারেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই আটঘাট বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তারই ভিত্তিতে তিনি দেশে ফিরতে পারেন। বিরোধী পক্ষ বিষয়টিকে দেখবেন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। তার দেশে ফেরা মানেই তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতি করতে পারবেন-এমন নিশ্চয়তা আছে বলে তারা মনে করবেন না। তদুপরি, বর্তমান সরকার প্রকাশ্যে বলেছে, তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের রায় আইন অনুযায়ী কার্যকর হবে। অর্থাৎ তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন প্রথমত একটি লিগ্যাল ইভেন্টে পরিণত হয়েছে, সরাসরি রাজনৈতিক কামব্যাকের পর্যায়ে নেই। 
এখানেই শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হন, তখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে না: নির্ভর করে আইনি অবস্থান, বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপরও।
 

ভারতের ভূমিকা
 

ভারতে অবস্থানকারী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে ভারতকে বাদ দেয়া অসম্ভব। যদিও বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে, তথাপি এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে খুবই সামান্য। সামপ্রতিক সময়েও ঢাকা বলেছে, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার অধীনে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে। 
 

কিন্তু দিল্লির হিসাব শুধু আইনি নয়, কৌশলগতও। শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অংশীদার ছিলেন। ফলে তার নিরাপত্তা, বিচার প্রক্রিয়ার প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-এসব প্রশ্ন ভারতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে। এখানে ভারত একটি কঠিন দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে, যার একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদ আর অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের উত্তরাধিকারের দায়িত্ববোধ। সব মিলিয়ে ভারতের অবস্থান শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
 

আওয়ামী লীগ কি শেখ হাসিনা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে?
 

এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন। কারণ, আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক শক্তি ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য ও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। কিন্তু একটি বড় জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দল যদি অতিরিক্তভাবে একজন ব্যক্তির নেতৃত্ব, জনপ্রিয়তা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করে ফেলে, তাহলে ক্ষমতা হারানোর পর শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। দলটি রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ, নির্বাচনী অংশগ্রহণের বাইরে এবং নেতৃত্বের একটি বড় অংশ বিচ্ছিন্ন। তাই আওয়ামী লীগের সামনে দু’টি পথ। একটি হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দলকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা। অন্যটি হলো শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বীকার করেও নতুন নেতৃত্ব, নতুন সাংগঠনিক কাঠামো এবং নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা। এই দুই পথের মধ্য থেকে একটি বেছে নেয়া কিংবা নতুন পন্থা উদ্ভাবন করাই আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন কাজ। একই সঙ্গে দল তার অতীতের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক আচরণ ও ক্ষমতা হারানোর মূল্যায়ন কীভাবে করে এবং সেই মূল্যায়নকে কতোটুকু বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য ভাবে উপস্থাপন করতে পারে, সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 
 

২০২৪-এর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন 
 

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিসরেও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সহিংসতার পর উত্থাপিত রাজনৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এখনো দলটির ভবিষ্যতের কেন্দ্রে আবর্তিত হচ্ছে। যদিও শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদি সেই বিচার রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তা নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণ সৃষ্টি করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনেও একই সঙ্গে দু’টি নীতি রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে-ন্যায়বিচার এবং সঠিক পদ্ধতিতে বিচার। এই ভারসাম্যের গতি-প্রকৃতিও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 

জনসমর্থন কি আবার ফিরতে পারে?
 

এই প্রশ্নের উত্তরটি সরল নয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কিছু অর্জন বাংলাদেশের একটি অংশের কাছে এখনো রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে থাকতে পারে। অন্যদিকে ২০২৪-এর সহিংসতা, মানবাধিকার নিয়ে অভিযোগ, রাজনৈতিক দমন এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের দলীয়করণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্য অংশ। অর্থাৎ শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার দ্বিমাত্রিক। এটি একই সঙ্গে উন্নয়নের উত্তরাধিকার এবং সুশাসন-অবক্ষয়ের উত্তরাধিকার-দুই বয়ানকেই ধারণ করছে। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ যদি পুনরায় রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তাকে এই দ্বৈত উত্তরাধিকারের মুখোমুখি হতে হবে। শুধু ‘উন্নয়ন’ বললে যেমন হবে না, তেমনি আবার শুধু ‘আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে’ বলেও হবে না। দলকে বলতে হবে-কোথায় ভুল হয়েছিল, কেন ২০২৪-এর বিপর্যয় ঘটলো এবং ভবিষ্যতের আওয়ামী লীগ কীভাবে ভিন্ন হবে। এটাই হবে রাজনৈতিক পুনর্জন্মের পরীক্ষা।
 

শেখ হাসিনার সম্ভাব্য তিনটি ভবিষ্যৎ
 

বর্তমান তথ্য ও রাজনৈতিক গতিপথ বিবেচনায় আমার কাছে শেখ হাসিনার জন্য তিনটি সম্ভাব্য চিত্র (সিনারিও) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে:
প্রথমটি হলো আইনি-রাজনৈতিক অবসান। তিনি দেশে ফিরবেন বা প্রত্যর্পিত হবেন, বিচার প্রক্রিয়া এগোবে এবং তার ব্যক্তিগত সক্রিয় রাজনীতি কার্যত শেষ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করতে হবে। দ্বিতীয়টি হলো দীর্ঘ নির্বাসন ও দূরবর্তী নেতৃত্ব। ভারত তাকে প্রত্যর্পণ না করলে তিনি ভারতের বাইরে বা ভারতে থেকেই রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন। এতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতীকী নেতা হিসেবে থাকবেন, কিন্তু বাংলাদেশের মাঠের রাজনীতিতে তার সরাসরি ভূমিকা সীমিত থাকবে। তৃতীয়টি হলো- নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং আওয়ামী লীগ নতুন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় ফিরে আসতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনা সরাসরি ক্ষমতায় না ফিরেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার শাসনতান্ত্রিক অংশীদারে পরিণত করতে পারেন।  
আগামীর দৃশ্যপটে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের পেছনে আরও অনেক কার্যকারণ থাকতে পারে। যেমন, দলের নীতি, কৌশল ও মনোভাবের পরিবর্তন, যে পরিবর্তনটি হতে হবে আওয়ামী লীগের ভেতরে। কারণ, আমার মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ থেকে আলাদা করা সম্ভব হবে না।
 

বাংলাদেশের রাজনীতি বদলে গেছে
 

২০২৪-এর পর নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়েছে। বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিপুল বিক্রমে ক্ষমতায় ফিরেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন; মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে জামায়াতও শক্তিশালী সংসদীয় অবস্থান অর্জন করেছে। এই নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসে আওয়ামী লীগের পুরনো দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতার কাঠামো আগের মতো কাজ করবে না। অতএব, আওয়ামী লীগকে শুধু বিএনপি’র বিরুদ্ধে নয়, একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এবং এরই ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ফিরে আসার সম্ভাবনাকে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে ২০২৪-এর আগে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী কাঠামো তার রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি ছিল, সেই পরিবেশ আর নেই। তার সামনে তাই এখন ‘ক্ষমতায় বা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন’ ইস্যুতে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিসরের গুরুত্ব বিবেচনা করে নীতি ও কৌশলগত দিক থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও অতি জরুরি। কারণ তিনি এবং তার দল রয়েছে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে: তিনি কি ইতিহাসে এমন একজন নেতা হিসেবে থাকবেন যিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করেছেন কিন্তু শেষপর্বে রাজনৈতিক বৈধতা হারিয়েছেন? নাকি তিনি রাজনৈতিকভাবে নতুন একটি পর্যায় তৈরি করতে পারবেন, যেখানে তার নেতৃত্বের অর্জন স্বীকার করা হবে, একই সঙ্গে তার শাসনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোরও জবাবদিহি হবে? উত্তরটি নির্ভর করবে তিন পক্ষের অবস্থান, মনোভাব ও কার্যক্রমের ওপর, যারা হলেন-শেখ হাসিনা নিজে, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
 

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
 

শেখ হাসিনাকে যদি রাজনৈতিকভাবে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হতে হয়, তাকে আত্মসমালোচনার রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে হবে। আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত হতে হবে। আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, রাজনৈতিক জবাবদিহির মাত্রা ও পরিধি কতোটুকু হবে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনকারী জুলাই চেতনাপন্থি দলগুলোর মনোভাব ও অবস্থান এক্ষেত্রে উপেক্ষা করা মোটেও সমীচীন হবে না।
অতএব, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন আর একক ব্যক্তির ভাগ্য নয়। এটি তার নিজের, দলের এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতেরও একটি জটিল রসায়ন। কারণ একটি গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই বোঝা যায়, যখন সে ক্ষমতাসীনকে যেমন জবাবদিহির আওতায় আনে, তেমনি ক্ষমতাচ্যুতেরও ন্যায্যবিচার নিশ্চিত করে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা হবে না: হবে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরীক্ষা।
 

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং  নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

 

মতামত'র অন্যান্য খবর