আ ন্ত র্জা তি ক

র‌্যাপার থেকে নিউ ইয়র্কের মেয়র

মোহাম্মদ আবুল হোসেন | আন্তর্জাতিক
নভেম্বর ৮, ২০২৫
র‌্যাপার থেকে  নিউ ইয়র্কের মেয়র

জোহরান মামদানি। ৩৪ বছর বয়সী এই তরুণ অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস রচনা করেছেন। তিনি বিশ্বের এক নম্বর শক্তিধর প্রেসিডেন্ট ও ব্যক্তি ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ এক সময় তিনি ছিলেন একজন র‌্যাপার। এখানে ওখানে র‌্যাপ সংগীত করতেন। ব্রঙ্কস হাইস্কুল অব সায়েন্সে পড়াকালীন স্কুলে প্রথম ক্রিকেট দল গঠন করেন। অন্যদের সঙ্গে তিনি এই টিমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ভারতীয় পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে তিনি একজন মুসলিম। তার পিতা-মাতাও মুসলিম। তার জন্ম উগান্ডার কাম্পালায়। মাত্র ৭ বছর বয়সে চলে যান নিউ ইয়র্কে। তারপর থেকে ক্রমশ তার উত্থান শুরু। নিজের আইকিউ, পারিপার্শ্বিকতা থেকে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন বিশ্বজোড়া নাম। বাংলাদেশের সময় গত মঙ্গলবার মেয়র নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বুধবার সকালেই খবর পাওয়া যায় তিনি নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সমস্ত মিডিয়া প্রধান ফোকাস করে মামদানির ওপর। সব মিডিয়ার প্রধান সংবাদ শিরোনাম হন জোহরান মামদানি। এমনটা হয় যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। অন্য রাজ্যের মেয়র নির্বাচন নিয়ে এমন শিরোনাম এর আগে হয়নি। কিন্তু নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত মামদানিকে নিয়ে হয়েছে। এর কারণ যদি বলা হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধিতা, তাহলে বোধকরি খুব বাড়িয়ে বলা হয় না। নির্বাচনের আগেই মামদানির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আক্রমণ শাণিয়ে যেতে থাকেন ট্রাম্প। তিনি হুমকি দেন মামদানি নির্বাচিত হলে তিনি নিউ ইয়র্কের জন্য ফেডারেল অর্থায়ন কর্তন করে দেবেন। পাশাপাশি তিনি সমর্থন দেন আরেক ডেমোক্রেট, নিউ ইয়র্কের সাবেক গভর্নর, এবারের স্বতন্ত্রপ্রার্থী অ্যানড্রু কুমোকে। একে অনেকে এই নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এই বিরোধিতাকে টেক্কা দিয়ে মামদানি নির্বাচিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনপন্থি তার অবস্থানের কারণে, ইসলামের প্রতি তার অকুণ্ঠ অবস্থান এবং অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে মুসলিমসহ সব শ্রেণির মানুষ তাকে ভোট দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তার স্ত্রী রামা দুয়াজি। এসব নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া রিপোর্টে সয়লাব। তাতে বলা হচ্ছে, মামদানি জন্মগ্রহণ করেন উগান্ডার কাম্পালায়। তার পিতামাতা ভারতীয়। তিনি ২০১৮ সালে আমেরিকান নাগরিকত্ব পান। তিনি ৭ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক চলে যান। আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বাস করেন। তার মা মীরা নায়ার একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মুনসুন ওয়েডিং’ ‘দ্য নেমসেক’ ও ‘মিসিসিপি মাসালা’। তার পিতা মাহমুদ মামদানি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবতাবিদ্যার অধ্যাপক। মামদানি রামা দুয়াজি নামে একজন সিরিয়ান-আমেরিকান শিল্পীকে বিয়ে করেছেন। তারা কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় বসবাস করেন। মামদানি ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্সে পড়াকালীন স্কুলের প্রথম ক্রিকেট দল সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালে তিনি বাওডইন কলেজ, মেইন থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হন। কলেজে তিনি স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন অধ্যায়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। কলেজ শেষের পর তিনি কুইন্সে ফোরক্লোজার প্রতিরোধ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন, যা তাকে রাজনীতিতে প্রেরণা দেয়। তিনি স্থানীয় হিপ-হপ দৃশ্যে ‘ইয়াং কার্ডামম’ এবং পরে ‘মিস্টার. মার্ডামম’ নামে র‌্যাপিং করতেন। মামদানি কুইন্স এবং ব্রুকলিনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের জন্য প্রচারণা চালিয়ে রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
অক্টোবরে যখন তিনি মেয়রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘোষণা করেছিলেন, জোহরান মামদানি তখন ছিলেন  কুইন্স রাজ্যের একজন আইনপ্রণেতা, যাকে নিউ ইয়র্ক সিটির বেশির ভাগ বাসিন্দা চিনতেন না। কিন্তু তা ঘটে ৩৪ বছর বয়সী এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী জুনে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে নিউ ইয়র্কের সাবেক গভর্নর অ্যানড্রু কুমোর বিরুদ্ধে চমকপ্রদ বিজয় অর্জনের আগে। মঙ্গলবার মামদানি তার রাজনৈতিক উত্থান সম্পন্ন করলেন, আবারো কুমোকে পরাজিত করে। পরাজিত করলেন রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে। এই সাবেক ফোরক্লোজার প্রতিরোধ পরামর্শদাতা এবং এক সময়ের র‌্যাপার নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র, প্রথম আফ্রিকায় জন্ম নেয়া মেয়র এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। এ ছাড়াও তিনি সর্বাধিক একশ’ বছরের মধ্যে নিউ ইয়র্ক সিটির সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র। বিজয়ী ভাষণে তিনি নিউ ইয়র্কবাসীকে আশ্বাস দিয়েছেন। বলেছেন, আমি প্রতিদিন সকালে একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে জাগবো- এই শহরকে আপনার জন্য আগের দিনের চেয়ে আরও ভালো করে তোলার উদ্দেশ্যে। মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির জন্য একটি আশাবাদী পরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তার প্রচারণায় বড় নীতি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সাধারণ নিউ ইয়র্কবাসীর জীবনযাত্রার খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছিল। যেমন ফ্রি শিশু যত্ন, ফ্রি বাস সার্ভিস, ভাড়াভিত্তিক অ্যাপার্টমেন্টে থাকা মানুষদের জন্য ভাড়া স্থগিতকরণ, নতুন সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প। এর বেশির ভাগ অর্থ আহরণ করা হবে ধনী মানুষের ওপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে। তিনি শহর পরিচালিত ক্রয়পত্র দোকান চালু করারও প্রস্তাব দিয়েছেন, যা উচ্চ খাদ্যমূল্য মোকাবিলার উপায় হিসেবে কাজ করবে।


ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি জয়ের পর থেকে মামদানি কিছু বিতর্কিত বক্তব্য নমনীয় করেছেন, বিশেষ করে আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত। তিনি ২০২০ সালে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ‘ফান্ডিং কমানোর’ আহ্বান থেকে সরে এসেছেন। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে ‘বর্ণবৈষম্যমূলক’ বলার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। যদিও মামদানি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকার সদস্য, তিনি বলেছেন যে, তিনি নিজস্ব স্বতন্ত্র প্ল্যাটফরমে নির্বাচন করছেন এবং ওই সংগঠনের সব নীতি মানেন না। মামদানি তার ধর্মকে কেন্দ্রে রেখেছেন। বিশেষ করে নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে বিরূপ মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে তিনি নিজের অবস্থান অটল রাখেন। অক্টোবরের শেষের দিকে ব্রঙ্কসের একটি মসজিদের বাইরে তিনি শহরের মুসলিম জনগণের দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা বলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন তার স্ব-পরিচয়কে আরও গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন। তিনি বলেন, আমি আমার প্রকৃতি, আমার খাওয়া বা আমার ধর্ম পরিবর্তন করবো না। তবে একটি জিনিস পরিবর্তন করবো- আমি আর ছায়ায় নিজেকে খুঁজবো না, আমি আলোর মধ্যে নিজেকে খুঁজবো। মামদানি জন্মগ্রহণ করেন উগান্ডার কাম্পালায়। তার পিতা-মাতা ভারতীয়। ২০১৮ সালে আমেরিকান নাগরিকত্ব পান তিনি। তিনি ৭ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক চলে যান। আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বাস করেন। তার মা মীরা নায়ার একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মুনসুন ওয়েডিং’ ‘দ্য নেমসেক’ ও ‘মিসিসিপি মাসালা’। তার পিতা মাহমুদ মামদানি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবতাবিদ্যার অধ্যাপক। মামদানি রামা দুয়াজি নামে একজন সিরিয়ান-আমেরিকান শিল্পীকে বিয়ে করেছেন। তারা কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় বসবাস করেন। মামদানি ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্সে পড়াকালীন স্কুলের প্রথম ক্রিকেট দল সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালে তিনি বাওডইন কলেজ, মেইন থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হন। কলেজে তিনি স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন অধ্যায়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। কলেজ শেষের পর তিনি কুইন্সে ফোরক্লোজার প্রতিরোধ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন, যা তাকে রাজনীতিতে প্রেরণা দেয়। তিনি স্থানীয় হিপ-হপ দৃশ্যে ‘ইয়াং কার্ডামম’ এবং পরে ‘মিস্টার. মার্ডামম’ নামে র‌্যাপিং করতেন। মামদানি কুইন্স এবং ব্রুকলিনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের জন্য প্রচারণা চালিয়ে রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০২০ সালে প্রথমবার নিউ ইয়র্ক অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন, কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দীর্ঘদিনের ডেমোক্রেটিককে হারিয়ে। তার নির্বাচিত অন্যতম নীতি হলো শহরের কিছু বাস বছরের জন্য বিনামূল্যে চালু করা। তিনি এমন আইন প্রস্তাব করেন যা নন-প্রফিটকে অননুমোদিতভাবে ইসরাইলের বসতি কার্যক্রম সমর্থন করতে না দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে বিশেষ করে কুমো, মনে করতেন যে তিনি নিউ ইয়র্ক সিটি পরিচালনার জটিলতার জন্য অপর্যাপ্ত। কিন্তু মামদানি তার আপেক্ষিক অভিজ্ঞতার অভাবকে শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। বলেন, তিনি কুমোর ‘ভ্রষ্টাচার, কেলেঙ্কারি এবং অপমানের অভিজ্ঞতা’ নেই বলে গর্বিত।
মামদানি বলিউড ও তার ভারতীয় বংশোদ্ভূতের ইঙ্গিতযুক্ত ভাইরাল ভিডিও ব্যবহার করেছেন ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য। নতুন বছরের দিনে তিনি  কোনি আইল্যান্ডে ঠাণ্ডা পানিতে গিয়ে ‘ভাড়া ফ্রিজ’ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। খাবারের ঠেলাগাড়ির বিক্রেতাদের সঙ্গে ‘হালাল-ফ্লেশন’ নিয়ে কথা বলেন। টিকটকে স্প্যানিশ, বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় টেলিভিশন বিজ্ঞাপনগুলো ভাইরাল ভিডিওর সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের অধিকার বিষয়ক সমর্থক। ফলে মামদানি ইসরাইলকে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি ইসরাইলকে গাজায় গণহত্যার জন্য দায়ী করেন। বলেন, ইসরাইল সবার জন্য সমান অধিকারসহ রাষ্ট্র হিসেবে থাকা উচিত, শুধু ইহুদি রাষ্ট্র নয়। তার এই অবস্থান তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতাদের সমালোচনার মুখোমুখি করে। কুমো অভিযোগ করেন মামদানির কারণে ইহুদিবিদ্বেষ উস্কে দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিজয়ী ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, তার নেতৃত্বে সিটি হল ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।


ট্রাম্প বনাম মামদানি: সামনে বিরোধ তীব্র হবে:  প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জোহরান মামদানিকে চরমপন্থি, কমিউনিস্ট এবং নিউ ইয়র্ক সিটির জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে আক্রমণ করছেন। এমনকি বলেছেন, তিনি ‘৩৪ বছর বয়সী মামদানির চেয়ে অনেক বেশি সুদর্শন।’ কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে, ট্রাম্প নাকি মামদানিকে ‘একজন মেধাবী রাজনীতিক, চটপটে ও ভালো বক্তা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এমনটি জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী। তবে আড়ালে এই প্রশংসা সত্ত্বেও, দুই নেতার মধ্যে একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হচ্ছে। একদিকে তরুণ গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মামদানি, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই তাকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছেন। মামদানির জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প মন্তব্য করেন- ‘ডেমোক্রেটরা পাগল হয়ে গেছে। আর সেই মামদানি, বা ওর যা-ই নাম হোক না কেন, সেও পাগল।’ হোয়াইট হাউসের সহযোগী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা স্বীকার করছেন, এখন থেকে মামদানি ও নিউ ইয়র্ক সিটি হবে ট্রাম্পের আক্রমণের নতুন লক্ষ্যবস্তু। তবে কেউ কেউ সতর্ক করছেন যে, নিউ ইয়র্কের অর্থনৈতিক সাফল্য ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। কারণ তার বহু রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি এই শহরেই। বুধবার ট্রাম্প বলেন, আমরা নিউ ইয়র্ককে সফল দেখতে চাই। হয়তো আমরা তাকে সামান্যই সাহায্য করবো। তবু তিনি শহরটিকে দেয়া ফেডারেল অর্থ বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছেন, ‘আইনে যতটা বাধ্যতামূলক, কেবল ততটাই দেবো’ বলে সতর্ক করেছেন। যদিও সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের পক্ষে কংগ্রেস অনুমোদিত ফেডারেল অর্থ আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব- আগেও অভিবাসন নীতির প্রশ্নে তেমন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে আদালতে। নিউ ইয়র্ক সিটি ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে স্বাস্থ্য, পরিবহন, আইন প্রয়োগসহ অসংখ্য খাতে অর্থ পায়। এ অর্থ বন্ধ করলে শহর কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই আদালতে যাবে। অন্যদিকে, মামদানি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত বলেই মনে হয়। বিজয় ভাষণে তিনি ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প, যেহেতু আমি জানি আপনি দেখছেন, তাই আপনার জন্য আমার চারটি শব্দ আছে- চিৎকার করতে থাকুন! তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নিউ ইয়র্ক শহরে ফেডারেল হস্তক্ষেপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন। মামদানি বলেন, আমাদের মধ্যে কারও কাছে পৌঁছাতে হলে, আপনাকে আমাদের সবার মধ্যদিয়ে যেতে হবে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহারের মোকাবিলায় মামদানি শহরের আইন বিভাগে অতিরিক্ত ২০০ জন আইনজীবী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন। তার প্রচার শিবির একে বলছে ‘প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত ক্ষমতার’ বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ফেডারেল সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বহুবার। তিনি ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও শহরগুলোর ফেডারেল অনুদান কয়েক বিলিয়ন ডলার কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি তাদের আপত্তি সত্ত্বেও ন্যাশনাল গার্ড পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া, নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেলসহ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। তবু ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু সহযোগী মনে করছেন, মামদানির জয় ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ‘উপকারী’ হতে পারে। তারা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট আবারো তার পুরনো কৌশল ব্যবহার করবেন। তার মধ্যে ডেমোক্রেট নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। যেমন ন্যান্সি পেলোসি, আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ এবং বিলিয়নিয়ার জর্জ সোরোসকে করেছেন অতীতে। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে মামদানির অপ্রত্যাশিত জয়ের পর থেকেই ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা তাকে ডেমোক্রেট পার্টির ভবিষ্যৎ মুখ হিসেবে তুলে ধরছেন- যেন পুরো দলটি এখন চরম বামপন্থি হয়ে গেছে। বুধবার ট্রাম্প বলেন, সে ভাবে পুরুষদের মহিলাদের খেলায় অংশ নেয়া দারুণ ব্যাপার। এ বক্তব্য ছিল ট্রান্সজেন্ডার নারীদের নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে। মামদানি অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি ট্রান্সজেন্ডার অধিকার ও এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের সুরক্ষার পক্ষে এবং নিউ ইয়র্ককে ‘একটি নিরাপদ আশ্রয়’ বানাতে চান। এক সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন,  প্রেসিডেন্ট যদি জীবনযাত্রার খরচ কমানো বা বাজারে পণ্যের দাম হ্রাসের প্রতিশ্রুতিতে একসঙ্গে কাজ করতে চান, আমি প্রস্তুত। কিন্তু যদি তিনি নিউ ইয়র্কের মানুষের বিরুদ্ধে আসেন, আমি প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের পাশে থাকবো। ডেমোক্রেট কৌশলবিদ ডেভিড এক্সেলরড মন্তব্য করেন, মামদানির কিছু বক্তব্য ‘অপ্রয়োজনীয় শিশুসুলভ প্রতিক্রিয়া’। ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ট্রলিং’ প্রতিযোগিতা তেমন ফলদায়ক নয়, তবে শহরের ওপর তার রাজনৈতিক হামলার সময় দৃঢ় থাকা দরকার।’ ট্রাম্প নিজেও জন্মসূত্রে নিউ ইয়র্কার, শহরের রাজনীতিতে তার ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রবল। তার সহযোগীরা মামদানির প্রার্থিতা ব্যর্থ করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। গত বছর ট্রাম্প একাধিকবার নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রচারণা চালান, যদিও শহরটি ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্রেটদের ঘাঁটি। কিছু প্রভাবশালী রিপাবলিকান ব্যবসায়ী ট্রাম্পকে নরম কূটনৈতিক পথ বেছে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। নিউ ইয়র্কের ধনকুবের ও তেল ব্যবসায়ী জন কাটসিমাটিডিস বলেন, আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছি, নিউ ইয়র্কবাসীর কল্যাণে বরাদ্দকৃত অর্থ বন্ধ রাখবেন না। সেনা পাঠানোরও দরকার নেই। বরং তিনি যেন শহরের ফেডারেল অর্থ ব্যয়ের ওপর নজর রাখেন। ট্রাম্প নিউ ইয়র্ককে ভালোবাসেন, তাই তিনি বিষয়টি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। 


রামা দুয়াজি কে?: ২৮ বছর বয়সে রামা দুয়াজি নিউ ইয়র্ক সিটির সবচেয়ে কম বয়সী ফার্স্টলেডি হচ্ছেন। তার স্বামী জোহরান মামদানি মঙ্গলবার রাতে মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরে তার বিজয় ভাষণে মামদানি তার স্ত্রীকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানান। এসময় তিনি তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মামদানি বলেন, ‘আমার অবিশ্বাস্য স্ত্রী, রামা, হায়াতি’। তিনি আরবি শব্দ ‘হায়াতি’ ব্যবহার করেন, যার অর্থ ‘আমার জীবন।’ তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে এবং প্রতিটি মুহূর্তে পাশে কাউকে চাইলে তা তুমি। তুমি একমাত্র সেই ব্যক্তি যার পাশে আমি থাকতে চাই।
দুয়াজি নিউ ইয়র্কভিত্তিক একজন শিল্পী। তিনি সিরিয়ান বংশোদ্ভূত। তার কাজ প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়বস্তু নিয়ে হয়। তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে বিবিসি নিউজ, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ভাইস এবং  লন্ডনের ‘টেট মডার্ন’ মিউজিয়ামে। ১২ই মে মামদানি একটি পোস্টে লিখেছেন, রামা শুধুই আমার স্ত্রী নন; তিনি একজন অসাধারণ শিল্পী, যাকে তার নিজের শর্তে চেনা উচিত। দুয়াজি সেই পোস্টে মজার ছলে লিখেছিলেন, ‘ওএমজি, তিনি বাস্তব!’


এই দম্পতি ডেটিং অ্যাপ ‘হিঙ্গে’র মাধ্যমে পরিচিত হন। মামদানি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এতে বোঝা যায় যে ডেটিং অ্যাপগুলোতে এখনো আশা আছে। নির্বাচনের শুরুতে দুয়াজিকে কম দেখা যেত। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অভিযোগ তোলে, ৩৪ বছর বয়সী রাজ্য আইনপ্রণেতা মামদানি তার স্ত্রীকে ‘লুকাচ্ছেন’। এটি লক্ষণীয়, কারণ মার্কিন প্রার্থীরা প্রায়শই পরিবারের মূল্যবোধ প্রদর্শনের জন্য তাদের স্বামী/স্ত্রীকে প্রকাশ্যে রাখেন। মামদানি মে মাসের পোস্টে লিখেছেন, স্ত্রী অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা নিয়ে তিনি উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আজ বা অন্য কোনো দিন যদি আপনি টুইটার দেখেন, আপনি জানবেন রাজনীতি কতোটা কঠোর হতে পারে। আমি সাধারণত এটি উপেক্ষা করি, হোক তা মৃত্যুর হুমকি বা আমাকে বিতাড়িত করার আহ্বান। কিন্তু যখন এটি আপনার প্রিয়জনকে নিয়ে, তখন আলাদা। আপনি আমার মতামত সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু আমার পরিবার নয়।


সিএনএন অনুসারে, দৃশ্যমান হওয়া এড়ালেও দুয়াজি অন্তরঙ্গভাবে একটি প্রেরণাদায়ক শক্তি ছিলেন। তিনি মামদানির ব্র্যান্ড পরিচয় চূড়ান্ত করতে সাহায্য করেন। যার মধ্যে রয়েছে হলুদ, কমলা এবং নীল প্রচারণার উপকরণে ব্যবহার করা সাহসী আইকনোগ্রাফি ও ফন্ট। দুয়াজি হিউস্টন, টেক্সাসে জন্মগ্রহণ করেন। ৯ বছর বয়সে দুবাই চলে যান। এরপর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কাতারে স্কুলে যান। তার বাবা-মা দামেস্কের সিরিয়ান মুসলিম। ক্যামেরা এড়িয়ে চললেও, দুয়াজির কিছু বন্ধু তার প্রশংসা করেন। এক বন্ধু হাসনাইন ভট্টি বলেন, তিনি আমাদের আধুনিক যুগের প্রিন্সেস ডায়ানা। অন্যরা বলেছেন, তিনি উদ্দীপিত কিন্তু বাড়তে থাকা মনোযোগে অত্যধিক চাপ অনুভব করছেন।


দুয়াজি ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং পরে স্কুল অব ভিজুয়াল আর্টস, নিউ ইয়র্ক থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। 

আন্তর্জাতিক'র অন্যান্য খবর