বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৬ সালের শুরুতে তিনি ভেনেজুয়েলা অভিযানের মধ্যদিয়ে বিস্মিত করেছেন বিশ্ববাসীকে। গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নেয়ার হুমকি দেয়ার ফলে ইউরোপের সঙ্গে টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, তারা ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’। অর্থাৎ তারা যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত। এখনো গাজা সংকটের সমাধান হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো কিনারা করেননি, অথচ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। নিষেধাজ্ঞা দেয়া রাশিয়ার তেল কিনে ভারত। এজন্য ভারতের বিরুদ্ধে শতকরা ৫০০ ভাগ শুল্ক আরোপের একটি বিলে সমর্থন দিয়েছেন ট্রাম্প। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভালো বন্ধু’ বলে অভিহিত করেছেন। এটা তার মুখের কথা। কিন্তু শতকরা ৫০০ ভাগ শুল্ক আরোপের ফলে তার সেই ভালো বন্ধুর ওপর কী পরিমাণ চাপ বাড়বে- সেটা হয়তো তিনি আগেই হিসাব কষেছেন। ফলে নিজের স্বার্থের জন্য অথবা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি বন্ধুত্বের সম্পর্ক কোথায় যাচ্ছে- সেদিকে আমলেই নিচ্ছেন না। ট্রাম্প সতর্ক করেছেন কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোকে। এসব কারণে সারা বিশ্বে এক চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশ্বনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি- সমস্ত সমীকরণ ভেঙে গেছে বা যাচ্ছে। সামনে উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। তাতে কে হারবেন, কে জিতবেন- তা এখনই বলা যায় না। ডনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকে এলোমেলো চিন্তার মানুষ বলে থাকেন। তারা বলেন, তিনি যা বলেন অনেক সময় তার কোনো অর্থ থাকে না।
শুধু বলার জন্য বলেন। কিন্তু গত ৩রা জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অপারেশন চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আটকের পর তাদেরকে মিডিয়ার সামনে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে করা কতোটা সমীচীন তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর একটাই লক্ষ্য। তা হলো- ভেনেজুয়েলায় মজুত থাকা তেল ও খনিজ সম্পদ। অবশ্য এরইমধ্যে সেখানকার তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এই তেল বিক্রি করা অর্থ ব্যবহার করা হবে ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে। যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসন ভুয়া অভিযোগ তুলে একই কাজ করেছে ইরাকে। সেখানকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের হাতে ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আছে- এমন মিথ্যা অভিযোগে ইরাক থেকে উৎখাত করা হয়েছে সাদ্দাম হোসেন ও তার প্রশাসনকে। ফলে ইরাকের তেলের পুরো নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। আর ইরাক নিমজ্জিত হয়েছে গৃহযুদ্ধে। এর পরের ইরাকের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। একসময় রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতা থাকলেও ইরাকিরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতেন। একই পরিণতি হয়েছে মুয়াম্মার গাদ্দাফির লিবিয়ায়। এসব নেতা তার দেশের তেল বিক্রি করে, সেই অর্থে জনগণকে বিনামূল্যে সব রকম সুবিধা দিতেন। কিন্তু গাদ্দাফিকে উৎখাত করার পর লিবিয়া গৃহযুদ্ধে ডুবে আছে। একটি সর্বজন স্বীকৃত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে। একইসঙ্গে এক লিবিয়াকে নিয়ে দু’টি সরকার কাড়াকাড়ি করছে। একটি জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বে। অন্যটি জাতিসংঘের অনুমোদনে। ফলে প্রায়শই সেখানে দুই গ্রুপের লড়াই দেখা দেয়। গত কয়েকদিনে বিশ্লেষকরা যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন এবং ডনাল্ড ট্রাম্প যা বলছেন, তাতে কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকো, ইরানের ভাগ্য সরলদোলকের ববের মতো দুলছে। এসব দেশের খনিজ সম্পদের ওপর দৃষ্টি পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যেকোনো সময় তাদের ওপর নেমে আসতে পারে খড়গ।
আগে থেকেই ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে বা কিনে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর পরই তিনি আবারো গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়াকে হুমকি বলে অজুহাত দাঁড় করানো হয়েছে। বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি এ দু’টি দেশ। উত্তর মেরুর কাছাকাছি শান্ত দেশ কানাডাকেও যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বানানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। এর কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে কানাডা সরকার। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে ভালো, তা মোটেও বলা যাবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত সস্তায় তেল কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে। এজন্য ট্রাম্প ভীষণ নাখোশ। তিনি সর্বশেষ এ বিষয়ে ভারতের বিরুদ্ধে শতকরা ৫০০ ভাগ শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। ওদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট, সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে তুরস্কে হত্যার জন্য সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই ক্রাউন প্রিন্স যখন সৌদি আরবে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন, তখন সব ফকফকা হয়ে যায়। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। সেখানে মার্কিন প্রশাসন তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়েছে এবং দিচ্ছে। সবমিলিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বব্যবস্থার যে শৃঙ্খল তা ভেঙে দিয়েছেন তিনি। বড় আকারে অস্থিরতা কাজ করছে সারা বিশ্বে। যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে তাকে কোকেনের ‘ডন’ আখ্যা দেন, তখন মনে রাখার বিষয় হলো- মাত্র গত মাসেই ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রধান মনোযোগ আসলে ফেন্টানিলের দিকে। একে তিনি ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কারণ ফেন্টানিলসহ কৃত্রিম ওপিওয়েডগুলো যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত মাদক সেবনে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। যখন তিনি বলেন, নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ছিল নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ, তখন ১৫০টিরও বেশি বিমান, ডেল্টা ফোর্সের হেলিকপ্টার, বোমা আর বিশেষ বাহিনীর সৈন্যদের হিসাব কষে দেখা উচিত। সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন বিমান হামলায় ভেনেজুয়েলায় কমপক্ষে ১১৫ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের সন্দেহ তোলা হয়। কিন্তু অভিযোগ গঠন করা হয়নি, বিচারও হয়নি। দ্য আটলান্টিক এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ওয়াশিংটনে এক আইনপ্রণেতাকে যখন বিমান হামলার ভিডিও দেখানো হয়, তিনি প্রায় বমি করে ফেলেছিলেন। এই রকম নাটকীয়তার কৃতিত্ব দিতে হলে তা দিতে হবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে।
‘নতুন নয়’ প্রসঙ্গে আসা যাক। মাদুরো মোটেও প্রথম নেতা নন যাকে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে দিয়েছে। চিলির সালভাদোর আয়েন্দে, ব্রাজিলের জোয়াও গুলার্ত, পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগা- তাদের রাজনৈতিক পরিণতি ভিন্ন হলেও শেষটা হয়েছিল ওয়াশিংটনের সৌজন্যে। ২০০৫ সালে হার্ভার্ডের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪- এই প্রায় একশ’ বছরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার লাতিন আমেরিকায় কমপক্ষে ৪১বার সফলভাবে সরকার পরিবর্তনে হস্তক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ এক শতাব্দী ধরে গড়ে প্রতি ২৮ মাসে একবার।’ একইভাবে প্রেসিডেন্ট যখন হঠাৎ ‘ডনরো মতবাদ’ নিয়ে কথা বলেন, তখন প্রাজ্ঞ বিশ্লেষকরা মাথা নাড়েন। গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্র নাইজেরিয়ায় বোমা ফেলেছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে উৎখাত করতে ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প মতবাদ নয়, চুক্তি করেন। তার প্রশাসনের ভেতরে স্টিফেন মিলাররা যতই আদর্শবাদী হোন না কেন, ট্রাম্প নিজে এতটাই সুযোগসন্ধানী যে, কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গে তিনি বাঁধা থাকেন না।
শৃঙ্খলার অভাব চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে। কারাকাসে অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানও লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানাতে ভোলেননি যে, কংগ্রেসের মিত্রদের জানানোর আগেই তিনি কয়েকজন ব্যবসায়ীকে খবর দিয়েছিলেন। আর ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ লুটের কথা- সেটা নিছক কল্পনা। অপরিশোধিত তেলের দাম পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন। ফলে দূরবর্তী ওরিনোকো বেল্টে খনন করতে বড় তেল কোম্পানিগুলোর কোনো আর্থিক আগ্রহই নেই। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভেনেজুয়েলার তেল তুলতে যে বিনিয়োগ দরকার, তার পরিমাণ নাকি গত বছর সব বড় মার্কিন তেল কোম্পানি মিলিয়ে যা খরচ করেছে, তার চেয়েও বেশি।
এটি কোনো নতুন বিশ্বব্যবস্থা নয়, নতুন সাম্রাজ্যবাদও নয়। এগুলো পুরনো বইয়ের পুরনো ধারণা- যেগুলো আমেরিকান পুঁজিবাদ কতোটা বদলেছে বা ট্রাম্প আসলে কার সঙ্গে কাজ করছেন, তা ধরতেই পারে না। ্ত
ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজরে কোন দেশ?
সম্প্রতি এ প্রশ্নটি বহুবার দেখা গেছে বিশ্ব মিডিয়ায়। এর বিশ্লেষণও বিশ্ব জুড়ে ভয়ার্ত এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। তার ট্রাম্পের দৃষ্টি এখন ইরান, গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকো সহ আরও কিছু দেশে। এসব দেশের সব জায়গায়ই আছে প্রাকৃতিক সম্পদ। ট্রাম্পের ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি লাতিন আমেরিকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন- এটা পরিষ্কার। তার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে যেসব দেশের দিকে ট্রাম্পের কড়া নজর তা নিম্নরূপ-
গ্রিনল্যান্ড: ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর নাম পিটুফিক স্পেস বেস। একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেই খুশি থাকতে চান না ট্রাম্প। তিনি চান পুরো দ্বীপটিই। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তার দাবি, অঞ্চলটি রুশ ও চীনা জাহাজে ভর্তি হয়ে আছে। উল্লেখ্য, ডেনমার্কের রাজত্বের অংশ এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২,০০০ মাইল (৩,২০০ কি.মি) দূরে অবস্থিত। এটি বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এসব খনিজ সম্পদ স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এই বিরল খনিজের উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন বহুগুণ এগিয়ে। গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকে একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশাধিকার দেয়। আগামী বছরগুলোতে বরফ গলে গেলে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের প্রস্তাবকে কল্পনা বলে অভিহিত করেন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন। তিনি বলেন, আর কোনো চাপ নয়। আর কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ কথা নয়। দখলদারির কল্পনা নয়। আমরা সংলাপের পক্ষে। আমরা আলোচনার পক্ষে। কিন্তু তা হতে হবে সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করে।
কলম্বিয়া: ভেনেজুয়েলায় অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করে বলেন, ‘ওয়াচ হিজ অ্যাস’। অর্থাৎ তার পশ্চাৎদেশের দিকে নজর রাখুন। ভেনেজুয়েলার পশ্চিমে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য তেলভাণ্ডার। দেশটি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লা উৎপাদন করে। এটি অঞ্চলটির মাদক বাণিজ্যেরও একটি প্রধান কেন্দ্র, বিশেষত কোকেনের ক্ষেত্রে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র বোট লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। তারা বলেছে, ওই বোটগুলো মাদক বহন করছিল, যদিও কোনো প্রমাণ দেখায়নি। এরপর থেকে দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে গেছে। অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অভিযোগ ছিল তিনি কার্টেলগুলোকে অনুমোদন দিচ্ছেন। রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া এক অসুস্থ মানুষের হাতে পরিচালিত হচ্ছে; যিনি কোকেন বানাতে আর যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে ভালোবাসেন। তিনি আরও বলেন, তিনি খুব বেশিদিন এটি করতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্র কি কলম্বিয়ায় কোনো অভিযান চালাবে কি না?- এমন প্রশ্নে ট্রাম্প জবাব দেন, আমার কাছে ঠিক (ও রকমই) শোনাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে কলম্বিয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ ঘনিষ্ঠ মিত্র। কার্টেল মোকাবিলায় দেশটি প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পায়।
ইরান: ইরানে বর্তমানে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে এবং ট্রাম্প সতর্ক করেছেন আরও বিক্ষোভকারী নিহত হলে দেশটিকে খুব বড় আঘাত করা হবে। তিনি বলেন, আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছি। যদি তারা আগের মতো মানুষ হত্যা শুরু করে, তবে আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে তারা খুব জোরালো আঘাত পাবে। তাত্ত্বিকভাবে ইরান ‘ডনরো ডকট্রিন’র আওতার বাইরে পড়লেও, ট্রাম্প এর আগেও ইরানি শাসনব্যবস্থাকে আরও পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। বিশেষত গত বছর তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর। সেই হামলার আগে ইসরাইল-ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ছিন্নভিন্ন করার লক্ষ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। এর পরিণতিতে ১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ হয়। গত সপ্তাহে মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরান ছিল আলোচনার শীর্ষ বিষয়। মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, নেতানিয়াহু ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার সম্ভাবনাও উত্থাপন করেন।
মেক্সিকো: ২০১৬ সালে ট্রাম্পের ক্ষমতায় যাওয়া মূলত নির্ধারিত হয়েছিল তার ‘বিল্ড দ্য ওয়াল’- অর্থাৎ মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের স্লোগান দিয়ে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনই তিনি একটি নির্বাহী আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘গাল্ফ অব আমেরিকা’ রাখেন। তিনি প্রায়ই অভিযোগ করেন, মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে যথেষ্ট করছে না। রোববার তিনি বলেন, মাদক ধেয়ে আসছে মেক্সিকোর মধ্যদিয়ে এবং আমাদের কিছু একটা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সেখানে কার্টেলগুলো খুব শক্তিশালী। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, মেক্সিকোর ভূখণ্ডে কোনো ধরনের যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ তিনি মেনে নেবেন না।
কিউবা: ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল (১৪৫ কি.মি) দক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কিউবার। রোববার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। কারণ কিউবা ভেঙে পড়ার পথে। তিনি বলেন, আমার মনে হয় না আমাদের কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে হচ্ছে এটা নিচের দিকে যাচ্ছে। আমি জানি না তারা টিকে থাকতে পারবে কি না। কিন্তু এখন কিউবার কোনো আয় নেই। তাদের সব আয়ই আসতো ভেনেজুয়েলা থেকে। ভেনেজুয়েলার তেল থেকে। খবরে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা কিউবার তেলের প্রায় ৩০ ভাগ সরবরাহ করে। ফলে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে সরবরাহ ভেঙে পড়লে হাভানাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও; যিনি কিউবান অভিবাসী পরিবারের সন্তান, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কিউবায় শাসন পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে আসছেন। শনিবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি যদি হাভানায় থাকতাম, আর সরকারে থাকতাম অন্তত একটু হলেও চিন্তিত হতাম। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট যখন কথা বলেন তাকে সিরিয়াসলি নেয়া উচিত।