২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। সেদিন ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কুয়াশার সামিয়ানা টানিয়েছে প্রকৃতি। গাছে গাছে পাতা নীরব। আনন্দ বা বেদনা, কোনোভাবে প্রকাশ করা যায়! রাজধানী ঢাকা তো অবশ্যই, পুরো দেশ এক অদম্য অস্থিরতায় কাঁপছে। রাজপথ নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছে কার্পেটের মতো। তার ওপর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বাংলার মাটিতে খালি পায়ে হাঁটলেন দ্য ম্যাজিকম্যান। যে মাটিতে তার পিতা ঘুমিয়ে, যে মাটিতে তার পিতা সগর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন, সেই মাটি তার রক্তে। তিনি তা প্রমাণ করে দিলেন। বিমানবন্দরে নেমে মাত্র কয়েক কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে ৩০০ ফিট পর্যন্ত যেতে তার সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা। বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে সেই দৃশ্য। তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার বলেছিলেন- ‘আরে ব্যাটা তোর যদি সাহস থাকে দেশে ফিরে আয়’। অন্য যে কেউ হলে ২৫শে ডিসেম্বর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হয়তো বলতেন- ‘আমি দেশে ফিরে এসেছি, আপনি কোথায়?’ কিন্তু তিনি সেই তিরস্কার, উপহাসের জবাব দেননি। এমনকি ওইদিন একটিবারের জন্যও শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নাম মুখে আনেননি। তিনি দেশ গড়ার ডাক দিয়েছেন। মাটি ও মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচার কথা বলেছেন। তখন থেকেই তার শব্দশৈলী, ভাষার ব্যবহার মানুষকে মুগ্ধ করেছে। ২০ বছর আগের তারেক রহমান আর ২০২৫ সালের তারেক রহমানের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য দেখতে পেলো বাংলাদেশ ও বিশ্ব। একজন রাষ্ট্রনায়ক হতে হলে তাকে কতোটা ধৈর্য, কতোটা পরিমিত, কতোটা ধী-শক্তির প্রমাণ দিতে হয়, তার প্রমাণ হয়ে থাকবেন তিনি। তার ক্যারিশমায় এবার বিএনপি বাজিমাত করেছে। এতে কাজ করেছে তারেক রহমানের পারিবারিক শিক্ষা। ছোট্ট বয়সে তিনি পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখেছেন। তখন মাকে দেখেছেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরের খালেদা জিয়াকে দেখেছেন। দেখেছেন, হিমালয় পাহাড় নড়ে তো দেশের ভালোবাসার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া নড়েন না। তার শালীনতাবোধ, শব্দের ব্যবহার আয়ত্ত করেছেন তারেক রহমান। তেমনি পেয়েছেন আরেক অটল, অথচ কোমল হৃদয়ের, অসীম ধৈর্যের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং যোগ্যকন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে। তাদের সম্মিলিত ভালোবাসা ও প্রচারণায় হিংসাকে পেছনে ফেলে তারেক রহমান হয়ে উঠেছেন দ্য ম্যাজিকম্যান। তার বুকে আছে মুক্তিযুদ্ধ আর কণ্ঠে আছে কোমল ভাষার মিশ্রণ। তার এই জয়কে, এবারের নির্বাচনকে সাধুবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। গত কয়েকদিনে বিশ্ব গণমাধ্যম ভূয়সী প্রশংসা করেছে নির্বাচনে তারেক রহমানের এই বিজয়কে। বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসি একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে ভারত-বাংলাদেশের টানাপড়েনের সম্পর্কে। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ভারত শুধু আওয়ামী লীগকে বেছে নিয়ে বাংলাদেশে রোষের শিকারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এই উত্তেজনাকর সম্পর্ককে মিটিয়ে ফেলতে তারা ভারতের কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছে। বলেছে, ভারত বড় প্রতিবেশী। বড় প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের উত্তেজনা মিটিয়ে ফেলার জন্য ভারতকেই উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘যদি দিল্লি থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা জটিল হবে। হাসিনা অনুশোচনা প্রকাশ না করলে বা নেতৃত্ব হস্তান্তর না করলে তার উপস্থিতি সম্পর্ককে জটিল করে তুলবে।’ তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো সম্পর্কের ভিত্তি। দুই দেশ যৌথ সামরিক মহড়া, নৌ টহল, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণ-সুবিধা চালু রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এই সহযোগিতা পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক নির্ভরতা এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এখন ভারত। সম্পর্কের টানাপড়েন স্থায়ী হতে পারে না। আরেক বিশ্লেষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘অতীতে ভারতের সঙ্গে বিএনপি’র সম্পর্ক জটিল ছিল এবং অবিশ্বাসে পূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান অতীতকে ভবিষ্যতের শত্রু হতে দেননি এবং দিল্লিও বাস্তববাদী সংলাপে আগ্রহী- এটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।’ শ্রীরাধা দত্ত আরও বলেছেন, ‘বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই উদ্যোগ নেয়া উচিত। বাংলাদেশ একটি শক্ত নির্বাচন করেছে। এখন সম্পৃক্ত হোন, কোথায় সহযোগিতা করা যায় দেখুন। আশা করি বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে।’ অর্থাৎ, সম্পর্ক পুনর্গঠন নির্ভর করবে কথার চেয়ে আস্থার ওপর এবং বড় প্রতিবেশী কতোটা আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারে, তার ওপর।
ওদিকে সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভূয়সী প্রশংসা করেছে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রতিনিধিদল। তারা বলেছেন, ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন ছিল বিশ্বাসযোগ্য এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত। এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ছিল প্রকৃত অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং মৌলিক স্বাধীনতাগুলোকে মোটামুটি সম্মান জানানো হয়েছে। নির্বাচনী আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আস্থা বজায় রেখে কমিশন নির্বাচনের সততা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে এভাবে মূল্যায়ন করেছে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতিনিধিদল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউ ইওএম) প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইজাবস ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন নিয়ে মিশনের প্রাথমিক বিবৃতি উপস্থাপন করেন শনিবার। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তোমাশ জদেখভস্কি। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আরও বলেন, নাগরিক পর্যবেক্ষক, ফ্যাক্ট-চেকার, তরুণ ও নারী কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে, স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছে। ইইউ ইওএম পর্যবেক্ষকরা জানান, ভোটগ্রহণের দিনটি ছিল সুশৃঙ্খল, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ। নিবেদিতপ্রাণ ভোটকর্মীরা কেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ ও গণনা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় দলীয় এজেন্টদের উপস্থিতি স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এবং প্রচলিত গণমাধ্যমে ফলাফল হালনাগাদ প্রকাশ জনআস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বতন্ত্রভাবে ভোটদানে অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়নি। প্রধান পর্যবেক্ষক উল্লেখ করেন, নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসর তাদের সমান অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ভুয়া তথ্যের কারণে সৃষ্ট গণ-আক্রমণের আশঙ্কা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইতিবাচক পদক্ষেপের অভাবে উপজাতি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে না।
ইজাবস বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে পরিপক্বতার দিকে এগোচ্ছে, তার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পুরনো চর্চাগুলো পরিত্যাগ করার এখনই সময়। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা জোরদার করে নতুন পথে এগোতে হবে। প্রতিনিধিদলের প্রধান তোমাশ জদেখভস্কি বলেন, দেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আমরা নতুন সংসদ ও সরকারকে আহ্বান জানাই অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় অনুমোদিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করুন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এপি, আল জাজিরা, সিএনএন, ভারতের এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা সহ পশ্চিমা মিডিয়ায় তারেক রহমানের প্রশংসা করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনকে যথার্থ বলে সাক্ষ্য দিয়েছে। তাদের অভিন্ন রিপোর্ট, নির্বাসন থেকে ফিরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান। এক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বর্ণনা করা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকায় কায়দে আযম ইউনিভার্সিটি, ইসলামাবাদের শিক্ষক আসিম সাজ্জাদ আখতার দুর্দান্ত একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন। এর শিরোনাম- নতুন এক বাংলাদেশ। বলা হয়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক জীবন ওলটপালট করে দেয়া ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের আঠারো মাস পর বহু প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন অবশেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকেই একে নতুন এমন এক যুগের সূচনা হিসেবে উদ্যাপন করছেন, যে যুগে প্রভুত্ব করবে জনগণ। সংসদে সবচেয়ে বড় দু’টি দল হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী (জেআই)। বিএনপি’র নেতা তারেক রহমান সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তার মা, প্রয়াত খালেদা জিয়া, নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজার দশকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী কার্যত ‘মৃত্যুদশা থেকে ফিরে এসেছে’। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার দায়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ে একমাত্র প্রকৃত ‘নতুন’ শক্তি ছিল ছাত্রনেতৃত্ব, যারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাদের একটি অংশ সম্প্রতি গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করছে, যা নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়েছে।
বিবিসি’র আনবারাসান ইথিরাজন লিখেছেন, ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ধীরে ধীরে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথে হাঁটছে। এই সম্পর্কটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে ভারত। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে অবস্থান করছে ভারত। পাকিস্তানকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে দিল্লি। আর ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে আছে সেই ছাত্র-অভ্যুত্থানের পর থেকে, যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তিনি এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন। ঐতিহাসিকভাবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তবে তারা এটাও জানে যে, তাদের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারতকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিএনপি জানিয়েছে, তারা সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে তাদের অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পথ ধরে হাঁটতে হবে।
ওদিকে মার্কিন সাবেক কূটনীতি জন ড্যানিলোভিজ বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নতুন এক মাইলফলক। বাংলাদেশে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে ‘সফল’ এবং ‘বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিজ। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, নতুন সরকারের এখন ‘সংস্কার এগিয়ে নেয়া এবং দেশ ও এর রাজনীতিকে রূপান্তর করার উচ্চাকাঙক্ষী কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট ম্যান্ডেট রয়েছে।’
ড্যানিলোভিজ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান, নির্বাচনের মাধ্যমে যে স্থিতিশীলতা এসেছে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া মসৃণ হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় পরাজয়বরণ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল। তারা নির্বাচনকে অবৈধ প্রমাণ ও ব্যাহত করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছেন।
অনলাইন এনডিটিভিতে এক নিবন্ধে বলা হয়, তারেক রহমানের জয় ভারতের জন্য কী বার্তা বহন করে। এর ওপর বিশ্লেষণ করা হয়। বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ও দেশত্যাগের পর অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়েছে। সমালোচকদের কাছে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘ডার্ক প্রিন্স’ হিসেবে খ্যাত। এই নেতার জন্য এটি যেন রূপকথার সমাপ্তি।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তিনি দেশ ছাড়েন। ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। ঢাকায় তার প্রত্যাবর্তন ছিল বিশাল জনসমাগমে উচ্ছ্বসিত। নির্বাচনী প্রচারে তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণের অনুরণন টেনে বলেন- ‘...আমার বাংলাদেশের জন্য একটি পরিকল্পনা আছে।’
এখন ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায়।
শুক্রবার সকালে চীন বা পাকিস্তানের আগে নয়াদিল্লি নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানায়। ঢাকাকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রভাব-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বলে বিশ্লেষকদের মত। তারেক রহমান ও তার দলকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, এ বিজয় ‘বাংলাদেশের মানুষের আস্থা’ প্রতিফলিত করে। তিনি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’-এর প্রতি ভারতের সমর্থনের আশ্বাসও দেন। বার্তাটি আনুষ্ঠানিক হলেও অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত স্পষ্ট- গত ১৮ মাসের অস্থিরতা, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার উদ্বেগ পেরিয়ে ভারত স্থিতিশীল কর্মসম্পর্ক চায়।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের দৃষ্টিতে তিনটি আন্তঃসংযুক্ত ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ:
১) পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ অক্ষের আশঙ্কা
যদি নতুন প্রশাসন দিল্লির তুলনায় ইসলামাবাদ ও বেইজিংমুখী হয়, তবে আঞ্চলিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী জোটসঙ্গী হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তবে (বিএনপি’র) স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তা আপাতত নেই।
পাকিস্তান-সংযোগের প্রসঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর (অপ্রমাণিত)। আর চীনের উপস্থিতি ইতিমধ্যে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দৃশ্যমান, যেমন মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বাণিজ্যিক প্রকল্প ভবিষ্যতে দ্বৈত ব্যবহার (সামরিক) সুবিধায় রূপ নিতে পারে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়।
২) সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
ভারত-বাংলাদেশের ৪১০০ কিলোমিটার সীমান্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের আগে অবৈধ অনুপ্রবেশ বড় ইস্যু। হাসিনা আমলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা ছিল। তবে ২০২৪ পরবর্তী সময়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে বলে তথ্য ইঙ্গিত দেয়। তারেক রহমান সরকার গঠন করলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান ও সহিংসতা দমনে কতোটা কঠোর হবেন, তা দিল্লি নিবিড়ভাবে দেখবে।
৩) সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা
শেখ হাসিনাকে অপসারণের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়েছে। বাড়ি, ব্যবসা ও মন্দির লক্ষ্য করে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিছু মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও বলেছেন, অধিকাংশ ঘটনা অসাম্প্রদায়িক কারণে ঘটেছে। ভারত অন্তত ২৩ জন হিন্দু সংখ্যালঘু নিহতের কথা বলেছে এবং দৃশ্যমান সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে। তারেক রহমান সুরক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিএনপি’র ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে সম্পর্ক দিল্লির নজরে থাকবে।