মু ক্ত গ দ্য

একজন নির্মোহ বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ

সোহরাব হাসান | মতামত
মার্চ ১৫, ২০২৫
একজন নির্মোহ বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ

অবশেষে রাশিয়ার সঙ্গে ৩০ দিনের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসানের জন্য আলোচনা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রস্তাবে রাজি হয়েছে ইউক্রেন। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র আবার দেশটিতে সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য দিতে রাজি হয়েছে। এটা হলো ২০২৫ সালের ১২ই মার্চের খবর।
কিন্তু পাঁচ মাস আগেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বদরুল আলম খান বই লিখে জানিয়েছিলেন, এই যুদ্ধে ইউক্রেন কিংবা পশ্চিমা শক্তির জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। তার ‘রুশ-ইউকেট যুদ্ধ: সত্য মিথ্যার লড়াই’ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে।


তখনো পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি স্পষ্ট ছিল না। যুদ্ধে আমেরিকার সহায়তা অব্যাহত থাকবে কিনা, ইউরোপ একযোগে ইউক্রেনের পক্ষ নেবে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন ছিল। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমালা হ্যারিসকে হারিয়ে যখন ডনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হন, তখনই পরিষ্কার হয় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ স্থায়ী হবে না। তারপরও লেখক উপসংহার টেনেছিলেন এভাবে: ‘যুদ্ধে জয় বা পরাজয়ের ফয়সালা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, মিথ্যা প্রচারে নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে যা হারিয়ে যায়, আলোচনার টেবিলে তা উদ্ধার করা যায় না। নিঃসন্দেহে ইউক্রেন এ যুদ্ধে পরাজয়বরণ করেছে। ইতিমধ্যে তার ভূখণ্ডের ২০ শতাংশ হারিয়ে সে আজ সংকটে পতিত। তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনিমেয়, আন্তর্জাতিক সমর্থনও হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে তার জয়ের আশা নিঃশেষ প্রায়। যুদ্ধ বন্ধের সংলাপ শুরুর এখনই সময়।’ তার এই কথাগুলো অকাট্য সত্যে পরিণত হয়।


রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশ্ন হলো যুদ্ধটা কি এড়ানো যেত না? অবশ্যই এড়ানো যেত, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব না দেখাতো। যুদ্ধটা আসলে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একে অপরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করলে তার ধাক্কা এসে পড়ে গোটা বিশ্বে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বদরুল আলম খানের মতে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফল। এই ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের ঝুঁকি বেশি। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছিল ন্যাটোর সমপ্রসারণ নীতির কারণে। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে পদানত করা। এককালীন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র সেই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করে। দুয়ারে তৈরি জোট হিসেবে ন্যাটোর উপস্থিতি রাশিয়ার প্রতি হুমকিস্বরূপ। ভূকৌশলগত দ্বন্দ্ব থেকে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রপাত হয়েছিল, তারই পরিণতি রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ।
‘রুশ-ইউকেট যুদ্ধ: সত্য মিথ্যার লড়াই’ মোট আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে আছে বিভক্ত ইউক্রেন, যুদ্ধের পটভূমি, স্বাধীন ইউক্রেন, দুই জাতীয়তাবাদের সংঘাত, ফ্যাসিবাদী ক্যু ও মার্কিন ষড়যন্ত্র, মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ ও উপসংহার।


বদরুল আলম খানের মতে, যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল, যদি উভয় দেশের অভিযোগগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হতো। উদারনীতির প্রবক্তারা মনে করেন, কোনো দেশের অভিযোগ না শুনে তাকে উপেক্ষা করা হলে প্রতিপক্ষ বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে এবং সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়।
ইউক্রেনের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িত। তিনি গেল শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি মস্কোর  গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে একবার ইউক্রেন ভ্রমণ করেছিলেন। ইউক্রেন ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি প্রজাতন্ত্রের একটি। বদরুল আলম খানের মতে, ইউক্রেন, রাশিয়া, বেলারুশ আজ পৃথক রাষ্ট্র হলেও, একদা এদের সম্পর্ক ছিল ভাই-ভাইয়েরা। তার এই বিশ্লেষণ ভারতীয় উপমহাদেশের জন্যও প্রযোজ্য।


১৯৯১ সালে সোভিয়েতের ভাঙন পর্যন্ত বিশ্ব ছিল এককেন্দ্রিক। একটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন নেতৃত্বাধীন, অপরটি যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন। সোভিয়েত ভাঙনের পর ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য জারি হয়, যা মস্কোকে বিচলিত করে। রাশিয়ার প্রত্যাশা ছিল, ইউক্রেন কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বজায় রাখবে। তারা চেয়েছিল, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের রুশভাষী মানুষের অধিকার নিশ্চিত হোক। ইউক্রেন ফেডারেল ব্যবস্থায় প্রতিটি অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করুক।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে নিজের প্রভাব বলয় তৈরি করতে সিভিল সোসাইটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে কাজে লাগায়। ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএইডের মাধ্যমে ২০০৪ সাল থেকে দুটি বড় মাপের প্রকল্পে সহায়তা দেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার কৌশল নির্ধারণ করা। ২০০৯ সালের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি বেসরকারি সংস্থা গড়ে ওঠে। ২০০৪ সাল থেকে যেসব আমেরিকান সংস্থা বা এনজিও ইউক্রেনে কাজ করেছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার প্রভাব কমানো ও ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়ানো। মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যে ছিল আইআরআই, এনডিআই, সলিডারিটি সেন্টার, ইউরোপীয় ফাউন্ডেশন ও ইন্টারনিউজ।


ইউক্রেনের এই ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র উন্নয়নের আর্থিক সহায়তার যথেষ্ট মিল আছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ইউএসএইডের সব অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছেন। তার অভিযোগ, বাংলাদেশের একটি নামসর্বস্ব এনজিওকে ২৯ মিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে।
ইউক্রেন সংকটের মূলে আছে দুই জাতীয়তাবাদের সংঘাত-ইউরোপীয় ও রুশ। পশ্চিমাংশে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ সক্রিয় হয়ে ওঠে একুশ শতকের শুরুতে। তারা রুশদের শত্রু মনে করে। জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয় শত্রুতত্ত্বের ওপর। ইউক্রেন জাতীয়তাবাদের সমর্থকেরা স্লোগান তোলেন, ‘ইউক্রেন রাশিয়া নয়, ইউরোপ’। তাদের দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুর্নীতির জন্যও রাশিয়াকে দায়ী করা হয়।


বদরুল আলম খানের বই থেকে আমরা আরও জানতে পারি, ২০০৪ সালের ইউক্রেনের রাজনীতি পূর্বের স্থিতিশীল ও আপেক্ষিক শক্তি রূপ পরিবর্তন করে সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। অরেঞ্জ বিপ্লবের পর ইউক্রেন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করার দিকে মনোযোগ দেয়। ২০০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্টনারশিপ একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করা।
২০০৮ সালে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে ন্যাটোর ২২তম সম্মেলনে ক্রোয়েশিয়া, জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেয়া নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু জার্মানি ও ফ্রান্সের বিরোধিতার কারণে সিদ্ধান্ত হয়নি।


২০২১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে তুরস্ক ও ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধের একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। তাদের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি সমঝোতা স্বাক্ষরের দিকে এগিয়ে যায়। তুরস্কের মতে, মার্কিন আধিপত্য শেষ হতে হবে এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। কিন্তু পশ্চিমা শক্তির বিরোধিতার কারণে সেই চুক্তি সই হয়নি। এ জন্যও পশ্চিমের কট্টর অবস্থান দায়ী। তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কিয়েভে এসে ঘোষণা করেন, ‘পুতিন যুদ্ধাপরাধী ও দুর্বল। তাকে ধ্বংস করা আমাদের দায়িত্ব।’ তার এই বক্তব্য রাশিয়াকে আরও ক্ষুব্ধ করে। আমেরিকা ইউক্রেনকে আশ্বাস দিচ্ছিল যে, এই যুদ্ধে তাদের জয় হবেই। শেষ পর্যন্ত জয় ছাড়াই কিয়েভকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে হয়।
তাত্ত্বিকভাবে আমরা বলতে পারি- বাস্তবতা হলো, যুদ্ধে কেউ জেতে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও কেউ জিতবে না। কিন্তু দেশ দুটির যে আর্থিক ও সামরিক ক্ষতি হলো তা সহজে পুষিয়ে নেয়া যাবে না।  


ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো চাইছে ইউক্রেনের জন্য একটি সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি। এই উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় নেতারা লন্ডনে বৈঠক করে জানিয়ে দেন, তারা ইউক্রেনের পাশে থাকবেন। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়েই কাজটি করতে চান। ইউক্রেনের পিছু হটার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া কী করবে? তারা কি এখনই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না প্রলম্বিত করে ইউক্রেনকে আরও শাস্তি দেবে?
মস্কোকে বুঝতে হবে, যুদ্ধের ফল যা-ই হোক না কেন, ইউক্রেনকে পশ্চিমা বলয় থেকে বের করে আনা যাবে না। যেহেতু ইউক্রেন এখন ন্যাটোতে যোগ দিচ্ছে না, নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়ার বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।


বদরুল আলম খান গভীরভাবে ইউক্রেন সংকট অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি পশ্চিমা শক্তি, তথা যুক্তরাষ্ট্রের স্বরূপ উন্মোচনের পাশাপাশি রাশিয়ার নীতিকেও সমর্থন করেননি। তিনি লিখেছেন, ‘যুদ্ধে নিঃসন্দেহে আমেরিকান উস্কানি ছিল। যদি বলা হয়, সেই উস্কানিতে সহজেই পা দিয়েছে পুতিনের রাশিয়া। এতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুতিনের গোঁয়ার্তুমি বজায় থাকলেও রাশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’


বদরুল আলম খান কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নন, একজন সমাজতাত্ত্বিকও। বাংলাদেশের রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। তিনি বর্তমানে ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তার এই বইয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভেতর-বাহির উঠে এসেছে। বাংলা ভাষায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর সম্ভবত এটা প্রথম বই। বাংলাভাষী পাঠকেরা সাধারণত পশ্চিমা দৃষ্টিতে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধকে দেখে থাকেন। বদরুল আলম খানের বইয়ে তারা নতুন লেন্সে দেখার সুযোগ পাবেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তো বটেই, সাধারণ পাঠকও বইটি পড়তে আগ্রহী হবেন।


‘রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ: সত্য মিথ্যার লড়াই’
বদরুল আলম খান
বাতিঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবন, বাংলামোটর, ঢাকা
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা

মতামত'র অন্যান্য খবর