‘আমি ফিরে যাবো। মুজিবের পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে কখনো থাকতে পারে না। আপনি যে সাহায্য করেছেন, তা কোনোদিন ভুলবো না। কিন্তু আওয়ামী লীগ করতে গেলে, বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই লড়াইটা করতে হবে।’ মুজিব কন্যা হাসিনার কথা শুনে ইন্দিরা গান্ধী অবাক হয়েছিলেন আততায়ীদের হাতে নৃশংসভাবে গোটা পরিবার হারানো এক তরুণীর এহেন ‘জেদ’ দেখে। ভারতবর্ষের আইরন লেডি খ্যাত ইন্দিরা মুজিব কন্যার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, নিশ্চিন্তে থাকো, ভারতবর্ষ তোমার পাশে আছে। এতদিন পরে ফিরে তাকালেও কি মনে হয়, পরিস্থিতি ওই একই জায়গায় আছে? নাকি বদলেছে?
আশির দশকের কথা। তখন জিয়াউর রহমানের শাসন চলছিল। এক সকালে দেশে ফেরার অনুমতি পান হাসিনা। দলের নেতৃত্ব নেন। ৩২ নম্বরের খসে যাওয়া পলেস্তারা আর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে শোককে শক্তিতে পরিণত করেন। কালে কালে প্রেক্ষাপট অনেক বদলেছে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা অভিধা পাওয়া এই হাসিনাকেই একের পর এক ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের তকমা মাথায় নিয়ে পালাতে হয়েছে চব্বিশে। ঠাঁই হয়েছে দিল্লির কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। ইতিমধ্যে জল গড়িয়েছে অনেকদূর। ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের মিত্র কংগ্রেসও ক্ষমতায় নেই লম্বা সময়। কিন্তু ভারতে রাজনীতির বিউটি বা ইউনিটি লক্ষ্য করা যায়, হাসিনা ইস্যুতে। সেখানকার একটি রাজনৈতিক দল বা একজন নেতাও আজ পর্যন্ত হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখ খুলেননি। যেমনটা আমরা দেখেছি ৫ই আগস্টের ঘটনায়।
ঢাকা যখন উত্তাল। শেখ হাসিনা তখন গণভবনে পায়চারি করছেন। পরামর্শ করছেন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে। লাখো ছাত্র-জনতা তখন গণভবন অভিমুখে। উদ্বেগের পারদ তখন তুঙ্গে। করণীয় কি? দেশ ত্যাগ ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। উপস্থিত সকল নিরাপত্তা কর্তারা এটাই বলছিলেন। তখন পরামর্শ নেয়া হয়েছিল মার্কিন মুল্লুকে থাকা পুত্র জয়ের সঙ্গেও। জয় তখন সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে বলেছিলেন, মা আর বিলম্ব নয়। বোন রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক কপ্টারে দেশ ছাড়েন হাসিনা। তখন কী ঘটছিল দিল্লিতে? সকল রাজনৈতিক নেতৃত্ব জরুরি বৈঠকে করণীয় ঠিক করেন। সকলেই একাট্টা হয়ে আশ্রয় দেন হাসিনাকে। এরপর কী? হাসিনা কি ফিরতে পারবেন দেশে? আওয়ামী লীগ কি রাজনীতিতে ফিরবে?
গেল ১৭ই নভেম্বর, ২০২৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। রাজনীতির অভিধানে দিনটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই তারিখের আগ পর্যন্ত হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু এ দিনটিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে জুলাই গণহত্যার দায়ে। দিল্লি এতদিন পর্যন্ত একজন পলাতক হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, অন্যরকম এক কূটনৈতিক টানাপড়েনের মুখোমুখি হয়েছে। দণ্ডিত হওয়ার ফলে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যে ধরনের টাগ অব ওয়ার চলছিল তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কূটনীতির খতিয়ান বলে, চব্বিশের ডিসেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনাকে ফেরাতে চিঠি দেয় ভারতকে।
দু’দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে হওয়া প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী এই চিঠি চালাচালি চলছে। ১৭ তারিখ রায় ঘোষণার সময়টিতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের দিল্লিতে অবস্থান নিয়ে চলছে ভিন্নতর আলোচনা। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে হাসিনার প্রত্যাবর্তন ইস্যু নিয়ে কি কথা হয়েছে? বলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা হয়েছে। সবিস্তার না প্রকাশ পেলেও আঁচ করা যেতে পারে কি সেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দেশ স্বাধীনের পর দু’দেশের সম্পর্ক এতটা তলানিতে ঠেকেনি কখনো? এই যখন অবস্থা তখন হাসিনার রায়ের পরে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দৃশ্যত নতুন এক কূটনৈতিক যুদ্ধে শামিল ঢাকা। একাধিক বিদেশি মিডিয়া এই আশঙ্কার কথাই লিখেছে।
বিবিসি লিখেছে, দু’ দেশের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক সংকট চলছে। হাসিনাকে ফেরত চাইছে ঢাকা। দিল্লি তাতে রাজি নয়। ফলে হাসিনাকে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাস্তবায়ন করা কার্যত অসম্ভব। ভারত যেটিকে মানবিক আশ্রয় ভেবেছিল সেটি এখন কঠিন পরীক্ষায় পরিণত। পুরনো মিত্রের জন্য ভারত কতোদূর যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন? চলমান সংকট নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পর্যবেক্ষক মাইকেল কুগেলম্যান ভারতের সামনে চারটি বিকল্পের কথা বলেছেন। তারা হাসিনাকে ফেরত দিতে পারে অথবা বর্তমান অবস্থাতেই থাকা। সামনে নির্বাচিত সরকার এলে ঝুঁকি তৈরি করবে। তৃতীয় বিকল্প, হাসিনাকে চুপ থাকতে বলা। সবশেষ, হাসিনাকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো। তবে এক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে।
শেখ হাসিনার দণ্ডাদেশ নিয়েও রয়েছে একাধিক মত। রায়ের তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। নির্বাচনের আগে রায় দেয়ার পেছনে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে বলাবলি আছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এ রায়কে ‘ভুক্তভোগীদের জন্য একটি মুহূর্ত’ বললেও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছে। অ্যামনেস্টি বলেছে, মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি চূড়ান্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অপমানজনক শাস্তি। টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়েছে। চব্বিশের আগস্ট থেকে তিনি ভারতে নির্বাসনে আছেন। শেখ হাসিনার কখনোই শক্তিশালী আইনি প্রতিনিধিদল ছিল না। এবং ট্রাইব্যুনালের রায় ছিল প্রায় অনুমেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশে হাসিনার কঠোর শাসনের ক্রমাগত ক্ষোভ ও বেদনা রয়েছে। তবে সব আইনগত প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হতে হবে। আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় এই রায় নিয়ে আলোচনা যাই হোক লক্ষণীয় ছিল ভারতের প্রতিক্রিয়া। সংযত প্রতিক্রিয়া দেয়ায় কূটনৈতিক মহলে এ নিয়ে কৌতূহল বাড়িয়েছে বহুগুণ। ভারত রায় অবগত বা নোট করেছে। এর মধ্যদিয়ে সরাসরি সমর্থন বা বিরোধিতা কোনোটিই না করে একটি সতর্ক ‘কৌশলগত দূরত্বের’ নীতি অবলম্বন করেছে।
রায়ের পর থেমে নেই আওয়ামী লীগ। ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ হাসিনা সামাজিক মাধ্যমে রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এ রায় পূর্ব নির্ধারিত। দলের পক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়ালি ঘোষণা করা লকডাউন, টোটাল শাটডাউনের মতো কর্মসূচি। বিচ্ছিন্নভাবে চলছে বাসে আগুন দেয়া, ককটেলবাজির ঘটনা। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় সামনের দিনগুলোতেও এ ধরনের ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনো পর্যন্ত আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে কিনা তেমন কোনো ইঙ্গিত নেই। প্রফেসর ড. ইউনূস সবশেষ যুক্তরাজ্যের উন্নয়নমন্ত্রীকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এত গেল সরকারের অবস্থান। ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ তাদের ছাড়া নির্বাচন আয়োজনের পরিণতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। নির্বাসিত অনেকের এমন বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে?
কথায় আছে, ‘অতিথি দেবো ভবো’। ভারতীয়রা অতিথিপরায়ণ। অতিথির অমঙ্গল হবে এমন কিছু ভারতীয়রা করে না। ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথায় কোনো কোনো ইস্যুতে ভিন্ন সুর থাকলেও অতিথিকে আশ্রয় দেয়া নিয়ে সকলের এক সুর। নিকট অতীতে তিব্বতের নির্বাসিত নেতা দালাইলামাকে ভারত পরাক্রমশালী চীনের চাপেও আশ্রয় দিয়েছে, নিরাপত্তাও দিয়েছে। দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকেও একইভাবে ভারত আশ্রয় দেবে তা নিয়ে এখনো কোনো দ্বিধা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কথা হচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে হাসিনার অবস্থান কোথায়?
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জনতার আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে হাসিনার মতো পালিয়ে যেতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে, ইরানের শাহেনশাহ রেজা শাহ পাহলভি, জার্মানির এরিক হোনেকার, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্দ মার্কোস ও আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে। তাদের মধ্যে স্বল্প সময় নির্বাসনে থাকার পর রাজাপাকসে ফিরতে পারলেও শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে আর অনিবার্য হয়ে ওঠেননি। অন্যদিকে ফিলিপাইনে মার্কোস পরিবার ফিরেছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের হাত ধরে।
৫ই আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনীতিতে থাকবে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছেই। জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত হওয়ায় দলটির প্রধান শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে? সবমিলিয়ে এটা বলা যায়, দিল্লির নীরবতা বা সংযত প্রতিক্রিয়া সামনের দিনগুলোতে সমঝে চলার নীতি অটল থাকার বার্তা দেয়। যদি নির্বাচন হয় তাহলে নয়া সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক কেমন তার ওপর নির্ভর করছে হাসিনার ফেরা না ফেরা। রাজনীতিতে শেষ বলে কথা নেই। নির্বাচন নিয়ে নানান আশঙ্কার কথাও চাউর আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুখকর নয়। সুখবর নেই কোনো সেক্টরেই। অর্থনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর। আওয়ামী লীগকে মূল ধারার রাজনীতির বাইরে রেখে স্থিতিশীলতা কতোটা সম্ভব? রিকনসিলিয়েশন করে বিকল্প কিছু ভাবার সুযোগ আছে কিনা? পরিস্থিতি কোথায় গড়ায় সময়ই হয়তো তা বলে দেবে।