আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প ক্রমেই এক বিরূপ বিশ্বের মুখোমুখি

মোহাম্মদ আবুল হোসেন | আন্তর্জাতিক
এপ্রিল ১৮, ২০২৬
ট্রাম্প ক্রমেই এক বিরূপ বিশ্বের মুখোমুখি


প্রিয় পাঠক, একবার সুস্থ মাথায় ভাবুন তো! ভাবুন তো, ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগের বিশ্ব পরিস্থিতি এবং তিনি ক্ষমতায় আসার পরের পরিস্থিতি। যদি আপনার মেমোরি শার্প হয় তাহলে দেখবেন- বিশ্ব এখন যে এক অস্থির সময় পার করছে, বাংলাদেশ সহ দেশে দেশে জ্বালানি নিয়ে যে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন, তেলের দাম আকাশচুম্বী এমন পরিস্থিতি তিনি ক্ষমতায় আসার আগে ছিল না। তিনি ক্ষমতায় এসেই গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে নেয়ার হুমকি দিলেন। তার এই হুমকির কারণে ইউরোপ তার প্রতি মুখ গোমড়া করে বসে আছে। সেটা বোঝা গেছে এবার ইরান যুদ্ধে। কারণ, তার মিত্র ইউরোপ ইরান যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্ষেত্রে মাথা উঁচু করে কথা বলেছেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে গাজা’কে দখল করে নিয়ে সেখানে রিভেরা বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত তার সমর্থন পেয়ে গাজায় নিজেদের অধিকারের দাবিতে অটল থাকা বেসামরিক সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চালানোর সাহস দেখিয়েছে ইসরাইল। আর মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প নিজে। ফলে তাদের বিবেক জাগ্রত হয়নি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও ফার্স্টলেডিকে সামরিক হামলা চালিয়ে ‘অপহরণ’ করেছেন ট্রাম্প। এরপর সেখানকার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশটিতে ক্ষমতায় বসিয়েছেন তার হাতের পুতুলকে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করেন। সেই টাকা জমা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে কিছু ভেনেজুয়েলার বর্তমান প্রশাসনকে দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে রেখেছেন। এরপর কিউবাকে ধরার হুমকি দিয়েছেন। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দিয়েছেন। আর সর্বশেষ ইরানে কি হচ্ছে, তা সবার জানা। ক্ষমতাধর হলেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যা খুশি তা-ই করা যায়! তিনি যেটা বলছেন, সেটাই হতে হবে! ভিন্নমতের কোনো মূল্য নেই! ইরান যদি মার্কিন স্বার্থের হুমকি হয়, তাহলে ইসরাইল কি? সে কি মুসলিম বিশ্বের জন্য হুমকি নয়? সেখানকার শাসকরা দিনের পর দিন আল কুদ্‌স, বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে আছে, সেখানে নামাজ আদায় করতে গেলে মুসলিমদেরকে ইসরাইলের অনুমতি নিতে হয়। এটা কি হুমকি নয়? এসব ইস্যুকে সামনে রেখে পলিটিকোতে সাংবাদিক নাহাল তুসি চমৎকার একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, মাসের পর মাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পর্যন্ত নানা বিষয়ে ওইসব দেশকে দমন করে আসছেন। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই বিশ্বরাজনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। এর ফলে প্রমাণ হয়েছে যে, তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি যা খুশি তা করতে সারাবিশ্ব হ্যাঁ বলবে না। ইরানের ইসলামপন্থি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে প্রথম দফার শান্তি আলোচনা ত্যাগ করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসার প্রস্তুতি চলছে। হাঙ্গেরির ভোটাররা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্র দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। আরও আছেন পোপ লিও। তিনি ট্রাম্পের কটূক্তির জবাবে বলেছেন, তিনি ‘কোনো ভয় পান না’। ট্রাম্প ও তার সহকারীরা প্রায়ই এমনভাবে আচরণ করেন, যেন পৃথিবীর অন্য মানুষরা ভিডিও গেমের ‘নন-প্লেয়ার ক্যারেক্টার’। তাদেরকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তারা বিশ্বাস করেন, খুব কম ব্যতিক্রম ছাড়া, আমেরিকা হুমকি, অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক পদক্ষেপ ব্যবহার করে অন্য দেশগুলোকে নিজের ইচ্ছার কাছে নত করতে পারে। ওদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি একটি এআই ছবি নিজেই  পোস্ট করে খ্রিষ্টানদের ক্ষোভকে জাগিয়ে তুলেছেন। ওই ছবিতে দেখা যায় তিনি একজন অসুস্থ ব্যক্তির কপাল স্পর্শ করছেন। তার হাত থেকে আশীর্বাদের দ্যূতি ছড়িয়ে পড়ছে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথায়। ট্রাম্পের অন্য হাতে আলোকবর্তিকা। ছবিটি যিশু খ্রিষ্টের কথাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এ জন্য খ্রিষ্টানরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষেপেছেন। তারা বলছেন, ট্রাম্প নিজেকে যিশুর স্থানে বসিয়ে দিয়েছেন। আসলে ট্রাম্পকে নিয়ে লিখতে গেলে, সীমিত পরিসরে শেষ করা কঠিন। আমরা ফিরে যাই আলোচনায়। 
 

পররাষ্ট্রনীতির কিছু মৌলিক নিয়ম আছে। পদার্থবিজ্ঞানের মতোই একটি নিয়ম হলো- প্রতিটি ক্রিয়ার একটি প্রতিক্রিয়া থাকে। রাজনীতিতে সেই প্রতিক্রিয়া সমান বা বিপরীত নাও হতে পারে। কিন্তু তা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলবে, এমনও নয়। নাহাল তুসি লিখেছেন, ক্রমশ আরও বেশি আন্তর্জাতিক শক্তি আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রস্তুত। এ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন এই বাস্তবতার সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারছে না। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক প্রেসিডেন্ট লেন রিচার্ড হ্যাস বলেন, যদি তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বুঝতে পারতো যে ভয় দেখানো আর কার্যকর কৌশল নয়, তাহলে তারা এই পথ থেকে সরে আসতো। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তিনি ওই প্রতিবেদনে আরও লিখেছেন, বিদেশি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এখন আগের চেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ট্রাম্পের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কারণ তার সহকারীরা তাকে কঠিন সত্য বলতে সাহস পান না। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্লেষণ এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার চারপাশে শুধু ‘হ্যাঁ’ বলা লোকজন। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার শান্তি আলোচনা করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এরপর তার কথায় ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভ্যান্স বলেন, ইরান ‘আমাদের শর্ত মেনে নেয়নি।’
এই ধরনের বক্তব্য তিনি একাধিকবার দিয়েছেন। এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ওই বৈঠকে আলোচনা নয়, বরং নির্দেশ দিচ্ছিল। তবে জেডি ভ্যান্স দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্র ‘খুবই নমনীয়’ ছিল আলোচনায়। এই বক্তব্য ইরানের সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আর অন্য অনেক দেশের কাছে এটি উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হারানোর মতো মনে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করলে আপনি যদি কারও কাছ থেকে কিছু চান, তাহলে আপনাকেও কিছু ছাড় দিতে হবে। শুধু এইভাবে বলা যায় না- ‘আমরা তোমাদের মারতেই থাকবো।’
 

স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যে, তাদের কঠোর নীতি উল্টো ফল দিচ্ছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, দশকের পর দশক ধরে আগের প্রশাসনগুলোর সময়ে আমেরিকান জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বৈষম্যমূলক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা, নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে আমেরিকাবিরোধী পক্ষপাত এমন সব তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু সেই প্রশাসনগুলো সে সময় নিষ্ক্রিয় ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন- এবার আর (নিষ্ক্রিয় থাকা) নয়। নাহাল তিসি লিখেছেন, এখন পর্যন্ত খুব কম প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ট্রাম্প বা তার সহযোগীরা তাদের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া বোঝেন বা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। অথবা হয়তো তারা তা নিয়ে চিন্তিতই নন। 
 

হ্যাঁ, ট্রাম্প মাঝে মাঝে কিছু বিষয়ে পিছু হটেন (যাকে ‘টাকো’ প্রবণতা বলা হয়)। কিন্তু পরে আবার একই বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেন। উদাহরণ হিসেবে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড নেয়ার জন্য তার জোরাজুরির কথা বলা যায়। এটি ইউরোপের জন্য একটি লাল রেখা ছিল। প্রথম বছরে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখলেও, জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চাপ বাড়ানোর পর তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন- এটি সম্ভব নয়। এরপর ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপটিতে আরও সামরিক প্রবেশাধিকার দেয়ার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি থেকে পিছু হটলেও ক্ষতিটা তার হয়ে গেছে। তার এই গ্রিনল্যান্ড কৌশল এবং ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারা শিখে গেছে- দেশগুলো যত কম নির্ভরশীল হবে, ততই তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহসী হবে। কিন্তু এই ঝুঁকি বিবেচনা না করে ট্রাম্প আবারো গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ তুলেছেন। ৮ই এপ্রিল ইউরোপ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানানোয় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ডকে মনে রাখুন- এক বিশাল, খারাপভাবে পরিচালিত বরফের টুকরো!!!’ কখনো কখনো বোঝাই যায় না, তার এই পদক্ষেপগুলোর দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব সম্পর্কে ট্রাম্প কতোটা সচেতন। তার শুল্কনীতি অন্য দেশগুলোকে নতুন বাণিজ্য অংশীদার খুঁজতে বাধ্য করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা কমছে। যেমন সামরিক নির্ভরতা কমলে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কথা কম শুনবে, তেমনি অর্থনৈতিক নির্ভরতাও কমলে ভবিষ্যতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বাইরে চলে যেতে পারে। অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন- ট্রাম্প ও তার দল বিশ্ব রাজনীতিকে এমনভাবে দেখেন, যেন এটি নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মতো একটি দরকষাকষি।
 

কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বা গাজায় ফিলিস্তিনিদের দাবি শুধুই জমির বিষয় নয়। এতে জড়িয়ে আছে পরিচয়, রাজনীতি এবং টিকে থাকার সংগ্রাম। একজন সাবেক লাতিন আমেরিকান কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ও তার দল প্রায়ই বুঝতে ব্যর্থ হন যে, মানুষ শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাবের জন্য নয়, জীবনের অর্থবোধের জন্যও লড়াই করে। তবে এমন কিছু সময়ও আসে, যখন ট্রাম্প তার কঠোর নীতির নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পারেন। যখন চীন বাণিজ্যে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়- বড় ধরনের পাল্টা শুল্ক আরোপ করে এবং বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করে, তখন তিনি মূলত একটি সমঝোতায় পৌঁছান। তবে ট্রাম্প সবসময় বেইজিং বা মস্কোর মতো শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতি বেশি মনোযোগ দেন। এক্ষেত্রে সেই তুলনায় দুর্বল মনে করা দেশগুলোর চেয়ে বেশিই মনোযোগ দেন তিনি। বিশেষ করে যখন চীনের প্রতিক্রিয়া শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলে, তখন তা উপেক্ষা করা কঠিন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বৃটেন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাধা কমিয়েছে এবং শুল্ক দিচ্ছে- যা প্রমাণ করে ট্রাম্প সফলভাবে আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন। রিচার্ড হ্যাস বলেন, ট্রাম্প হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক ‘পোস্ট-আমেরিকান বিশ্বে’র দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে না। আর হ্যাঁ, বেইজিং তো সেটাই চায়। এটি এমন এক বিশ্ব হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিত অন্যদের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। আগের মতো বন্ধুদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পাওয়া যাবে না। বাইডেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ড্যান শাপিরো বলেন- দেখুন, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী এবং আমাদের অনেক প্রভাব আছে। কিন্তু তা অসীম নয়। সেরাদেরও মিত্র, বন্ধু ও অংশীদার প্রয়োজন। এর ফলেই ট্রাম্প যখন বন্ধু ও শত্রু-উভয়ের ওপর আক্রমণ করছেন, তখন আমেরিকানরা চীন সম্পর্কে তাদের মত বদলাচ্ছে। সিএনএনে এ নিয়ে সাংবাদিক জেসি ইয়ুং লিখেছেন- ট্রাম্প প্রশাসন যখন একদিকে প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করছে এবং অন্যদিকে মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন সম্পর্কে আমেরিকানদের মনোভাব ইতিবাচক দিকে বদলাচ্ছে। একটি নতুন জরিপে এমনটাই উঠে এসেছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এটি একেবারেই ভিন্ন চিত্র। কোভিড মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রে চীনবিদ্বেষ এবং এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বেড়ে গিয়েছিল। ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ২০২৩ সালে মাত্র ১৪ শতাংশ আমেরিকানের কাছে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ছিল, পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত তথ্যে এমনটাই দেখা যায়। এখন সেই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এটা আমেরিকান জনগণের মধ্যে ব্যাপক মানসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ করে ডেমোক্রেট ও তরুণদের মধ্যে। পশ্চিমা সামাজিক মাধ্যমে চীনা সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি বাড়তি আগ্রহও এর প্রতিফলন, যার উদাহরণ সাম্প্রতিক ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা। পিউ জরিপের ফলাফলে রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বিভাজনও দেখা গেছে। দুই দলের মধ্যেই চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব বাড়লেও, এই পরিবর্তন ডেমোক্রেট ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট। একইভাবে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ডেমোক্রেটদের তুলনায় বেশি মানুষ মনে করেন ট্রাম্প চীন বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। 

 

তবে রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই আস্থা কমেছে। প্রজন্মগত ব্যবধানও বড় একটি বিষয়। ৫০ বছরের বেশি বয়সীরা চীনকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি। আর তরুণদের মধ্যে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা অনেক বেশি। তরুণদের মধ্যে ট্রাম্পের ওপর আস্থাও তুলনামূলক কম। এই পরিবর্তন অনলাইনেও স্পষ্ট। বছরের শুরুতে ‘চায়নাম্যাক্সিং’ ট্রেন্ড দেখা যায়, যেখানে কনটেন্ট নির্মাতারা চীনা অভ্যাস- যেমন গরম পানি পান, ফলের চা তৈরি, ঐতিহ্যবাহী ব্যায়াম অনুসরণ করে ‘চীনা হয়ে ওঠার’ চেষ্টা করেন। অন্যদিকে বিশ্বকে পোপ লিও দেখিয়েছেন কীভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয়। ডনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের সমালোচনা করার জন্য তাকে হেয় করেছেন ট্রাম্প। তার জবাবে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ভয় পান না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন কথা বলার সাহস কম কথা নয়। আল জাজিরার সাংবাদিক অ্যানড্রু মিত্রোভিচা বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পের কূটনীতির ধারণা হলো বিশ্ব জুড়ে ঘুরে বেড়িয়ে শিশুসুলভ, অশ্লীল হুমকি ছোড়া, যাতে অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীদের ভয় দেখিয়ে বা চাপে ফেলে নতিস্বীকার করানো যায়। বছরের পর বছর, ট্রাম্পের এই কৌশল কাজ করেছে। অনেক সময়, বহু প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তাকে চ্যালেঞ্জ করার বদলে শান্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের সংকীর্ণ যুক্তি ছিল, ট্রাম্পের অহংকে তুষ্ট করলে তার ছোট মানসিকতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রবৃত্তি কমে যাবে। কিন্তু এর ফলে বরং আরও উৎসাহিত হয়েছে এমন এক প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিটি বুলির মতোই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের আত্মকেন্দ্রিক আধিপত্যের ক্ষুধা মেটাতে আনন্দ পান। স্পষ্টতই, লিও এই তুষ্টির নীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পশ্চিমা ‘উদার’ গণতন্ত্রের অনেক ‘নেতা’ যেখানে ট্রাম্পের প্রকাশ্য গণহত্যামূলক মনোভাবের নিন্দা করতে দ্বিধা করেছেন, সেখানে পোপ লিও কোনো দ্বিধা ছাড়াই স্পষ্টভাবে তার আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি ইতালীয় ভাষায় ট্রাম্পকে বলে দিয়েছেন- ‘আমরা সবাই জানি, পুরো ইরানি জনগণের বিরুদ্ধেও একটি হুমকি ছিল, যা সত্যিই অগ্রহণযোগ্য। আমি সবাইকে আহ্বান জানাই, তারা যেন নিজের হৃদয়ের গভীরে গিয়ে ভাবেন নিরীহ মানুষদের কথা, যারা এই যুদ্ধের উত্তেজনার শিকার।’ স্বাভাবিকভাবেই, লিওর এই সতর্কবার্তা ও আবেদন ট্রাম্প ও তার ইভানজেলিক সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ ‘নিরীহ মানুষের দুর্ভোগ’ নিয়ে চিন্তা করা তাদের কাছে একেবারেই অচেনা ধারণা। ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা ইরানের ওপর এই অপ্ররোচিত হামলাকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরেন, যা নাকি ঈশ্বর অনুমোদিত। তা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। লিও এই স্পষ্টভাবে সরাসরি এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন।
 

রোববারের প্রার্থনায় দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যুদ্ধে সমর্থনকারীদের ‘হাত রক্তে ভরা’। ভাই ও বোনেরা, এটাই আমাদের ঈশ্বর: যিশু, শান্তির রাজা, যিনি যুদ্ধকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে কেউ যুদ্ধের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে না।’ লিও কারও নাম নেননি। তবে তার এই তীব্র বক্তব্য নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং যুদ্ধ-সমর্থক কিছু ‘খ্রিষ্টান’ প্রচারকের দিকে ইঙ্গিত করছিল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও তার সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি। ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় এক প্রার্থনায় লিও ‘সর্বশক্তিমান হওয়ার বিভ্রম’ নিয়ে কথা বলেন- যা ক্রমশ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যেন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত- যারা এই বিভ্রম ও যুদ্ধপ্রবণতার একই মানসিকতা ভাগ করে নেন। 

 

আন্তর্জাতিক'র অন্যান্য খবর