সৌদি আরবকে টেক্কা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। কারণ, তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটা শুধু অর্থনৈতিক বিষয়েই নয়, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ওপেক যে তেল উৎপাদন করে তাতে সন্তুষ্ট নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি চান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কাটাতে আরও বেশি তেল উত্তোলন করা হোক। কিন্তু তেল তথা পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার প্রস্তাবে রাজি নয় ওপেক। ফলে তাদের ওপর তার অসন্তোষ আছে। কতোটুকু তেল কোনো দেশ উত্তোলন করতে পারবে, তা নির্ধারণ করে কোটা দেয়া আছে সব দেশকে। কিন্তু সেই কোটা না মেনে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী তেল উত্তোলন করে তা বিক্রি করতে চায় আমিরাত। শুধু এ কারণেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যে যুদ্ধ করছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তাদের ক্ষয়ক্ষতিও বেশি। এর জবাব দিতে তারা সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব বা অন্য দেশগুলো তাতে সায় দেয়নি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে। মার্কিন মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছে সৌদি আরব। এ ছাড়া ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সৌদি আরব সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এসব করে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমিরাতের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেনি তারা। সৌদি আরব ভেবেছে, যদি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তারা তাহলে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কাজ করবে। এতে আঞ্চলিক শত্রুতা বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি হয়ে ওঠে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাতিয়ার। তারা এটাকে ব্যবহার করে ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে পেট্রোলিয়াম রাজনীতিতে দৃশ্যত সৌদি আরব পিছিয়ে পড়েছে। এ নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- কয়েক সপ্তাহ ধরেই আমিরাতের কর্মকর্তারা আরব প্রতিবেশীদের প্রতি প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছিলেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও, অন্যান্য আরব দেশগুলো এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নেয়নি। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যখন ওপেক বৈঠক শুরু করেন, তখন শত শত মাইল দূরে বসে আমিরাত সরকার ওই চমকপ্রদ ঘোষণা দেয়। জানায়, তারা ওপেক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমিরাতের কর্মকর্তারা বলেন, তারা এককভাবে তেল উৎপাদন বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের চাহিদা পূরণ করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা যুদ্ধের সময় আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। ওপেক থেকে বেরিয়ে এসে আমিরাত দেখিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থে বড় সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত এবং ঐতিহ্যগত জোট বা নিয়মে আবদ্ধ থাকতে চায় না। ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, এটি আমিরাতের এক ধরনের স্বাধীনতার ঘোষণা। তারা আর এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি বাধ্য থাকতে চায় না, যা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আমিরাতের হাতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি সার্বভৌম সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ছোট্ট এই দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন বাজার, অর্থনীতি ও সংঘাতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিরাতের জ্বালানি মন্ত্রী সুহেইল আল মাজরুই বলেন, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদককে লক্ষ্য করে নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও আমিরাত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে যুদ্ধকালীন সংকটে একসঙ্গে আছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আমিরাত ধীরে ধীরে নিজস্ব পথে হাঁটছে। বিশিষ্ট আমিরাতি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল খালেক আবদুল্লাহ বলেন, আমরা এখন এক নতুন আমিরাতকে দেখছি। ভবিষ্যতে তারা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে এভাবেই আচরণ করবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমিরাত বার বার তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেছে। ওপেকের নির্ধারিত কোটা তাদের তেল উৎপাদনকে সীমিত করে রেখেছিল। এ বিষয়টা তারা মেনে নিতে পারছিল না। অন্য অনেক আরব দেশ যখন দূরত্ব বজায় রাখছে, তখন তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ইয়েমেনে আমিরাত এক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। সেই গোষ্ঠী সৌদি আরব সমর্থিত সরকারের বিপরীতে অবস্থান করছে। সুদানের গৃহযুদ্ধেও সৌদি আরব ও মিশর সরকারকে সমর্থন করছে। সেখানে আমিরাত একটি প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বিভাজন কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে এবং তা দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে। একসময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। ২০১৫ সালে তারা ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, যা এখন দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। আল জাজিরার এক রিপোর্ট অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেল থেকে তেল উত্তোলন বাড়িয়ে ৫০ লাখ ব্যারেল করতে চায়। এ জন্য তারা সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের জন্য বেশি কোটার দাবি জানাতে থাকে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উৎপাদন সক্ষমতা দিনে ৪৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছে। কিন্তু ওপেক চুক্তির কারণে তারা সেই পরিমাণ তেল উত্তোলন করতে পারছিল না। কারণ, ওপেক তাদেরকে দিনে মাত্র ৩২ লাখ ব্যারেল উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল। এসব নিয়ে খুব ক্ষিপ্ত ছিল আমিরাত। এখন তারা অকস্মাৎ ওপেক ছাড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না। কারণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে তেল রপ্তানি করতে পারবে না। ফলে তেল যত বেশিই উত্তোলন করুক হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। তবে তারা ফুজাইরাহ টার্মিনালের মাধ্যমে কিছু তেল বিক্রি করতে পারছে। এই টার্মিনালটি ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত। এখান থেকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ আছে। গত বছর তারা এ পথে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করেছে। কিন্তু এই পরিমাণ তাদের টার্গেটের তুলনায় অনেক কম।
যদি আবার স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে, তাহলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অতিরিক্ত ১৬ লাখ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদন বাজারে ছাড়তে পারে। এই পরিমাণ বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ১.৫ শতাংশ। এতে তারা বৈশ্বিক বাজারে বড় সুবিধা পেতে পারে। এম্বার ফিউচারের জ্বালানি কৌশলবিদ কিংসমিল বন্ড বলেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত খুবই কৌশলী। তারা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন আমরা তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার পর্যায়ে পৌঁছে গেছি এবং নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি। তারা ওপেকের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকতে চায়। ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে তেলের চাহিদা কমবে এবং ওপেকের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও দুর্বল হবে। এই বাস্তবতার জন্যই আমিরাত প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি সৌদি আরবের অবস্থানের বিপরীত। কারণ, সৌদি আরব উৎপাদন সীমিত রেখে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম বেশি রাখতে চায়।
সৌদি আরবের সাবেক জ্যেষ্ঠ তেল উপদেষ্টা মোহাম্মদ আল-সাব্বান এই সিদ্ধান্তকে ছোট করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি বড় কোনো ধাক্কা নয়, বিশেষ করে ওপেক প্লাসে ২৩টি দেশ রয়েছে। একটি দেশ চলে গেলে তেমন কিছু যায় আসে না। তার মতে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক এবং পশ্চিমাদের প্রভাব আছে এতে। ওইসব পশ্চিমারা দীর্ঘদিন ধরে ওপেকের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ওপেকের সমালোচক। তিনি আগে অভিযোগ করেন, এই কার্টেল ‘বিশ্বকে ঠকিয়ে’ তেলের দাম বাড়ায়। তবে আল-সাব্বান বলেন, এটা ভুল ধারণা। ওপেক কেবল বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎপাদন সমন্বয় করে। ওপেক অতীতেও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে আছে। ১৯৬০-এর দশকে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরান, ইরাক ও ভেনেজুয়েলা মিলে এটি প্রতিষ্ঠা করে। পরে কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর ও অ্যাঙ্গোলাও সংগঠনটি ছেড়ে গেছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গবেষক এবং দুবাইভিত্তিক কামার এনার্জির সিইও রবিন মিলস বলেন, ওপেক আগের তুলনায় কম প্রভাবশালী হবে। তবে হারিয়ে যাবে না।
১৯৭৩ সালে ওপেকের আরব সদস্যরা ইসরাইল-সমর্থক দেশগুলোর ওপর তেল অবরোধ দেয়- যা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। তখন ওপেক বৈশ্বিক বাজারের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করত, এখন তা কমে প্রায় ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ওপেক এখন রাশিয়াসহ আরও ১২টি দেশের সঙ্গে মিলে ওপেক প্লাস হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পরামর্শক আনাস আবদুন লিখেছেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে গভীর আঞ্চলিক বিভাজনের প্রতিফলন এবং উপসাগরীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরানের সবচেয়ে বেশি আঘাত সহ্য করেছে ইউএই। গোপনে তারা ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। আমিরাত ইতিমধ্যে ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রথম আরব দেশ হয়। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক গ্রেগরি গাউস তৃতীয় বলেন, এই যুদ্ধ আমিরাতের ভেতরের পার্থক্যগুলো আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সবশেষে আবদুন বলেন, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হলো আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ধারণা।