নতুন অধ্যায়

তেলাপোকারা ভারতে বিজেপি’র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা | অনুসন্ধান
জুন ১৩, ২০২৬
তেলাপোকারা ভারতে বিজেপি’র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি তেলাপোকা ঢুকে পড়েছে। আলোচনার শিরোনামে উঠে এসেছে। অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক রাজনীতির প্ল্যাটফরম হিসেবে চালু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা তেলাপোকা জনতা পার্টি জনপ্রিয়তায় বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতের শাসক বিজেপি’র অনুগামীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
 

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে একটি প্রধান যুব-চালিত রাজনৈতিক  আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সিজেপি। তবে এই নতুন পার্টিকে সমালোচকরা একটি সোশ্যাল-মিডিয়া কৌশল বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেলাপোকারা বাস্তবের ময়দানে নেমে পড়েছেন। ভারতের অনেক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও  ইতিমধ্যেই এই দলে নাম নিবন্ধন করেছেন।   সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলোতে রাজ্যভিত্তিক ইউনিটগুলো গজিয়ে উঠেছে, যারা প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।
 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের বহু বছরের হতাশার কারণেই এমনটা ঘটেছে। ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের অধিকাংশই কর্মক্ষেত্রের বাইরে। এই আবহে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য গোটা বিষয়টিকে বিস্ফোরণে পরিণত করেছে। প্রধান বিচারপতি সূযর্কান্ত তরুণদের “তেলাপোকা” এবং “পরজীবী”র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, তা অনলাইনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফলে সহজেই একটি অপমানকে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত করে।
 

ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে রয়েছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে। অভিজিৎ সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, তেলাপোকা শব্দটি এতটাই পীড়াদায়ক ছিল কারণ কথাটা এসেছে ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে, যিনি সংবিধানের রক্ষক, যে সংবিধান আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। যিনি আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্বে আছেন, তিনিই শুধু আমাদের মতামত প্রকাশের জন্য আমাদেরকে তেলাপোকা এবং পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করছেন। এটাই ছিল সবচেয়ে কষ্টদায়ক অংশ। এই মন্তব্যটি যদি শাসক দলের অন্য কেউ করতেন, যা তারা সাধারণত করে থাকেন, তাহলে এত আলোড়ন সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এটা এমন একজনের কাছ থেকে এসেছে যার আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করার কথা।
 

তার কথায়, আমি যুব সমাজের সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি পেয়েছি তা হলো, কেউ তাদের কথা শোনে না, কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলে না এবং তাদের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। তাদের এমনই মনে হয়। আর এখন তাদেরকে তেলাপোকা এবং পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তাই বর্তমান ব্যবস্থা যেভাবে তাদেরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে, তাতে তারা সত্যিই খুব হতাশ। আমরা তাই জানতে চেয়েছি, দেশের রাজনৈতিক আলোচনা কেমন হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আপনাদের হাতেই রয়েছে।
 

সিজেপি’র ওয়েবসাইটে  পাঁচ-দফা কর্মসূচি রয়েছে। কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজ্যসভার আসন বা অবসর-পরবর্তী পুরস্কার দেয়া হবে না। কোনো নির্বাচন কমিশনার বৈধ ভোট বাতিল করলে তাকে ইউএপিএ  আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হবে। নারীরা ৩৩ শতাংশ নয়, ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ পাবেন এবং সেই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সমস্ত পদের ৫০ শতাংশ পাবেন। এবং আম্বানি ও আদানিদের মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর মিডিয়া লাইসেন্স বাতিল করা হবে। দীপকে বলেছেন, আমরা এমন একটি ভারতের জন্য চেষ্টা করছি যেখানে সমস্ত প্রতিষ্ঠান স্বাধীন হবে, তা বিচার বিভাগ হোক, নির্বাচন কমিশন হোক বা গণমাধ্যম হোক। আজ ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো এই যে, এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানই শাসক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে এবং এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ।
 

শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জেনজি’র বিরক্তি বাস্তব। কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিরোধীদের প্রতি আস্থায় রূপান্তরিত হয় না। একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করে বিশিষ্ট নির্বাচনী কৌশলবিদ নরেশ অরোরা এক্স-এ লিখেছেন, “তেলাপোকা জনতা পার্টির ভাইরাল সাফল্যকে শুধুমাত্র শাসক দল বিজেপি’র বিরুদ্ধে ভিন্নমত হিসেবেই দেখা উচিত নয়, বরং এটি বিরোধীদের জন্য একটি আয়না হিসেবেও দেখা উচিত।” 
এমনকি কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরও বলেছেন, “এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু আমি আশা করি এর পেছনের তরুণরা এই শক্তিকে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে আসার একটি উপায় খুঁজে পাবে অথবা হয়তো তারা ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে এবং এর মাধ্যমে এমন এক অবস্থানে পৌঁছাবে যাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। এটি এমন একটি সুযোগ যা বিরোধী দলকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।”
তবে জেন-জি মনে করে এখান থেকেই বিরোধী দলের সংকট শুরু হয়। কংগ্রেস প্রায়শই এবং কখনো কখনো জোরালোভাবে বেকারত্ব, বৈষম্য এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলে। তবুও এটি এখনো বংশীয় রাজনীতির বোঝা বহন করে চলেছে। থারুর নিজে, কংগ্রেসের বলয়ের ভেতর থেকেই লিখেছেন যে, যখন নির্বাচিত পদকে পারিবারিক উত্তরাধিকারের মতো গণ্য করা হয়, তখন সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একাডেমিক বিশ্লেষণেও একইভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, বংশীয়তাবাদ এবং প্রজন্মগত গোষ্ঠী দ্বন্দ্বকে কংগ্রেসের পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
 

এই রকম মূল্যায়ন নিয়েই ভারতের যুবসমাজ কৌতুকের ছলে হলেও সিজেপিতে শামিল হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সিজেপি তরুণদের প্রতিনিধিত্বের একটা প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
আর তাই সিজেপি’র নেতৃত্ব দিল্লি যন্তরমন্তরে প্রথম প্রকাশ্য আন্দোলনের জন্য বেছে নিয়েছিল এমন সব ইস্যু যেগুলো যুব সমাজকে বিপর্যস্ত করেছে। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করেছে।  সিজেপি তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়   দুর্নীতি,  প্রশ্নপত্র ফাঁস, নম্বর দেয়ায় ভুল ও কারিগরি ত্রুটির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। এসব ঘটনাকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা হিসেবে দেখছেন। আর তাই তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। 
 

সিজেপি’র নেতা দীপকে বলেন, এসব ব্যর্থতা তরুণদের গভীর হতাশাকে উন্মোচিত করেছে, যা শুধু পরীক্ষার গণ্ডিতে আটকে নেই। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। তবু তরুণেরা বলছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। শ্রমবাজারের সূচক উন্নত হওয়ার দাবির মধ্যেই তরুণদের এ অসন্তোষ সামনে আসছে। সিজেপি আন্দোলন মূলত বেকারত্ব, গণতন্ত্রের পতন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বড় ধরনের অসন্তোষের প্রতিফলন।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র মনে করেন সিজেপি আর নিছক একটি সমাজমাধ্যম নির্ভর স্যাটায়ার প্রকল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত রাজনীতির একটি কেস স্টাডি। তার মতে, মধ্যবিত্তের 

নির্দিষ্ট উদ্বেগকে রাজনীতির ভাষা দেয়ার পথ হয়ে উঠতে পারে সিজেপি’র আন্দোলন। যেমন ছিল আম আদমি পার্টির ক্ষেত্রে। 
 

মোদির জন্য সিজেপি’র এই উত্থান বেশ অস্বস্তিকর। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা তার দল বিজেপি এখনো ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তবে ক্রমবর্ধমান এই হতাশা তরুণদের সরাসরি প্রতিবাদের একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে। মোদির শাসনামলে বেড়ে ওঠা এই নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে বিজেপি কোনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। এরা ছকবাঁধা রাজনৈতিক দলের পথে হাঁটতে চাইছে না। বরং তরুণদের সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তৈরি হচ্ছে। এটাই চিন্তায় ফেলেছে বিজেপিকে।  
 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি ইতিমধ্যেই রাজনীতির আলোচনার ভাষা বদলে দিয়েছে। তবে এই জেন-জি’র বিক্ষোভ কোনদিকে ধাবিত হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্যান্য অনেক সমাজমাধ্যমের আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনও এক সময় থিতিয়ে যাবে কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেক সমাজবিজ্ঞানী।

 

অনুসন্ধান'র অন্যান্য খবর