ইতিহাস, ধর্ম, ন্যায়বোধ ও ভূরাজনীতির বিশ্লেষণ বাদ দিলেও সামপ্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭৯ শতাংশ মানুষের ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও যেখানে ইসরাইল দীর্ঘদিনের মিত্র, সেখানে ৬০ শতাংশ মানুষের মনোভাব নেতিবাচক। জরিপটি পরিচালনা করেছে Pew Research Center নামে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জরিপে আরও দেখা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে তীব্র।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশে কেন ইসরাইলবিরোধিতা এত গভীর? এর উত্তর কেবল ধর্মে নয়, বরং ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, নৈতিক রাজনীতি, গণমাধ্যম ও বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত।
প্রথমত: ধর্মীয় সংহতি, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়
বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্নটি অনেকের কাছে কেবল একটি ভূরাজনৈতিক সংকট নয়। মুসলিম উম্মাহর একটি মানবিক ও আবেগিক ইস্যু।
ঐতিহাসিক জেরুজালেম, আল আকসা মসজিদ এবং ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসলামের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে এবং মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখে।
তবে শুধু ধর্ম দিয়ে এই মনোভাব ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ জরিপে দেখা যাচ্ছে ইউরোপের বহু দেশেও ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচকতা দ্রুত বাড়ছে। ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস কিংবা যুক্তরাজ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইসরাইলের নীতির সমালোচক। অতএব, ধর্ম একটি উপাদান হলেও একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।
দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল দখল ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। একটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, শরণার্থী সংকট এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন-এসব বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার অংশ।
ফলে অনেক বাংলাদেশি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে নিজেদের ইতিহাসের আলোকে দেখেন। তাদের কাছে এটি “আরব বনাম ইসরাইল” নয়। বরং “দখলদার বনাম অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী”র প্রশ্ন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “মুক্তি সংগ্রাম” একটি শক্তিশালী নৈতিক ধারণা। ফলে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি জাতীয় স্মৃতির সংগ্রামশীলতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
তৃতীয়ত: গাজার যুদ্ধ বাংলাদেশি জনমতকে আরও কঠোর করেছে
বিশেষত ২০২৩ সালের পর থেকে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ, ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের খবর এবং মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র বাংলাদেশে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও ঢাকা ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসরাইলকে বিচার করেন গাজায় তার সামরিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে, ইসরাইলের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তিতে নয়।
চতুর্থত: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক অবস্থান
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই ফিলিস্তিনকে সমর্থন করেছে এবং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি।
ঢাকার সরকারি অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে একই-একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনসাফ-ভিত্তিক সমাধান।
এই নীতি কেবল ধর্মীয় বিবেচনায় গড়ে ওঠেনি। বরং তা নিরপেক্ষ আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বের জাতীয়তাবাদ এবং উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির ধারাবাহিকতার অংশ।
পঞ্চমত: ইসরাইলকে অনেক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অংশ হিসেবে দেখেন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পশ্চিমা শক্তির প্রতি একধরনের সন্দেহ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেকের কাছে ইসরাইল কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের প্রতীক। ফলে ইসরাইলবিরোধিতা অনেক সময় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনার সঙ্গেও মিশে যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সব ইসরাইল সমালোচনা ইহুদিবিরোধিতা নয়। বাংলাদেশের মূলধারার জনমতে সাধারণত ইহুদি ধর্ম বা ইহুদি জনগোষ্ঠীর চেয়ে ইসরাইলি রাষ্ট্রের নীতি ও সামরিক কর্মকাণ্ডই বেশি সমালোচিত হয়।
ষষ্ঠত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন প্রজন্মকে আরও সক্রিয় করেছে
আগে ফিলিস্তিন প্রশ্নটি ছিল সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের বিষয়। এখন যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি, ভিডিও, মানবিক বিপর্যয়ের তথ্য মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম সরাসরি ঘটনাগুলো অনুসরণ করছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ভাষ্যের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করছে।
পিউ জরিপেও দেখা গেছে, বিশ্বের বহু দেশে তরুণদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বয়স্কদের তুলনায় বেশি।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা
তবে ইসরাইলবিরোধিতার মধ্যেও একটি বৈপরীত্য রয়েছে।
একদিকে রাজনৈতিক ও জনমত পর্যায়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রবল অবস্থান দেখা যায়, অন্যদিকে ইসরাইলের কৃষি, প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা উদ্ভাবনী অর্থনীতি নিয়ে গবেষণামূলক আগ্রহও বিদ্যমান। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা এবং একটি দেশের প্রযুক্তিগত অর্জনের মূল্যায়ন-এই দু’টি বিষয়কে আলাদা করেই দেখার একটি প্রবণতা রয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ইসরাইলবিরোধিতা মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে-
১. মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আবেগিক ও ধর্মীয় সংহতি
২. মুক্তিযুদ্ধ-উৎসারিত ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চেতনা
৩. গাজা ও ফিলিস্তিনের মানবিক সংকট সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ
৪. উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক অবস্থান।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের জনমতে ইসরাইল প্রশ্নটি কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতি ইস্যু নয়; এটি ন্যায়-অন্যায়, নিপীড়ন-প্রতিরোধ এবং জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি নৈতিক প্রশ্ন। পিউ জরিপে ৭৯ শতাংশ নেতিবাচক মনোভাবের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা মূলত দীর্ঘ ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের কোনো সরাসরি সীমান্ত বিরোধ নেই, ভূখণ্ডগত দ্বন্দ্ব নেই, এমনকি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থসংঘাতও নেই। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে ইসরাইল কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি নয়। তবুও ইসরাইলবিরোধী মনোভাব এত প্রবল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অবস্থান মূলত স্বার্থকেন্দ্রিক নয়, বরং মূল্যবোধ ও মতাদর্শিক অবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক রাষ্ট্রই দূরবর্তী সংঘাতকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন প্রশ্নটি ভিন্ন। এটি এমন একটি ইস্যু, যেখানে ভৌগোলিক দূরত্ব রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে কমিয়ে দেয়নি। বরং উপনিবেশবিরোধী চেতনা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সমর্থন, দুর্বল জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিন প্রশ্নকে বাংলাদেশের জনমনে এক বিশেষ নৈতিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশিদের একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার, দখল ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, শরণার্থী সংকট এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্ন-এসব বিষয় বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। ফলে অনেক বাংলাদেশি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে নিজেদের ইতিহাসের প্রতিধ্বনি খুঁজে পান। এ কারণেই ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমত কেবল কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি নৈতিক সংহতির প্রকাশে পরিণত হয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বিরল জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করেছে। ইসলামপন্থি, জাতীয়তাবাদী, বামপন্থি, উদারপন্থি-বিভিন্ন মতাদর্শিক ধারার মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে একটি বিস্তৃত সহমত দেখা যায়। এটি দেখায় যে, বিষয়টি কেবল ধর্মীয় আবেগের নয়। বরং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচিত।
সুতরাং বাংলাদেশের ইসরাইলবিরোধী মনোভাবকে শুধুমাত্র মুসলিম সংহতি বা আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তা অসম্পূর্ণ হবে। এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর মতাদর্শিক দৃঢ়তা-যেখানে একটি দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সমর্থন করা হয় কোনো প্রত্যক্ষ লাভের প্রত্যাশায় নয়, বরং ন্যায়বোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের জন্য ফিলিস্তিন প্রশ্নটি তাই ভূরাজনীতির চেয়ে বেশি এমন এক ধরনের নীতিগত অবস্থান, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে মূল্যবোধের বিশ্বজনীন রাজনীতিতে পৌঁছে গেছে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।