আটাশ বছর ধরে বহু লড়াই ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে একক প্রচেষ্টায় যে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা মাত্র আটাশ দিনের মধ্যে ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। একে একে অধিকাংশ দলীয় বিধায়ক ও সাংসদ তার সঙ্গ ত্যাগ করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আলাদা হয়ে গিয়েছেন। একদিন যারা তার অন্তরঙ্গ স্নেহের আঁচলে ছিলেন তারাও সংকটের সময়ে পরিত্যাগ করেছেন প্রিয় দিদিকে। ফলে আজ মমতা একজন নিঃসঙ্গ শেরপা ছাড়া আর কিছু নন। তবে এরই মধ্যে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় দিল্লিতে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে গিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টা খুব কাজে আসেনি। ফলে পরদিন ছুটে গিয়েছেন ১০ নং জনপথে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে। যার হাত ধরে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন তারই কাছে আশ্রয় খুঁজতে। আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভাইপো অভিষেককেও পাঠিয়েছেন রাহুল গান্ধীর কাছে একই ঠিকানায়। তবে কীভাবে মমতার মুখরক্ষা হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পরও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট চুরির অজুহাত তুলে নির্বাচনের ফলকে মানতে চাননি। ৪ঠা মে’র পরও তিনিই মুখ্যমন্ত্রী বলে দাবি করে গলা ফাটিয়েছেন। কিন্তু দলের সকলে ততদিনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। আর তার কয়েকদিনের মধ্যে মমতা ব্যানার্জীর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি দল তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ভাঙনের সাক্ষী হয়েছে। ইতিহাসের এই পরিহাসকে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল।
একদিন বিদ্রোহ করে ১৯৯৮ সালের ১লা জানুয়ারি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস। আর আটাশ বছর পর আরেকটি বিদ্রোহের অভিঘাতে তিনিই কুপোকাত। আর সেই বিদ্রোহের বিষবৃক্ষটি তিনিই বপন করেছিলেন কয়েক বছর আগে। যেদিন মমতা পিসির স্নেহে ভাইপো অভিষেককে দলে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন সেদিনই দলের মধ্যে চোরাস্রোত বইতে শুরু করেছিল। একমাত্র আজকের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সারসত্যটা বুঝে তৃণমূল কংগ্রেসে প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও দল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অন্যেরা পারেননি। বরং মমতার দাপট ও অভিষেকের ঔদ্ধত্যের সামনে সকলে গুটিয়ে ছিলেন। তবে পরাজয়ের পর সকলে ফোঁস করে উঠেছেন দিদির বিরুদ্ধে অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু স্নেহশীলা পিসি ভাইপোর কোনো ত্রুটি দেখতে পাননি বা চাননি।
বরং ৬ই মে তৃণমূল কংগ্রেসের নবনির্বাচিত বিধায়কদের এক সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বিধায়কদের উঠে দাঁড়িয়ে অভিষেকের নির্বাচনী প্রচারণায় ভূমিকার জন্য তাকে করতালি দিতে সম্মান জানাতে বলেছিলেন সেদিনই সকলে বুঝে গিয়েছিলেন দলকে রাহুমুক্ত করা মমতার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন থেকে বিদ্রোহের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য বিধানসভার স্পিকারকে দেয়া সই জালিয়াতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহ চূড়ান্ত রূপ নেয়। সই জালিয়াতির ঘটনার অভিযোগ তোলায় দল থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কারের পরই পাল্টা ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে ৬০ জন বিধায়কই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনয়ন করে স্পিকারকে চিঠি দেন। স্পিকার তা মেনেও নেন। আর এখন এক সময়ের বাম তুর্কী নেতা ঋতব্রত জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের সমর্থকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তারাই আসল তৃণমূল কংগ্রেস। সোজাকথায় মমতার হাতের বাটন এখন ঋতব্রতের হাতে।
অথচ মাত্র ১৫ বছর বয়সে ছাত্রী নেত্রী হিসেবে মমতা রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলেন। এবং অল্প সময়ের মধ্যে কংগ্রেসে নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমে মহিলা কংগ্রেস ও পরে যুব কংগ্রেসের নেত্রী হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সমর্থনে কলকাতায় প্রতিবাদী সমাজবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে চড়ে নেচে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন।
১৯৮৪ সালে কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জিকে পরাজিত করে মমতা ভারতের অন্যতম কনিষ্ঠ সাংসদ হয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এর পর থেকে তার প্রতিবাদী ভূমিকার সাক্ষী থেকেছে গোটা দেশ।
তবে ১৯৯০ সালে কংগ্রেসের ডাকা একটি বন্ধকে কেন্দ্র করে প্রচারের সময় মমতা সিপিআইএমের ক্যাডারদের হাতের ডাণ্ডায় গুরুতর আহত হয়ে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
১৯৯২ সালে মমতা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী একটি মেয়েকে সিপিআই (এম) ক্যাডাররা ধর্ষণ করেছিল বলে অভিযোগ করে রাইটার্স বিল্ডিং-এ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে নিগৃহীত করার পরে গ্রেপ্তার করে।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা সময়ে মমতা কখনো বিজেপিতে গিয়েছেন, কখনো কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন। আর দুই দলের সরকারেই তিনি একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছেন।
তবে ১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বামফ্রন্টের প্রতি নমনীয় মনোভাবের অভিযোগ তুলে মমতা কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে তৈরি করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস।
এরপর থেকে মমতা প্রবল বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধিতার মাধ্যমে দলকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কর্তৃক বলপূর্বক কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে মমতা কলকাতায় ঐতিহাসিক ২৬ দিনের অনশন করেছিলেন। এই সময় নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে উর্বর কৃষিজমিতে শিল্পের বিরোধিতা ও পরিবেশ রক্ষার কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মমতা প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
৩৪ বছরের বামফ্রন্টের শাসনে অনুন্নয়ন, স্থবিরতা, শাসক নেতাদের অহঙ্কার ও অত্যাচার দেখতে দেখতে ক্লান্ত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ লড়াকু, সৎ ও নিষ্ঠাবান নেত্রীর মধ্যে আশার আলো দেখেছিলেন। ফলে ২০১১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে বাম দুর্গকে ধুলিসাৎ করেছিলেন মমতা। হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। হাওয়াই চটি ও সাদা সুতির শান্তিপুরি শাড়িতে অনাড়ম্বর জীবনের মানুষটি অল্পদিনেই প্রবল অহঙ্কারী ও স্বৈরতন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার আস্ফালনে মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। ভাইপোর সাহায্য নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলকে করপোরেট কালচারে পরিচালিত করতে চেয়েছেন। ভোটের কৌশল রচনায় দক্ষ আইপ্যাক সংস্থাকে কর্তৃত্বে স্থাপন করেছিলেন। প্রকারান্তরে অভিষেককে দলের নির্ভরযোগ্য সেনাপতি করেছিলেন। সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য বারে বারে দেখা গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তাবড় মন্ত্রীদেরও তিনি কেয়ার করতেন না। তার সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে দেখা করতে গেলে আগে তার দারোয়ানের কাছে সময় চাইতে হতো। মোবাইলফোন জমা রেখে তার ঘরে ঢুকতে হতো মন্ত্রীদেরও।
এদিকে দলের মধ্যে অবলীলায় দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন মমতা। চাকরি চুরির মতো ভয়ঙ্কর দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পরও তিনি চোখ বুজে থেকেছেন। নেতাদের বান্ধবীর বাড়ির খাটের নিচ থেকে ৫০ কোটি রুপি এবং কেজি কেজি সোনা পাওয়ার পরও মমতা দায় এড়িয়েছিলেন। এলাকায় এলাকায় তৈরি করেছেন দুর্বৃত্ত বাহিনী। যাদের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী সহজেই পার হতেন। পঞ্চায়েত স্তরের নেতারা পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে মানুষ জ্ঞান করা ভুলে গিয়েছিলেন। আর তাই এক সময়ের সহযোদ্ধা কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মুখ থেকে শোনা গেছে আসল সত্যটি। তার কথায়, মমতা ব্যানার্জীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দলটি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার একাধিক অভিযোগের সম্মুখীন হলেও দলের নেতৃত্ব সেদিকেও চোখ বুজে ছিল। ভুল শুধরে নেয়ার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি, যার ফলে সর্বশেষ নির্বাচনে বিপর্যয়কর ফলাফল হয়েছে।
গত ১৫ বছরে মমতা যে ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন নেত্রীতে পরিণত হচ্ছেন সেটা বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন, খয়রাতির মাধ্যমে মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে। আর্থিক অনুদান পেয়েই তারা খুশি থাকবেন। নারী সুরক্ষার প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে মমতার বিরূপ মন্তব্য সকলকে ক্ষুব্ধই করেনি, পথেও নামিয়েছে। আরজি-কর হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় এক তরুণী চিকিৎসককে যেভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল তা ধামাচাপা দেয়ার জন্য নির্লজ্জভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। এই ঘটনায় গোটা নাগরিক সমাজ কেঁপে উঠেছিল। প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল।
ছাব্বিশের নির্বাচনে সেই সবেরই সমষ্টিগত প্রভাব দেখা গিয়েছে। হতাশা কাটিয়ে উঠে মানুষ ঢেলে ভোট দিয়েছেন একজন স্বৈরাচারী, অহঙ্কারীর বিরুদ্ধে। প্রত্যাখ্যানের সেই ভোটে ঝুলি পূর্ণ হয়েছে বিজেপি’র। সেই সঙ্গে আরএসএসের দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের মাটিতে হিন্দুত্বের বীজ বপন করে জমি উর্বর করার সুফলও পেয়েছে বিজেপি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে আকাঙ্ক্ষা বিজেপি ডবল ইঞ্জিনের উদাহরণকে সামনে রেখে মানুষের সামনে হাজির করেছিল তাও কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে বিজেপি’র ভূমিধস জয়লাভে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের এই ফলাফল নিয়ে কথা হচ্ছিল এক প্রবাসী অধ্যাপিকার সঙ্গে। তিনি বলেন, এবার রাজ্যে এসে একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম যখন দেখলাম আমার বামপন্থি বাবা- মায়ের মুখের তৃপ্তির হাসি। তিনি আরও বলেন, তারা কিন্তু বামদেরই ভোট দিয়েছেন। এই রকম আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলে এটা বুঝেছি, মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে, সনাতনীর উদ্গাতাদের বিরুদ্ধে কিন্তু এখনো ৪০ শতাংশ মানুষের ভোট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুসলমানদের একটা বড় অংশের ভোট।
তবে এই ৪০ শতাংশ ভোট আগামী দিনে কী ভূমিকা নেবে তার উপর নির্ভর করবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ। নিঃসঙ্গ মমতা কি পারবেন ভাঙনের ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়াতে? মমতা তার রাজনৈতিক জীবনে বহুবার প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। কিন্তু এবারের চ্যালেঞ্জ তার সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।