মে মাসের মধ্যে সম্ভবত ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেবেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী। দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয় নি।
তবে বাংলাদেশের সঙ্গে গত দেড় বছরের বেশি সময়ের তিক্ততা দূরে সরিয়ে যখন সম্পর্ক পুনঃনির্মাণের চেষ্টা চলছে ঠিক তখনই ভারত সরকার পেশাদার কূটনীতিবিদকে দায়িত্ব না দিয়ে একজন রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়েছে তা নিয়ে ভারতে কূটনেতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
প্রকৃতপক্ষে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ঢাকায় এর আগে কখনো কোনো রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়নি। একজন সাবেক কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন যে, ত্রিবেদীর নিয়োগের তাৎপর্য এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনিই প্রথম অ-পেশাদার কূটনীতিক ব্যক্তিত্ব যাকে কোনো প্রতিবেশী দেশে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৭৫ বছর বয়সী ত্রিবেদী মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন সরকারে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি রাজ্যসভা ও লোকসভা উভয়কক্ষেই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ব্যারাকপুর আসন থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রেলভাড়া বৃদ্ধির প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২১ সালে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। ত্রিবেদী গুজরাটি পরিবারের সন্তান হলেও কলকাতাতেই তার স্কুল ও কলেজ জীবন অতিবাহিত হয়েছে। পরে তিনি বিদেশে পড়তে গিয়েছিলেন।
গত ৫০ বছরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের প্রধান হিসেবে রাজনৈতিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয় নি। তবে স্বাগতিক দেশকে প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দিতে ভারত আগেও আইএফএস-বহির্ভূত কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এস. কে. সিনহাকে ১৯৯০ সালে নেপালে ভারতের দূত হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল, ঠিক যখন দেশটি একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল।
আবার আইনবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এল. এম. সিংভিকে ১৯৯১ সালে যুক্তরাজ্যে ভারতের হাইকমিশনার করা হয়েছিল। এমন এক সময়ে তা করা হয়েছিল যখন বৃটেনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল ছিল। তবে ঢাকায় ভারতের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক নিয়োগের নজির রয়েছে। প্রথমে সুবিমল দত্ত, পরে সমর সেন বাংলাদেশের উন্মেশ লগ্নে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মোদি সরকারের আমলে নন ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি এড়িয়েই যাওয়া হয়েছে। আর তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় ভার্মার উত্তরসূরি হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত সন্দীপ চক্রবর্তীর নাম প্রস্তাব করেছিল। চক্রবর্তীর বাংলাদেশে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সেই প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন পায় নি। শেষপর্যন্ত দীনেশ ত্রিবেদীকেই মনোনীত করা হয়। এই নিয়োগের পেছনে মোদির ইচ্ছা এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের পরামর্শ কাজ করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের একজন পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত অনেক বার্তা বহন করছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের এই সিদ্ধান্ত উত্তেজনা প্রশমন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, পানি চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে উচ্চতর পর্যায়ের সম্পৃক্ততা ও উন্নত সহযোগিতার প্রত্যাশা করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ত্রিবেদীর গভীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক, সাবলীল বাংলায় কথা বলার দক্ষতা এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে আস্থা পুনঃনির্মাণ করাই এর উদ্দেশ্য।
পর্যবেক্ষক মহলের একাংশের মতে, ত্রিবেদী যেহেতু একজন রাজনীতিক, কূটনীতিক নন, তাই খুব সম্ভবত তাকে ক্যাবিনেট পদমর্যাদা দেয়া হতে পারে, যাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারেন। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। অতীতে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সিংভির ক্ষেত্রে তা হয়েছে।
ঢাকায় ত্রিবেদীর নিয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বলে মনে করা হয়। তার অন্যতম দায়িত্ব হবে দ্রুত বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর সফর বাস্তবায়িত করা। আর সেটা সম্ভব হলে তা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করবে এবং বলা যাবে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কটি অতীতের বিষয়। এটি হবে একটি নতুন সূচনা। অবশ্য এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর রূপায়িত করার দায়িত্বও তাকে সামলাতে হবে।