বাজেটে কী পেলো সাধারণ মানুষ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | এক্সক্লুসিভ
জুন ১৩, ২০২৬
বাজেটে কী পেলো সাধারণ মানুষ

বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কী আছে? বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর এবার বিএনপি সরকার নতুন বাজেট উপস্থাপন করেছে। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বাজেট। চলতি বছর তৈরি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি। তবু ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শিরোনামের এই বাজেটে ঘাটতিও রেকর্ড পরিমাণ। বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ করেছেন। তবুও নতুন সরকারের প্রথম এই বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় করদাতা ও নীরব গোষ্ঠী ‘মধ্যবিত্ত’ এই বাজেটে কতোটা গুরুত্ব পেলো? ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে তারা আসলে কী পেলো? কারণ দেশের সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না। কিন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুনে উত্তাপ বাড়ছে মধ্যবিত্তের সংসারে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ নানা ধরনের সহায়তা পেলেও মধ্যবিত্তের ভাগ্যে তা জোটে না। আবার লোকলজ্জার ভয়ে কোথাও গিয়ে হাত পাততেও পারেন না। ফলে এই শ্রেণির মানুষের জীবনে ভোগান্তি বাড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। 
 

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার মধ্যবিত্তের জন্য কিছু স্বস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু সিদ্ধান্তও আছে, যা তাদের ব্যয় আরও বাড়াতে পারে। ফলে বাজেটকে মধ্যবিত্তের জন্য পুরোপুরি স্বস্তির বলা যাচ্ছে না। মধ্যবিত্তের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। বাজারে সব পণ্যের দামে আগুন। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি-সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী। গত মে মাসের হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার জিনিস কিনতে এখন প্রায় ১১০ টাকা লাগছে। সরকার বাজেটে এই মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এটি যদি সত্যি সফল হয়, তবে মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। কিন্তু বাজেট বড় হওয়ার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। ফলে দাম কতোটা কমবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মনে সংশয় আছে।
 

বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য যা আছে: অর্থমন্ত্রী মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১. করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল। এখন পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। নারী ও প্রবীণদের জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা। ২. নিত্যপণ্যে শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, গুঁড়োদুধসহ ১২টি জরুরি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে বাজারে দাম কিছুটা কমতে পারে। ৩. ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ৫০টি ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ওষুধের খরচ কমবে। ৪. শিক্ষা উপকরণের দাম কমানো হয়েছে। খাতা, কলম, পেনসিল, জ্যামিতি বক্সের স্থানীয় উৎপাদন কর কমানো হয়েছে। অভিভাবকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। ৫. ডিজিটাল ওএমএস কার্ড চালু করা হচ্ছে। বড় শহরে সীমিত আয়ের চাকরিজীবীরা লাইনে না দাঁড়িয়ে সুলভমূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।
 

৬০ নিত্যপণ্যে কর ছাড়: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপক কর ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে চায়। প্রস্তাবে ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, পিয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্য তেল সহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ ব্যয় কমে উপকৃত হবে ভোক্তারা। এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারে অগ্রিম কর প্রত্যাহার, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পণ্যে কর কমানো, ইলেকট্রিক বাস-ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনে উৎসে কর মওকুফের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল ও প্রযুক্তিপণ্য আমদানিতে কর কমছে। ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ লাঘব করবে। মেট্রোরেলে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে গণপরিবহনে অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর ফলে বাস ভাড়া বাড়তে পারে।
 

অর্থনীতিবিদরা বলেন, মধ্যবিত্ত ভোগব্যয় করে অর্থনীতি চালায়। তাদের সঞ্চয় কমলে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বাজেট তাদের জন্য আংশিক স্বস্তি এনেছে। পুরো স্বস্তির জন্য আরও পদক্ষেপ দরকার। সাধারণ মধ্যবিত্তের আসল স্বস্তি বাজারের ওপর নির্ভর করে। পকেটের টাকা বাঁচিয়ে মাস চালানো কঠিন হলে অন্য সুবিধা কাজে আসবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে এগুলো কাগজি স্বস্তি হয়ে থাকবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণত, বাজেটে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য কিছু উদ্যোগ থাকলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তার পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। নিম্ন আয়ের মানুষ কিছু সরকারি সহায়তা পায়, উচ্চ আয়ের মানুষ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সামাল দিতে পারে, কিন্তু মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয় দুটোই ক্ষয় হচ্ছে। 
ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তাদের জন্য নতুন কোনো ভর্তুকি বা নগদ সহায়তার চেয়ে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ বেশি প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা ও কারসাজি কমানো, কৃষি উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অনুসরণ করা জরুরি। তিনি বলেন, এ ছাড়া কর ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তবান্ধব সংস্কার প্রয়োজন। করমুক্ত আয়সীমা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয়, তাদের ওপর থেকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কমানো এবং একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবার মান উন্নত করা গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমবে।’
 

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, মধ্যবিত্তরা সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো পেলেও বেসরকারি চাকরিজীবী ও শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কমই। তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে স্বস্তি আংশিক, কারণ এই সীমা অতিক্রম করলেই করহার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ থেকে শুরু হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ পুরোপুরি কমছে না। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য সীমা আরও বাড়ানো হলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় এই স্বস্তি খুব বড় নয়। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় মধ্যবিত্তের জন্য কর-স্বস্তি, নগর ব্যয় সহায়তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় রেয়াত ও বাজারদর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
 

তবে বাজেটে কিছু চাপও আছে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, খেলনা, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, টাইলসের দামও বাড়বে। রডের দাম বেড়ে বাড়ি নির্মাণের খরচ বাড়বে।
সঞ্চয়পত্রে কর দ্বিগুণ: প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগমাধ্যম সঞ্চয়পত্রে কর দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কমানো হচ্ছে বিনিয়োগসংক্রান্ত কর রেয়াতের সুবিধাও। অথচ সম্পদশালীদের সম্পদের ওপর করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মালিককে সুদ আয়ের ওপর এখন থেকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে, যা আগে ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমানে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে মুনাফার সময় ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়, আর এর বেশি অঙ্কের ক্ষেত্রে কাটা হয় ১০ শতাংশ।
 

বড় স্বপ্ন, বিশাল বাজেট, বিপুল ছাড়: বড় স্বপ্ন দেখিয়ে ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। মানুষ তাকিয়ে ছিলেন বাজেটের দিকে। সবার স্বপ্নপূরণে বিশাল বাজেটও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সব পক্ষকে খুশি করতে করের ক্ষেত্রে বিপুল ছাড়ও দিয়েছেন। একই সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও বিরাট।
 

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় বাজেটের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে। অনেক বেশি হারে কর আদায় করতে হবে। এরপরও ঘাটতি থাকবে অনেক। এ জন্য অর্থমন্ত্রী বেশি ভরসা করেছেন বৈদেশিক ঋণের ওপর। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ঋণ পেতে হবে। আর সংস্কারের ওপরই নির্ভর করবে বিপুল বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তি।
 

ব্যাংক খাত দুরবস্থায়। মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ আরও কমেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তো আছেই। এ রকম এক অবস্থায় অনেক স্বপ্নপূরণের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
এমনকি আগামী পাঁচ বছরে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সে কথাও বলেছেন। কিন্তু কাজটি কীভাবে হবে, সংশয় এ নিয়েই। স্বপ্নের কথা আছে, সেই স্বপ্নপূরণ কীভাবে হবে-সেই কাঠামো এখনো অস্পষ্ট। তার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা অনিশ্চয়তায় ভরা।
 

টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ। বাজেট বড় না ছোট-এতে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না। বরং তারা এখন স্বস্তি চান। আর এ জন্য তারা ভরসা করে আছেন নতুন সরকারের ওপর। সবার আশা, সরকার কেবল স্বপ্নের কথাই শোনাবে না, কাজও করবে।
রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছিলেন, ‘এবার ফিরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে/ হে কল্পনে, রঙ্গময়ী! দুলায়ো না সমীরে সমীরে/ তরঙ্গে তরঙ্গে আর, ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়।’ অর্থাৎ এখন আর কথায় বা মায়ায় ভুলতে চাইবেন না দেশের মানুষ।

 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর