বিতর্ক

সীমান্তে পুশব্যাক মানবিক সংকট, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও ভূরাজনীতির অবস্থান

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | এক্সক্লুসিভ
জুন ১৩, ২০২৬
সীমান্তে পুশব্যাক মানবিক সংকট, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও ভূরাজনীতির অবস্থান

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সামপ্রতিক “পুশব্যাক” বা “পুশইন” ঘটনাগুলোকে কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন মানবাধিকার, নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সামপ্রতিক সপ্তাহগুলোতে সীমান্তে বহুবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এবং উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে।
 

মানবিক সংকট: মানুষ কি শুধু সংখ্যা?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ-নারী, শিশু, শ্রমজীবী অভিবাসী, এমনকি এমন ব্যক্তিরাও যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে স্পষ্টতা নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অনেককে “বাংলাদেশি” বলে দাবি করে সীমান্তে ঠেলে দেয়া হয়েছে, কিন্তু পরে তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদেরও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
 

কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার এবং বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় সামপ্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, কিছু মানুষকে হঠাৎ করে সীমান্তবর্তী শূন্য-অঞ্চলে রেখে যাওয়া হয়েছে, যেখানে তারা কার্যত কোনো রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাচ্ছে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু মানুষকে “নো-ম্যানস ল্যান্ড”-এ আটকে পড়তে হয়েছে, যেখানেও তারা কার্যত কোনো রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক পরিস্থিতি।
 

বাংলাদেশের অবস্থান ও সীমান্ত বাস্তবতা: বাংলাদেশের অবস্থান মূলত দু’টি নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে:
১. যদি কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হন, তবে তাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।
২. কিন্তু তা অবশ্যই কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেয়া আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি। এই কারণে Border Guard Bangladesh (BGB) সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জোরদার করেছে এবং একাধিক “পুশইন” প্রচেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে।
 

ভারতের অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে “অবৈধ অভিবাসন” বহু বছর ধরে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি অবৈধ অভিবাসনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
 

ফলে সীমান্তে পুশব্যাক কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
সীমান্ত কূটনীতি ও সামপ্রতিক বৈঠক: এই প্রেক্ষাপটে সামপ্রতিক সময়ে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে Border Security Force (BSF) এবং Border Guard Bangladesh (BGB)-এর উচ্চপর্যায়ের Director General-স্তরের সীমান্ত সমন্বয় বৈঠক।
 

এই বৈঠকে মূলত পুশইন/পুশব্যাক, সীমান্ত হত্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। বাস্তবে এই বৈঠকটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চাপ-নিরসন মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে সীমান্ত উত্তেজনা ব্যবস্থাপনাই প্রধান এজেন্ডা।
 

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পূর্ববর্তী সময়ে যে মাত্রার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল, বর্তমানে তার পরিবর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সতর্ক দূরত্ব দেখা যাচ্ছে।
 

এই পরিস্থিতিতে পুশব্যাক ইস্যু একটি প্রতীকী গুরুত্বও বহন করছে। কারণ এটি শুধু সীমান্ত নয়, পারস্পরিক আস্থা (mutual trust)-এর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
 

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতির দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে।
 

এই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত প্রশ্ন একটি নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়-অভিবাসনকে Òsecurity issue” হিসেবে দেখা শুরু হলে মানবিক বিবেচনা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
 

আইনি ও মানবাধিকার কাঠামো: আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হলেও তা কখনোই সম্পূর্ণ বা absolute নয়। মানবাধিকার ও শরণার্থী আইনের মৌলিক নীতিগুলোর দ্বারা এই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। বিশেষত Ònon-refoulementÓ নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবিক মর্যাদা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। যদিও বাংলাদেশ ও ভারত কেউই ১৯৫১ সালের জবভঁমবব Convention-এর স্বাক্ষরকারী নয়, তবুও non-refoulement নীতিকে আন্তর্জাতিক আইনের একটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত customary principle হিসেবে বিবেচনা করা হয়-বিশেষ করে নির্যাতন বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকির ক্ষেত্রে। ফলে সীমান্তে ব্যক্তিগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে কাউকে ফেরত পাঠানো কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে।
ধারণাগত দ্বন্দ্ব: “পুশব্যাক” এবং “পুশইন” শব্দ দু’টি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়; বরং এটি দুই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিগত সংঘাতের প্রতিফলন। ভারত সাধারণত যাকে “ঢ়ঁংয নধপশ” বলে, বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে “push-in” হিসেবে বর্ণনা করে।
 

বাস্তবে এই দুই শব্দ একই ঘটনার ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। ফলে বিষয়টি কেবল আইনগত নয়, narrative contestation বা “ব্যাখ্যার যুদ্ধ”-এর অংশও বটে।
এই সংকটের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে, রাষ্ট্রের সীমান্ত কি মানুষের মর্যাদার চেয়ে বড়?
 

রাষ্ট্রের অধিকার আছে সীমান্ত রক্ষা করার। কিন্তু একইসঙ্গে মানুষেরও অধিকার আছে ন্যায্য প্রক্রিয়া, পরিচয় যাচাই এবং মানবিক আচরণ পাওয়ার।
যদি কোনো মানুষকে রাতের অন্ধকারে, পরিচয় যাচাই ছাড়া, দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে ফেলে রাখা হয়, তাহলে সে শুধু একটি “অবৈধ অভিবাসী” নয়; সে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক।
এই সংকটের সমাধান কোনো একক নিরাপত্তা-ভিত্তিক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন একটি কাঠামোগত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক আঞ্চলিক নীতি-ফ্রেমওয়ার্ক, যা দুই দেশের রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ এবং মানুষের মর্যাদা-দুইটিকেই সমানভাবে বিবেচনা করবে।
 

১. Joint Verification Mechanism (JVM): যৌথ নাগরিকত্ব যাচাই কাঠামো:
বর্তমান সংকটের অন্যতম মূল সমস্যা হলো-একতরফা পরিচয় নির্ধারণ ও দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া।
এই অবস্থায় প্রস্তাবিত Joint Verification Mechanism (JVM) হবে একটি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে:
দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও ইমিগ্রেশন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করবে
সন্দেহভাজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক যৌথ যাচাই প্রক্রিয়া” চালু থাকবে
একটি যৌথ ÒArbitration CellÓ থাকবে, যেখানে পরিচয় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে
একতরফা ঢ়ঁংযনধপশ আইনত নিষিদ্ধ করার জন্য দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল থাকবে।
২. Real-time Data Sharing System: প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয় যাচাই
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো তথ্যের বিলম্ব ও অসামঞ্জস্য।
এই প্রস্তাবে একটি রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং অবকাঠামো গঠনের কথা বলা হচ্ছে।
৩. Standard Operating Procedure (SOP): মানবিক সীমান্ত প্রোটোকল
সীমান্তে ঢ়ঁংযনধপশ প্রক্রিয়াকে নিয়মবদ্ধ ও মানবিক করার জন্য একটি বাধ্যতামূলক ঝঙচ প্রয়োজন।
 

এই SOP-তে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর আগে বাধ্যতামূলক Ôdue process screeningÕ
নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা মানবিক প্রটোকল
প্রতিটি সীমান্ত ঘটনার ভিডিও ও লিখিত ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ।
৪. Humanitarian Buffer Zone Protocol: অস্থায়ী মানবিক সুরক্ষা এলাকা
অনেক ক্ষেত্রে মানুষ দুই দেশের সীমান্তে আটকে পড়ে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় (stateless limbo)। এই সংকট মোকাবিলায় একটি অস্থায়ী মানবিক সুরক্ষা কাঠামো দরকার।
এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো-মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে বিপদে না ফেলে আইনি ও মানবিকভাবে যাচাই করার সময় দেয়া।
৫. Regional Migration Dialogue: দক্ষিণ এশীয় কাঠামোগত সংলাপ’
 

এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেবল দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি আঞ্চলিক অভিবাসন কাঠামো।

এই সব প্রস্তাব অনুযায়ী: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী Migration Dialogue Platform গঠন।
দীর্ঘমেয়াদে একটি ÒSouth Asian Migration Framework ConventionÓ MV‡bi D‡`¨vM
 

আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে SAARC পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে এই কাঠামোকে institutionaliæe করা যেতে পারে।
এই পর্যায়ে লক্ষ্য হবে-সংকটকে নিরাপত্তা ইস্যু থেকে সরিয়ে একটি নিয়মভিত্তিক আঞ্চলিক নীতি কাঠামোতে রূপান্তর করা।
 

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংকটকে যদি কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হয়, তাহলে এটি ক্রমেই আরও জটিল ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে যাবে। কিন্তু যদি এটিকে একটি যৌথ প্রশাসনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তাহলে এটি সমাধানযোগ্য। যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকবে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা হবে কেন্দ্রে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশব্যাক  আসলে তিনটি সংকটের সমন্বয়:
১) মানবিক সংকট
২) কূটনৈতিক সংকট এবং
৩) ভূরাজনৈতিক সংকট।
দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান কাঁটাতারের মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছ নাগরিকত্ব যাচাই, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তঃরাষ্ট্রিক আস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে সম্ভব।
অন্যথায় সীমান্তে আটকে পড়া মানুষগুলোর মতোই দুই দেশের সম্পর্কও এক ধরনের “নো-ম্যানস ল্যান্ড”-এ আটকে যেতে পারে।  ্ত
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraiæees@gmail.com

 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর