অন্তহীন কৌতূহল। অগুনতি প্রশ্ন। টালমাটাল রাজনীতি। ঘটনার নেপথ্যে ঘটনা। দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা। সামরিক বাহিনীর দৌড়ঝাঁপ। রাজনীতিকদের চরিত্রহনন। ব্যবসায়ীদের হয়রানি। ট্রুথ কমিশনের নড়াচড়া। প্রতিবেশী দেশের হর্স ডিপ্লোম্যাসি। জেনারেল মইন চেয়েছিলেন ফৌজি শাসনের ঘোষণা দেবেন। হবেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু মইনের সেই খায়েশ পূরণ হয়নি। দু’নেত্রীকে আটক করা হয়। আলোচনার কেন্দ্রে সাব-জেল। শেখ হাসিনার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বৈঠক। তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বলপূর্বক দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া। ইতিহাসের এক ঘূর্ণি অধ্যায় ওয়ান-ইলেভেন। সে সময়ের মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সংস্কারপন্থিদের তৎপরতা। কিংস পার্টির নড়াচড়া। চিরচেনা নির্বাচনী ছক। একের পর এক ঘটনা। ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যের সেইসব অজানা অধ্যায় নিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী’র ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সাড়া জাগিয়েছে সর্বত্র। সাড়া জাগানো প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ ‘জনতার চোখ’-এর
পাঠকের জন্য-
তারেক রহমানকে যেভাবে গ্রেপ্তার এবং অমানুষিক নির্যাতন করা হয়
তারেক রহমান। বিএনপি’র চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বিলেতে ১৭ বছর কেমন ছিলেন? কীভাবে ছিলেন? কেনইবা তাকে বিলেতে যেতে হলো- তা নিয়ে অন্তহীন কৌতূহল। কখন, কীভাবে ও কারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা দীর্ঘ সময় ধরে অজানাই ছিল। সামপ্রতিক এক অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ১/১১-এর সময় ২০০৭ সনের ৭ই মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে। কারা গ্রেপ্তার করেছিলেন, কীভাবে করেছিলেন তার একটি বয়ান রয়েছে প্রাপ্ত অনুসন্ধানে। এতে জানা যায়, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যান। জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনের উপস্থিতিতে আর্মি হেড কোয়ার্টারে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মেজর ইমরানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন রানার ও একজন ড্রাইভার নিয়ে তিনি মইনুল হোসেন রোডস্থ খালেদা জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন। এ সময় বাসভবনের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি ছিল। মেজর ইমরান বাসভবনের মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে নিজ গাড়িতেই অবস্থান নেন। আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর তারেক রহমান বাসভবন থেকে বের হলে মেজর ইমরান তাকে নিয়ে গাড়িতে উঠেন। নিয়ে যান নির্ধারিত গন্তব্যে। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মেজর ইমরানের সঙ্গে থাকা রানার তারেক রহমানের মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এ সময় তারেক রহমান জানালা খোলার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মেজর ইমরান তা নাকচ করে দেন। এরপর সিটিআইবি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
সিটিআইবি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার নির্দেশেই অন্য কর্মকর্তারা বিশ্রী ভাষায় তারেক রহমানকে গালিগালাজ করেন। জেআইসিতেই তারেক রহমানকে তিন-চারদিন রাখা হয়। সেখানে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা হয়। হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হয়। দীর্ঘসময় একটানা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। যা ছিল অমানবিক, বর্বরোচিত। তারেক রহমানকে দুইবার জেআইসিতে আনা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে টানা কয়েকদিন জেআইসিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রব খান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে তারেক রহমানের কাছ থেকে একটি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যে জবানবন্দিতে তারেক রহমান তার ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান বলে দাবি করা হয়। এই সময় কারা কারা উপস্থিত ছিলেন সেই তথ্যও বেরিয়ে এসেছে সামপ্রতিক এক অনুসন্ধানে। চারজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে এই জবানবন্দি আদায় করেন। এর মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাহিদ হোসেন ও মেজর (অব.) মনির। নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানকে অনেকটা পঙ্গু করে ফেলা হয়। স্বাভাবিকভাবেও তিনি হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তার ওপর নির্যাতনের একটি কাহিনী অনুসন্ধানী রিপোর্টে সন্নিবেশিত রয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ সম্পর্কে একটি জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০৮ সনের জানুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নানি মারা যান। এ সময় তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। সে সময় জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেন, তারেক রহমান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। তখন তিনি জানার চেষ্টা করেন- কীভাবে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে পারেন ডিজিএফআই-এর অফিসাররা তার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এতে তিনি বিচলিত হয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের কাছে জানতে চান- কেন এই নির্যাতন চালানো হয়েছে। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
জেনারেল মাসুদ তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার অনেক দূরত্ব তৈরি হয়। নির্যাতনের সময় তারেক রহমানকে কীভাবে রাখা হয়েছিল তার একটা বর্ণনা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের নির্দেশে এই নির্যাতন চালানো হয়। তার নির্দেশে তারেক রহমানকে সিলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ওয়ারেন্ট অফিসার ফজলু জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ব্রিগেডিয়ার আমিন তাদেরকে বলেছেন- পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে। এক পর্যায়ে সিলিং থেকে তিনি পড়ে যান এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পান। এ কারণে বছরের পর বছর তারেক রহমানকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। এসব ঘটনায় সাত পদস্থ সেনা কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে অনুসন্ধানে। এই অফিসাররা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন (তৎকালীন সিটিআইবি’র পরিচালক), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী (তৎকালীন সিটিআইবি’র পরিচালক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের চৌধুরী (তৎকালীন জেএসও-১), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান (তৎকালীন জেআইসি অধিনায়ক সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. ফরিদ উদ্দিন (তৎকালীন জেএসও-১) এবং মেজর (অব.) মনির (তৎকালীন জেএসও-২, সিটিআইবি)।
জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেছেন, তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। জেনারেল মইন তাকে অন্যত্র পোস্টিং দিয়েছিলেন। পিএসও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারেক রহমান তার নিকটাত্মীয় বলে জেনারেল মইন তাকে দূরে রেখেছিলেন- এটাও দাবি করেছেন জেনারেল মাসুদ। তারেক রহমানের সঙ্গে জেনারেল মাসুদের কেন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তারও বর্ণনা দিয়েছেন জিজ্ঞাসাবাদে। বলেছেন, অপারেশন ক্লিন হার্টকে কেন্দ্র করেই এই দূরত্ব তৈরি হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সনের ১১ই সেপ্টেম্বর তারেক রহমানকে বলপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। এর আগে একটি অঙ্গীকারপত্র সই করিয়ে নেয়া হয়।
জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং মইনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ
ওয়ানইলেভেন কেন হয়েছিল। কীভাবে হয়েছিল। কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিক আর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকাই বা কী ছিল। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না? মিডিয়ার ভূমিকা কী ছিল। বিএনপি’র ভেতরে কীভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হয়। সংস্কারপন্থিরা দল ভাঙার জন্য কীভাবে সক্রিয় হয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বৈঠক। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন, ব্যবসায়ীদের হয়রানির পেছনে কারা যুক্ত ছিলেন তার কিছু বিবরণ বেরিয়ে এসেছে সামপ্রতিক অনুসন্ধানে। এ ছাড়া ২০০৮-এর নির্বাচন কেমন ছিল? কীভাবে চার কুশীলব জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারী দেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছিলেন তাও জানা গেছে এই অনুসন্ধানে। ২০০৪ সন থেকে রাজনীতির অস্থিরতা শুরু হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলে। দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা ঘটে। সামগ্রিক পরিস্থিতির পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। পশ্চিমা দুনিয়ায় ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। বলা হয়, বাংলাদেশে এখন সন্ত্রাসবাদের উর্বর ভূমি। একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলার ঘটনাও ঘটে। জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর আনুষ্ঠানিক উত্থান হয়। এতে প্রতিবেশী দেশে অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা মনে করে, এর পেছনে সার্কভুক্ত একটি দেশের যোগসূত্র রয়েছে। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণে প্রতিবেশী বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে- এটা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে প্রচার করতে থাকে। এতে বিদেশিদের মধ্যে বিএনপিবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়। ২০০৬ সনের শেষদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। বায়তুল মোকাররমের কাছে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার উল্লাসের নৃত্য করা হয়। তখনই মাইনাস টু ফর্মুলা সামনে আসে। পশ্চিমা দেশগুলো এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস ও ইইউ প্রতিনিধিরা সরাসরি মাইনাস টু ফর্মুলা নিয়ে এখানে সেখানে আলোচনায় লিপ্ত হন। বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। তিনি জেনারেল মাসুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এতে করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় দু’জনের মধ্যে। জেনারেল মাসুদ তখন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। সরকার পদ্ধতি নিয়ে রাজপথ তখন উত্তপ্ত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। অনুসন্ধান বলছে, পরিকল্পিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণা করা হয়। বিচারকদের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।
এতে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন হাসিনা ও তার মিত্ররা। বিদেশি কূটনীতিকরা বিরক্ত হন। নানাভাবে পরিস্থিতি উস্কে দেয় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা গোটা পরিস্থিতিকে বেসামাল করে দেয়। শেখ হাসিনা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এর পেছনেও গোয়েন্দাদের হাত ছিল। বিএনপি’র ভেতরেও সংস্কারপন্থিদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বে এলডিপি গঠনেও গোয়েন্দাদের মদত ছিল। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নেন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও তার সহযোগীরা। এরপরেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। পরিণতিতে আসে ওয়ান-ইলেভেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট (অব.) শেখ মামুন খালেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের চৌধুরী ও মেজর (বরখাস্ত) মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরী এ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকার গঠনের পেছনে অন্তত আটজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন জেনারেল মইন, জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, রিয়ার এডমিরাল এম হাসান আলী খান, এয়ার ভাইস মার্শাল শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং মেজর জেনারেল (অব.) সাদেক হাসান রুমি। সামপ্রতিক অনুসন্ধানে এদের অবস্থান উঠে এসেছে। বিএনপি’র কতিপয় সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এর মধ্যে বিচারকদের বয়স বাড়ানো এবং ইয়াজউদ্দিনকে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করা। এসব ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। যদিও আগেই উত্তপ্ত ছিল রাজপথ। দৃশ্যপটে আসে সেনাবাহিনী। জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বঙ্গভবনে ইয়াজউদ্দিনকে হটাতে তিন বাহিনীর প্রধানরা হাজির হন। নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ট্যাংক বাহিনী নিয়ে ক্ষমতা দখলের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ব্রিগেডিয়ার আমিনও তখন বঙ্গভবনে। শেখ হাসিনা তখন মিটি মিটি করে হাসছেন। কিন্তু ক’দিন বাদেই তাকে সেনা কব্জায় নেয়া হয়। যদিও তার সঙ্গে জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারী, ব্রিগেডিয়ার আমিন কয়েক দফা বৈঠক করেন। বলা হয়ে থাকে, তার সম্মতিতেই ওয়ান-ইলেভেন আসে। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ওপর নির্যাতনের কাহিনী ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার বারী জানিয়েছেন, তিনি নির্যাতনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অবশ্য তিনি তখন সিটিআইবি’র পরিচালক ছিলেন।
ওদিকে সেনা তৎপরতায় স্থবির হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। টাস্কফোর্সের প্রধান জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে জাহির করতে থাকেন। ট্রুথ কমিশনের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা ছিল একটি ফাঁদ। এতে তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ চাউর হতে থাকে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন ছিল ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের অন্যতম পুঁজি। রাজনীতিবিদদের অনেক বিবৃতি মিডিয়াতে প্রচার করা হয়। কয়েকজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে থাকেন। প্রফেসর ইউনূস সরকার প্রধান হতে রাজি হয়েও হননি। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিয়ে তার সঙ্গে মতবিরোধ হয়। তারই পরামর্শে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হন। জেনারেল মইনের মধ্যে পুরো ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার ইচ্ছা জাগে। সহকর্মীদের বলতে থাকেন, এভাবে দ্বৈত শাসন চলতে পারে না। কোনো উপকারেও আসবে না। তাই তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ হয়। কিন্তু সহকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। উচ্চাভিলাষী আমিন এতে সায় দেননি। তার ইচ্ছা ছিল ক্ষমতা নেয়ার। মইন চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট হয়ে ফৌজি শাসনের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মাঝখানে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব ব্রিগেডিয়ার বারীকে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে মিলিটারি অ্যাটাশে হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার আমিন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে। প্রতিনিয়তই তিনি সেখানে যেতেন। এই যোগাযোগের কারণে তার সঙ্গে দূতাবাসের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রতিনিধির ভূমিকা ছিল অনেকটাই রহস্যজনক। আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা লক জানিয়েছিলেন সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হুমকির মুখে পড়বে। এই হুমকির কারণে সেনাবাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, উক্ত চিঠির ব্যাপারে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সমর্থন ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন ছিল। কেয়ারটেকার সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তার ভূমিকা নিয়েও সে সময় নানা প্রশ্ন উঠে। মইন ইউ আহমেদের ভারত সফর ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ঘোড়া ডিপ্লোম্যাসির কাছে মইন অনেকটা আত্মসমর্পণ করেন। নির্বাচনের দিকে যায় দেশ। তবে সেটা ছিল নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের ছক তৈরি হয় পশ্চিমা একটি দেশে। যেখানে বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সিঙ্গাপুরে গোয়েন্দাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে পার্শ্ববর্তী দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো। যদিও গ্রেপ্তারকৃত মামুন খালেদ নানাবিধ প্রশ্নের জবাবে তার ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পাঁচজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। তারা হলেন- তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মোহাম্মদ, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সিটিআইবি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন, তৎকালীন এমএসপি মেজর জেনারেল (অব.) আলমগীর কবীর ও এনএসআই-এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামস। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে নির্বাচনে মইন ইউ আহমেদ ডিজিএফআই’র সহযোগিতা নেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২৬২টি আসন লাভ করে। পক্ষান্তরে বিএনপি পায় মাত্র ৩০ আসন। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এমন ফলাফল হবে আগেভাগেই তা জানতে পেরেছিলেন। ২০০৮ সনের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই বিপুল পরিমাণ ব্যালট ছাপানো হয়। শুধু সামরিক কর্মকর্তা নয়, নির্বাচন কমিশনও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে। এর সঙ্গে যোগসাজশ ছিল দেশি-বিদেশি নানা মহলের।
খালেদাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, সেনাবাহিনীর শীর্ষ দুই কর্মকর্তা হঠাৎ দৃশ্যপটের বাইরে
কীভাবে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল তা সবার জানা। তবে কোথায় পরিকল্পনা হয়েছিল, কারা এর পেছনে জড়িত ছিলেন-নতুন এক অনুসন্ধানে তা বেরিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, উচ্ছেদ অভিযানের দিন সেনাপ্রধান ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল সেদিন কোথায় ছিলেন তা নিয়েও অপার রহস্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিকল্পিতভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আপিলের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়। সে জন্য ছুটির দিনটিই বেছে নেয়া হয়। শেখ হাসিনা কীভাবে এবং কোথা থেকে সরাসরি উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাও অনুসন্ধানে খোলাসা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়ার মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। একপর্যায়ে তা ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নেয়। যা হাসিনার কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে বহুবার। কিন্তু বেগম জিয়াকে কখনো কোনো বিষয়েই বিরূপ মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। হাসিনার আক্রোশের মাত্রা বেড়ে যায় বিশেষ করে ২০০৮ সনের নির্বাচনের পর। যে বাড়িতে বেগম জিয়া তিন দশকেরও বেশি সময় ছিলেন, সে বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করতে হাসিনা একবারও দ্বিধা করেননি। এই বাড়িতেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেড়ে উঠেছেন। তবে হাসিনা ভাবেননি উচ্ছেদের ফল কী হতে পারে। এখন হাসিনা বিদেশে নির্বাসিত, দিল্লির মেহমান। আর বেগম জিয়ার ছেলে তারেক রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এটাই কি নিয়তি! ২০০৯ সনের ৮ই এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে মইনুল রোডের বাড়ির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সেনানিবাস এলাকায় ইজারা দেয়া যায় না। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিশ জারি করা হয়। এ নিয়ে তখন শুরু হয় আইনি লড়াই। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করায় কয়েক দফা স্থগিতাদেশও দেন আদালত। একপর্যায়ে ২০১০ সনের ১৩ই অক্টোবর উচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন আদালত। বিচারপতি ছিলেন নাজমুন আরা সুলতানা এবং শেখ হাসান আরিফ। চিফ প্রসিকিউটর ছিলেন মাহবুবে আলম। ২০১০-এর ১৩ই নভেম্বর হাইকোর্টের দেয়া ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়। পরের দিন কোর্ট বসার কথা ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়াকে আপিলের কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। দিনটি ছিল শনিবার। আর এই ছুটির দিনকেই উচ্ছেদের জন্য বেছে নেয়া হয় খুব কৌশলে। যেন আদালতেও আপিল করতে যেতে না পারেন বেগম জিয়া।
উৎখাত কার্যক্রমের পরিকল্পনা করেন শেখ হাসিনা ও মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশও দেন তারা।
তদন্তে দেখা যায়-২০১০ এর ১২ই নভেম্বর সিজিএস লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুলের নেতৃত্বে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় কীভাবে উচ্ছেদ করা হবে, খালেদা জিয়াকে কীভাবে বাড়ি থেকে বের করা হবে- তা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা হয়। তদন্তে দেখা যায়, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে নেই। অনেক তত্ত্ব-তালাশের পর জানা গেল তারা বিদেশে। কিন্তু কেন? তারা তো সবকিছুর মধ্যেই ছিলেন।
সমন্বয় সভায় এএসইউ কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফিজ (অব.), তৎকালীন ডিজিএফআই’র শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর, তৎকালীন ডিএমও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহফুজুর রহমান, ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রেজওয়ান ও কমান্ডিং অফিসার সাদাত সেলিম উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে সেলিম পলাতক রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানে সেনানিবাসের চারটি গেটে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। বাড়ানো হয় গোয়েন্দা তৎপরতা। জেরায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল মামুন খালেদ এটা নিশ্চিত করেছেন। উচ্ছেদ অভিযানে মূল ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ, র্যাব সিও এবং এএসইউ। তখন র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন ডিআইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার। পরিচালক ইন্টেলিজেন্স মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও এডিজি কর্নেল (অব.) শামস এবং মহিলা পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিও ধারণ করেন এএসইউ ঢাকা শাখার কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফিজ।
আর এই উচ্ছেদ কার্যক্রম সরাসরি গণভবনে বসে প্রত্যক্ষ করেন শেখ হাসিনা।
যা জানালেন বারী: গত ৭ই মে মানবজমিন-এ প্রকাশিত ‘অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য, তারেক রহমানকে যেভাবে গ্রেপ্তার এবং অমানুষিক নির্যাতন করা হয়’ শীর্ষক সংবাদে নিজের বিষয়ে আসা তথ্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা পাঠিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। এক প্রতিবাদপত্রে সংবাদের একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমি এবং কর্নেল ফরিদ কখনোই এই ঘটনায় উপস্থিত ছিলাম না। উপরন্তু যখন পুলিশ বা টাস্কফোর্সের দ্বারা গ্রেপ্তারকৃতদের ডিজিএফআই’র জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে আসার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ডিজির অফিসে যাই এবং তাকে অবহিত করি। বললেন তিনি নিজেও তা জানেন না। তিনি এও বলেন যে, যার নির্দেশে এসব হচ্ছে সে একটা ফ্রাংকেনস্টাইন হয়েছে। সে নিজেকেও খাবে আমাদেরকেও খাবে।
তিনি বলেন, এ ছাড়া আমার নিয়োগ ছিল ডাইরেক্টর এফসিআইবি, আমি কোনোভাবেই সিটিআইবি’র কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। ডিজিএফআইতে নিজ কর্মকাণ্ড কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে পালন করা হয়। একমাত্র ডিজি, ডিজিএফআই সব ব্যুরোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞাত থাকেন এবং প্রয়োজনে তিনিই এক ব্যুরোর সঙ্গে অন্য ব্যুরোর সংযোগ করে দেন।
তিনি আরও বলেন, জরুরি অবস্থা চলাকালীন দায়িত্ববহির্ভূত কাজে ডিজিএফআই’র অংশগ্রহণের প্রতিবাদ করায় ২০০৮-এর মার্চ মাসে আমাকে সেনাসদরে বদলি করা হয় এবং পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে বদলি করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় আমাকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশে প্রত্যাবর্তন আদেশ জারি করে।
ঘটনার সময় দেশে ছিলাম না- মেজর (অব.) মনিরুল ইসলাম: ওদিকে অন্য এক প্রতিবাদপত্রে মেজর (অব.) সৈয়দ মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০০৭ সনের ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। ২০০৭ সনের ৭ই মার্চ বাংলাদেশে কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল উল্লেখ করে প্রতিবাদপত্রে তিনি বলেন, সিটিআইবিতে আমার নির্ধারিত পদ ছিল জিএসও-২ (অপারেশন)। এই পদের একমাত্র ও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশে তৎপর বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো মোকাবিলা করা। দেশীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তার, আটক বা জেআইসিতে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জিএসও-২ (অপস) পদের কোনো সম্পর্ক, এখতিয়ার বা ম্যান্ডেট ছিল না। ২০০৭ সনের ২৩শে নভেম্বর থেকে ২৫শে ডিসেম্বর পর্যন্ত পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবে অবস্থান করেন বলেও প্রতিবাদপত্রে উল্লেখ করেন মনিরুল ইসলাম।