রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো-কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়, কোনো নাগরিক আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো প্রতিষ্ঠান সংবিধানের বাইরে নয়। আধুনিক রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে ব্যক্তির শাসনের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সামপ্রতিক বাস্তবতা এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে, যা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র, প্রশাসনিক নৈতিকতা এবং সাংবিধানিক শাসনের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
সাবেক আইজিপি ও র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদকে ঘিরে উত্থাপিত পাসপোর্ট, সম্পদ, পরিচয় ও একাডেমিক যোগ্যতা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো যদি নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সেগুলোকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতির লক্ষণ, যেখানে ব্যক্তি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যায় এবং প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ব্যক্তির অধীনস্থ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘স্টেট ক্যাপচার’ (ঝঃধঃব ঈধঢ়ঃঁৎব), যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন ও সংস্থাকে জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
পাসপোর্ট বিতর্ক: প্রশাসনিক নজরদারির ব্যর্থতা নাকি নীরব সমঝোতা?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো-র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মহাপরিচালক এবং পরবর্তীকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ করতে পারেন?
এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুলের প্রশ্ন নয়। কারণ পাসপোর্ট একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র, যার প্রতিটি তথ্য যাচাই করার জন্য একাধিক প্রশাসনিক স্তর বিদ্যমান। একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে যেখানে সামান্য ভুলও নানা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কীভাবে ভিন্ন পরিচয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ করেন-এই প্রশ্নের উত্তর জাতির জানা প্রয়োজন। এখানে প্রশ্ন শুধু আবেদনকারীর নয়। প্রশ্ন হলো, যাচাইকারী কর্মকর্তা কোথায় ছিলেন? অনুমোদনকারী কর্মকর্তা কোথায় ছিলেন? তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছিল? রাষ্ট্রের কোন কোন স্তরে নিয়ম অকার্যকর হয়ে পড়েছিল? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য যে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ (ঈযবপশং ধহফ ইধষধহপবং) থাকার কথা, তা এখানে সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একজন ব্যক্তি একা কখনো আইনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না। তাকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা নীরব সহযোগিতা, ভয়, আনুগত্য অথবা সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক। ফলে অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু শুধু একজন ব্যক্তি হতে পারে না; বরং সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে, যা একজন ব্যক্তিকে কার্যত অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।
উচ্চশিক্ষার নৈতিক সংকট ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক
একইভাবে পিএইচডি সংক্রান্ত প্রশ্নও কেবল একজন ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, সত্যকে তার সুবিধামতো পরিবর্তন করা যায় না। একাডেমিক মানদণ্ড ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে না। যদি কোনো ব্যক্তির জন্য সত্য শিথিল করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতির জ্ঞানচর্চার ভিত্তি।
বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠান, যা জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক হিসেবে বিবেচিত, তার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গভীর। যদি অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে, কোনো ধরনের অনিয়ম, পক্ষপাত, তথ্য গোপন বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে অবহেলা ঘটেছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আনুগত্য মানে সত্যের প্রতি আনুগত্য; কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়।
ভয়ের সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তা
প্রকৃতপক্ষে এসব ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে সেগুলো দুর্নীতির চেয়েও বড় সংকেত বহন করে। এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক সংকটের লক্ষণ। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যের প্রতি নয়, ব্যক্তির প্রতি অনুগত হয়ে পড়ে। যখন নিয়ম সবার জন্য সমান থাকে না। যখন ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা বাস্তবতা তৈরি হয়।
এখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভয়ের সংস্কৃতি (ঈঁষঃঁৎব ড়ভ ঋবধৎ) কাজ করেছে, যার কারণে ক্ষমতার চূড়ায় থাকা অবস্থায় এই অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এই ধরনের নজির কোনো সুস্থ রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ এখানে প্রশ্ন একজন ব্যক্তির অপরাধের নয়; প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে কাজ করেছে? রাষ্ট্র কি তার নিজস্ব আইন, নিয়ম ও সংবিধানকে উপেক্ষা করেছে? রাষ্ট্র কি এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে কিছু ব্যক্তি কার্যত রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন?
আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করেছি-রাষ্ট্রকে ব্যক্তির অধীন করে ফেলার প্রবণতা। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবিধানিক কর্তৃত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের অনুসারী করে তোলার প্রবণতা। এর ফলাফল কখনোই শুধু একটি দুর্নীতির ঘটনা নয়; এর ফলাফল হলো রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং সৎ নাগরিকদের মধ্যে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক হতাশা তৈরি হওয়া।
আরও একটি প্রশ্ন আজ অনিবার্যভাবে সামনে আসে-একজন ব্যক্তি কতোটা ক্ষমতাবান হলে রাষ্ট্রের একাধিক প্রতিষ্ঠান তার উপস্থিতিতে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে?
যদি উত্থাপিত অভিযোগসমূহ সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত অনিয়মের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে-একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে একই সঙ্গে পাসপোর্ট অধিদপ্তর, প্রশাসনিক যাচাইব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, আইনশৃঙ্খলা কাঠামো এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে নিজের প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেন?
এটি কোনো ব্যক্তির অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ নয়; বরং রাষ্ট্রের দুর্বলতার প্রমাণ। কারণ একটি সুস্থ সাংবিধানিক রাষ্ট্রে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে না, প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যদি দেখা যায় যে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, নথি, পরিচয়, যাচাই এবং জবাবদিহি-সবকিছুই একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির উপস্থিতিতে নমনীয় হয়ে যায়, তাহলে সেটি আইনের শাসনের নয়; সেটি ব্যক্তিপ্রভাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ।
রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা ও জবাবদিহির সংকট
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল, প্রশাসনিক কাঠামো ছিল; কিন্তু রাষ্ট্র তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনি। এই বাস্তবতা একটি নির্মম প্রশ্ন উত্থাপন করে-রাষ্ট্র কি সত্যিই ক্ষমতাবান ছিল, নাকি কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্রের চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন?
একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে শুরু করে, যখন আইন ব্যক্তির জন্য পরিবর্তিত হয়, প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির প্রতি অনুগত হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। তখন সংবিধান কাগজে থাকে, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর হয় ব্যক্তির প্রভাব, ব্যক্তির নেটওয়ার্ক এবং ব্যক্তির ক্ষমতা।
বেনজীর আহমেদকে ঘিরে উত্থাপিত ঘটনাবলি তাই কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চরিত্রের এক কঠিন পরীক্ষা। এটি আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে-বাংলাদেশ কি আইনের রাষ্ট্র, নাকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা বাস্তবতার রাষ্ট্র? প্রতিষ্ঠান কি এখনো সংবিধানের অধীন, নাকি ব্যক্তির প্রভাবের অধীন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু একজন ব্যক্তির বিচার দ্বারা মিলবে না। উত্তর মিলবে তখনই, যখন রাষ্ট্র নিজের ভেতরের নীরব সহযোগী, সুবিধাভোগী এবং কর্তব্যে অবহেলাকারী প্রতিটি স্তরকে শনাক্ত করবে। কারণ রাষ্ট্রকে দুর্বল করে একজন ব্যক্তি নয়; রাষ্ট্রকে দুর্বল করে সেই ব্যবস্থা, যা একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সমকক্ষ-কখনো কখনো রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে রাষ্ট্রের শক্তি কখনো শুধু তার সেনাবাহিনী, পুলিশ বা প্রশাসনিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নৈতিক সার্বভৌমত্বে-অর্থাৎ জনগণের সেই বিশ্বাসে যে রাষ্ট্র ন্যায়বিচার করবে, সত্যকে রক্ষা করবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেবে না। ম্যাক্স ভেবারের ভাষায় রাষ্ট্র বৈধ বলপ্রয়োগের একমাত্র অধিকারী; কিন্তু সেই বৈধতার উৎস অস্ত্র নয়, জনআস্থা। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কার্যত রাষ্ট্রের নিয়মকে অতিক্রম করে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু আইন নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক সার্বভৌমত্ব।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র নয়, তার নৈতিক বৈধতা। জনগণ রাষ্ট্রকে মান্য করে কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, রাষ্ট্র সবার জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ করবে। কিন্তু যখন মানুষ দেখতে পায় যে, ক্ষমতাবানদের জন্য সত্য বদলে যায়, নিয়ম বদলে যায়, সুযোগ বদলে যায়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
উত্তরণের পথরেখা: কাঠামোগত সংস্কারের দাবি
অতএব, আজ প্রয়োজন শুধু একজন বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান নয়; বরং সেই সমগ্র প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অনুসন্ধান, যা একজন মানুষকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার সুযোগ দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন, প্রশাসনিক জবাবদিহি, তথ্যভাণ্ডারের সমন্বিত ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা এসবকে এখন রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা
রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সংঘটিত দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি বা প্রশাসনিক অনিয়ম সম্পর্কে যারা সাহসের সঙ্গে তথ্য প্রকাশ করেন, তাদের আইনগত, প্রশাসনিক এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হুইসেলব্লোয়াররা কোনো প্রতিষ্ঠানের শত্রু নন; বরং তারা সেই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক বিবেক। ভয়ের সংস্কৃতিতে সত্য নীরব হয়ে যায়, কিন্তু হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত হলে প্রতিষ্ঠান আত্মশুদ্ধির সুযোগ পায় এবং জবাবদিহি শক্তিশালী হয়। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের অনিয়ম বা দুর্নীতি উদ্ঘাটনের কারণে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যাতে চাকরিচ্যুতি, পদাবনতি, হয়রানি কিংবা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ‘তথ্য প্রকাশকারী সুরক্ষা আইন’-এর কঠোর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এর আরও শক্তিশালী সংস্কার জরুরি।
যারা দায়িত্বে থেকেও দায়িত্ব পালন করেননি, যারা নিয়ম জেনেও প্রয়োগ করেননি, যারা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার পরিবর্তে ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন, তাদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তির বিচার গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যবস্থার বিচার, যা তাকে আইনের ঊর্ধ্বে উঠতে দিয়েছিল।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাকে একটি নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে-রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, কোনো ক্ষমতাবানের নিরাপদ আশ্রয় নয়, কোনো কর্মকর্তার বিশেষাধিকারও নয়। রাষ্ট্র জনগণের, আর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ব্যক্তি নয়-আইন।
বাংলাদেশের সামনে আজ প্রকৃত প্রশ্ন বেনজীর আহমেদ কে, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো-কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা একজন বেনজীর আহমেদের উত্থান সম্ভব করেছিল? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় ক্ষমতাবানদের কতোটা ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং নির্ধারিত হয় ক্ষমতাবানদের কতোটা জবাবদিহির মধ্যে রাখা হয়েছে তা দিয়ে।
অতএব, আজকের দাবি কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা; কোনো ব্যক্তির পতন নয়, বরং ব্যক্তির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠানের পুনর্জাগরণ; কোনো সাময়িক বিচার নয়, বরং এমন এক রাষ্ট্র নির্মাণ যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি নিজেকে রাষ্ট্রের সমকক্ষ মনে করার সাহস না পায়।
কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন ক্ষমতা আইনের অধীন থাকে; আর গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন সবাই জানে-কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কেউই নয়।
লেখক: গীতিকবি, রাজনৈতিক চিন্তক