একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব আর কেবল রাষ্ট্রের সীমানা দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিচালিত হয় না। সীমানা পেরিয়ে পরিচালিত হয় সংযোগ (Connectivity), সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) এবং অর্থনৈতিক করিডোরের (Economic Corridor) মাধ্যমে। বৈশ্বিক যোগাযোগের এক মসৃণ মহাসড়কে দ্রুতবেগে ধাবমান আজকের পৃথিবী এবং পৃথিবীর প্রতিটি দেশ। পরিবর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে করিডোর একটি আলোচিত বিষয়, যা শুধু সড়ক নয়, রাষ্ট্রশক্তির বিন্যাসের নতুন ভাষা। সদ্য-প্রস্তাবিত কুনমিং করিডোর তেমনই একটি ইস্যু, যা দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনীতি তথা বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক ও দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যের নির্ধারক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা আর শুধু সীমান্ত, সেনাবাহিনী বা অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক করিডোর, সমুদ্রবন্দর, সরবরাহ শৃঙ্খল, রেলপথ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং জ্বালানি সংযোগই রাষ্ট্রশক্তির নতুন ভাষা। এই নতুন বাস্তবতায় ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। যে রাষ্ট্র বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র হতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় তার কৌশলগত গুরুত্বও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব নিছক একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতির নতুন সমীকরণের প্রতিফলন। যদি বিচক্ষণ কূটনীতি, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এটি এগিয়ে নেয়া যায়, তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়, বরং আঞ্চলিক সংযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ একই সঙ্গে ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর এবং আসিয়ান অঞ্চলের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সেতুবন্ধন। বহুদিন ধরেই এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তোলার আলোচনা চলছে। কুনমিং করিডোর সেই সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র কুনমিং বহু বছর ধরেই ভারত মহাসাগরের সঙ্গে দ্রুত সংযোগের বিকল্প পথ খুঁজছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ি বন্দর বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এই দুই বাস্তবতা একত্রিত হলে একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে, যা উৎপাদন, সরবরাহ শৃঙ্খল, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে নতুন গতি দেবে।
কিন্তু করিডোরের আলোচনা কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং আসিয়ানÑসবাই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব সুদৃঢ় করতে চাইছে। বঙ্গোপসাগর এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক অক্ষ। কারণ এই সাগরপথ দিয়েই পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন সুযোগ, তেমনি দায়িত্বও। কারণ বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে বাংলাদেশের অবস্থান এমন যে, এটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে স্বাভাবিক সংযোগ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই ভূ-অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে একটি ভূ-অর্থনৈতিক রাষ্ট্র (Geoeconomic State)-এ পরিণত হবে।
তবে করিডোরের সবচেয়ে জটিল অংশটি মিয়ানমার। বর্তমানে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্য, চিন অঞ্চল এবং উত্তর মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত সংঘাতপ্রবণ। যে করিডোরের মূল স্থলপথ এই অঞ্চল দিয়ে যাবে, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই টেকসই হবে না।
এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সামনে আসে। প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকটকে আমরা প্রধানত মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে এটি বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতারও একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা ছাড়া কুনমিং করিডোর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংযোগেরও পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামও এই আলোচনার বাইরে নয়। ঐতিহাসিকভাবে জাতিগত বৈচিত্র্য, সীমান্তসংলগ্ন অবস্থান এবং উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে অঞ্চলটি সংবেদনশীল। কিন্তু ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংযোগের মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। যদি অবকাঠামো উন্নয়ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে অঞ্চলটি সংঘাতের প্রান্তিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিসরে যুক্ত হতে পারে।
একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, এই করিডোর আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার, উন্নত আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতিকেও নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি করতে পারে। ফলে করিডোরকে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে দেখলে ভারতও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। পাকিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি ও স্থানীয় অংশগ্রহণের অভাব প্রকল্পটির অগ্রগতিকে জটিল করেছে। আফ্রিকার LAPSSET করিডোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে মেকং অঞ্চলের Southern Economic Corridor দেখিয়েছে, করিডোর তখনই কার্যকর হয়, যখন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল, কাস্টমস আধুনিকায়ন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সহজীকরণ সমান্তরালভাবে এগোয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-করিডোরকে কেবল ট্রানজিট সুবিধা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিকস, ডিজিটাল কাস্টমস, বহুমুখী পরিবহন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ কেবল পণ্য চলাচলের পথ হবে, কিন্তু মূল্য সংযোজনের সুযোগ অন্যরা নিয়ে যাবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে পরিপক্বতার পরিচয় দিতে হবে। করিডোরকে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার চশমায় দেখার পরিবর্তে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy)-এর আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সহযোগিতা করবে, কিন্তু কোনো শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হবে না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আজকের বিশ্বে সফল রাষ্ট্র সেই, যে নিজের ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব, যদি দূরদর্শী নীতি, দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে।
বাংলাদেশের সামনেও এখন তেমনই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপস্থিত। কুনমিং করিডোর বাস্তবায়িত হবে কি হবে নাÑসেটি সময়ই বলবে। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি নিজেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি সংযোগ-রাষ্ট্র (Connectivity State) এবং ভূ-অর্থনৈতিক কেন্দ্র (Geoeconomic Hub) হিসেবে গড়ে তুলতে প্রস্তুত?
উত্তরটি নির্ভর করছে সড়ক নির্মাণের ওপর নয়। বরং রাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং উন্নয়ন-দর্শনের ওপর। যদি বাংলাদেশ এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে পারে, তবে কুনমিং করিডোর কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প হবে না, বাংলাদেশের জন্য নতুন ভূরাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের সূচনা হবে। আগামী দুই দশকে বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে বাংলাদেশের অবস্থান তখন আর কেবল ভৌগোলিক পরিচয় বহন করবে না। বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে অর্থনীতি, কূটনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার এক নতুন সেতুবন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-কুনমিং করিডোরকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা একটি অবকাঠামো প্রকল্পের চেয়েও বড় কিছু। এটি নির্ধারণ করবে, আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ কি কেবল একটি ট্রানজিট রাষ্ট্র হয়ে থাকবে, নাকি একটি আঞ্চলিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও লজিস্টিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বিচক্ষণ কূটনীতি, বাস্তববাদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা গেলে এই করিডোর বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘সংযোগ-রাষ্ট্র’ (Connectivity State) এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।