বিশ্বের উদীয়মান নব-ভূরাজনীতিতে চীন সবসময়ে আলোচিত না হলেও উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের জন্য চীন একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। দক্ষিণ এশিয়ার এই বদ্বীপে ক্ষমতার পালাবদল যাই হোক না কেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের সুতোটি সবসময়ই এক সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা মেনে চলেছে। এই সম্পর্কের সূচনা ঢাকা থেকে হয়েছিল চীন দেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ১৯৫০ সালে মওলানা ভাসানীর চীন সফরের মাধ্যমে। যার পরিণতি নানা ঘটনাচক্র পেরিয়ে বিকশিত হয়েছে অত্যন্ত বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে। মওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এই চার নেতার নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ধারাবাহিকতা এবং বহুলাংশে রাজনীতি-নিরপেক্ষ ও উন্নয়ন-অভিমুখী।
সদ্য-স্বাধীন লাল চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অনেক আগেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চীনের সমতাবাদী সমাজ ও তাদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের গভীর অনুরাগী ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তার চীন সফরগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং তা ছিল দুই দেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরির প্রথম সূত্রপাত। ভাসানী তার আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক বিশ্বাসের আলোকে বুঝতে পেরেছিলেন, এই অঞ্চলে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে বেইজিংয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ মৈত্রী কতোটা জরুরি। তার সেই আদর্শিক দূরদর্শিতাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চীন-নীতির পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত স্থবিরতার কালক্রম অতিক্রম করে মওলানা ভাসানীর বপন করা বীজে রাষ্ট্রীয় মনোযোগ দেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালে তার হাত ধরেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন যে, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং ভারতের একমুখী প্রভাব বলয় থেকে বের হতে চীনের বিকল্প নেই। তিনি সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করেন। তার ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির প্রধান স্তম্ভই ছিল বেইজিং-মুখী হওয়ার মাধ্যমে উপমহাদেশের সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন।
নব্বইয়ের দশকে এবং পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে অর্থনৈতিক ও দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নে রূপান্তর করে। দেশ জুড়ে একের পর এক ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু’ নির্মাণ, বিদ্যুৎ খাত এবং শিল্পাঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের যে জোয়ার সূচিত হয়, তার শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল খালেদা জিয়ার শাসনামলেই। চীনকে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
জিয়া ও খালেদার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন দিগন্তের দ্বারপ্রান্তে। তার হাত ধরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন যুগে পদার্পণ করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তবতায় তার নীতি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও অর্থনীতি-কেন্দ্রিক। তিনি ঐতিহাসিক এই সম্পর্ককে কেবল ঐতিহ্যগত বা সামরিক বলয়ে না রেখে মেগা প্রজেক্ট, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ঊত) এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বে রূপ দিয়েছেন। বেইজিংয়ের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডঊঋ) মতো বৈশ্বিক মঞ্চে তার অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক চালকের আসনে বসতে চায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে ভূ-রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত পরিসর ছুঁয়ে ভূ-অর্থনৈতিক আন্তঃসংযোগের বিশালতায় উত্তীর্ণ করতে প্রয়াসী বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আমলে মওলানা ভাসানীর মাধ্যমে যে চীন-নীতি যাত্রা শুরু করেছিল, তা পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। খালেদা জিয়া বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অবকাঠামোগত উন্নয়ন গতিশীলতায় রূপান্তর করেন এবং তারেক রহমান একে সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করতে পারেন। যার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গভীরতা ও নিবিড়তা বাড়বে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।