চব্বিশ-এর গণ-অভ্যুত্থান স্বাধীন বাংলাদেশে বিরল এক ঘটনা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অতীতে সরকার পতনের নজির আছে, কিন্তু সরকার পতনের সঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ ব্যক্তির দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এর আগে ঘটেনি। শুধু শীর্ষ ব্যক্তিই নন, ক্ষমতাসীন দলের প্রায় সব শীর্ষ নেতার আত্মগোপনে যাওয়া, গ্রেপ্তার বা বিদেশে পালিয়ে থাকার ঘটনাও এর আগে ঘটেনি। ’২৪-এর বিরল এই আন্দোলনের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কী আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে? দলটি কি ফের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে? দেশের রাজনীতিতে- এই প্রশ্নই এখন সবার মুখে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ফ্যাসিবাদী শাসনের মাধ্যমে রাজনীতি ও প্রশাসনিক গতিধারা পাল্টে দিয়ে সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েম করে আওয়ামী লীগ যে জনরোষ তৈরি করেছিল এর জেরেই শোচনীয় পতন ডেকে আনে দলটির জন্য। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এমন এক পতন দেখে দলটি যেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারার মতো কোনো রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছেন না নেতারা।
টানা দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে সর্বময় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ভেবেছিলেন তারা অনেকটাই অজেয়। বিরোধী দলগুলোকে মামলা, হামলা ও ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা রাখার কৌশল আওয়ামী লীগ এতটাই রপ্ত করেছিল যে, তাদের সেই ভাবনাও অমূলক ছিল না। কিন্তু রাজনীতিতে যে শেষ কথা নেই- সেটাই বড় হরফে প্রমাণ করে দিয়ে যায় ’২৪-এ ছাত্র-জনতার আন্দোলন। টানা শাসনে থাকা আওয়ামী লীগের দমন- পীড়নের মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন একটা গৎবাঁধা অবস্থায় চলে গিয়েছিল। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল চরম হতাশা। এমন পরিস্থিতিতে ফিনিক্স পাখির মতো রাজনীতিকে জাগিয়ে তুলে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। যে আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখে খাদের কিনারে দাঁড়ানো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই।
ওই আন্দোলনে অতীতের কৌশল প্রয়োগ করতে গিয়ে চরম ভুল করে আওয়ামী লীগ। অতি দমন- পীড়ন এক পর্যায়ে গণহত্যায় রূপ নেয়। শেষ ধাপের টানা ৩৬ দিনের প্রবল এবং নজিরবিহীন আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে শত শত মানুষকে। জাবির, রিয়া গোপের মতো নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যু আওয়ামী লীগেরও অনেকের চোখের কাঠের চশমা খুলে দিয়েছিল। রংপুরে আবু সাঈদের বুকে গুলি করার দৃশ্য অনেক ছাত্র-যুবাকে পথে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মুগ্ধ ওয়াসিমদের নির্মমভাবে হত্যার দৃশ্য দেখে দলমতনির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। প্রবল আন্দোলনে সর্বগ্রাসী দমন-পীড়নে এক যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সারা দেশে। যুদ্ধের মতোই ঘটে হতাহতের ঘটনা।
স্বাধীনতার পর কোনো সরকারের হাতে এত মানুষ হতাহতের ঘটনা আর ঘটেনি। এই গণহত্যার দায় নিয়েই শেষতক সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে মন্ত্রী- এমপিদের পালাতে হয়েছে। দলের নেতাদের ঘর ছেড়ে, দেশ ছেড়ে
আত্মগোপনে যেতে হয়েছে। দেশে থাকলেও পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চললো। এই সময়ে দলটির পালিয়ে যাওয়া নেতাদের কেউ আর দেশে ফেরার সাহস করেননি। যারা দেশে ছিলেন তাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি। কেউ কেউ আত্মগোপনে। যারা প্রকাশ্যে আছেন তারাও রাজনীতির আশপাশে নেই। এককথায় আওয়ামী লীগ করলেও এখন নিজ এলাকায় কেউ আর প্রকাশ্যে একথা বলতে পারছেন না। গত দুই বছরে এই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। দলটির নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে নেতাকর্মীরা জামিন নিয়ে মুক্ত জীবনে ফেরার সুযোগ পেতে পারেন। আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু তাদের এই প্রত্যাশাও এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সামনে ’২৪-এর গণহত্যার বিচার করা অন্যতম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করে দলটি নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনবে- এমনটা ভাবার সুযোগ কম। বিচারিক প্রক্রিয়া এগোলে আওয়ামী লীগের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই দণ্ডিত হবেন এমনটা বলা হচ্ছে। গণহত্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিচারবহির্ভূত হত্যায় জড়িত নেতা, সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের বিচার হলে বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে সামনে এগোতে পারবে না দলটি।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ এখন কী করছে, কী করতে চায়, তাদের সামনে কৌশল কী এটি জানবার চেষ্টা করছেন খোদ দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। কিন্তু তারা কোনো পরিষ্কার বার্তা পাচ্ছেন না। কারণ যেসব বিকল্প এখন দলের নেতৃত্বের সামনে রয়েছে তার কোনোটিই ব্যবহার করে খুব সহসা রাজনীতিতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সুযোগ দেখছেন না তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে গণহত্যার জন্য সবার আগে ক্ষমা চাইতে হবে। এর দায় নিতে হবে। এরপর আইনি ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর বাইরে বর্তমান কৌশলে এগোলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা সহজ হবে না। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চরম সংকটময় পরিস্থিতিতেও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা নেতৃত্ব নিয়ে নতুন কিছু ভাবছেন না। অতীতের মতো পরিবারকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে তিনি এখনো নেতৃত্ব আঁকড়ে আছেন। বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। অনেকে ভেবেছিলেন পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পরিবর্তন আসতে পারে। একটা সময় বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনাও ছিল। সাবের হোসেন চৌধুরী, সেলিনা হায়াৎ আইভী, সোহেল তাজের মতো নেতাদের নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল।
সময়ে সময়ে শেখ হাসিনা নিজেই এসব বিকল্প আলোচনা ও গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছেন। গত জানুয়ারিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, তার মা শেখ হাসিনা হয়তো আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না। তিনি জানান, শেখ হাসিনা অবসর নিতে চেয়েছিলেন এবং এটিই ছিল তার শেষ মেয়াদ। ‘হাসিনা যুগের অবসান’ প্রসঙ্গে জয়ের মন্তব্য ছিল, ‘সম্ভবত, হ্যাঁ।’ যদিও জয়ের সেই বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা ভারতীয় মিডিয়ায় একাধিক সাক্ষাৎকারে নিজের নেতৃত্ব ছাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। ‘দেশে এবং জনগণের সঙ্গে থাকতে চান’- এমন কথা বলেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা সেখান থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমসহ নানাভাবে নেতাকর্মীরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও ঝটিকা মিছিল করতেও দেখা গেছে। কিন্তু এসব কর্মসূচি দলটির রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কিছু নেতাকর্মী নতুন করে বিপদে পড়ছেন। গ্রেপ্তার, মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। দলটির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন এভাবে বিক্ষিপ্ত কর্মসূচি দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী একটি সরকারের কিছুই করা যাবে না। রাজনীতিতে ফিরতে হলে অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, অনুশোচনা করতে হবে। একইসঙ্গে নেতৃত্বে সংস্কার আনতে হবে। এর বাইরে পুরনো কায়দায় আন্দোলন করে ফেরার সুযোগ কম।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সর্বশেষ কিছুটা উত্তাপ তৈরি হয়। দলটির নেতাকর্মীরা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামতে পারেন- এমন শঙ্কায় সরকার সতর্কতা জারি করে। ৬টি জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। কোথাও কোথাও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ঢাকায় ২৩শে জুন নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এই কড়াকড়ির কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আর কোথাও নামতে দেখা যায়নি। অনেকটা নীরবেই চলে যায় তাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রলীগকে।
নির্বাচনে বিপুল সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন দেয়া হয়। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। এরপরও সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করার চেষ্টা করছেন। এসব মিছিল থেকে গ্রেপ্তার বা মিছিলের ছবি দেখে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে।
দলটির নেতারা ধারণা করেছিলেন নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা তার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং আওয়ামী লীগ কর্মসূচির নামে যেসব চেষ্টা করছে তা দলটির রাজনৈতিক দৈন্যতাই প্রকাশ করছে বলে খোদ অনেক নেতাকর্মীই মনে করছেন। তাদের মতে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে আলোচনায় থাকতে পারলেও রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে না। বরং নতুন করে কিছু নেতাকর্মী বিপদে পড়বেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে দলটিকে আরও বহু বছর এমন পরিস্থিতি বয়ে বেড়াতে হবে। খুব সহসা রাজনীতি আর নির্বাচনে অংশ নেয়ার অবস্থা তৈরি হবে না। এর বাইরে যদি দলে সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়, অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া হয়, নতুন নেতৃত্ব বেছে নেয়া হয়- তাহলে হয়তো নতুন কোনো সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ নিতে গেলে দলের নয়া মেরূকরণও তৈরি হতে পারে। অতীতের মতো বিভক্তি বা ভাঙন দেখা দিতে পারে। বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সামনে আওয়ামী লীগ পুরনো পথে হাঁটবে নাকি নতুন কোনো পথ ধরে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেবে- এটাই এখন দেখার বিষয়।