সত্যিই এমন তো কথা ছিল না। যেমনটি বিগত ৫৫ বছর দেশকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ আর বিপক্ষ শক্তির নামে অরাজকতা, সহিংসতা, হিংসা, প্রতিহিংসা জাতি দেখেছে। এই একটি ইস্যুকে ঘিরে জাতিকে মুখোমুখি করে রাখা হয়েছে। আর এর ফায়দা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতনের পর জাতি আরেক ইস্যুর সামনে পড়ে। আর সেটা হলো- জুলাই যুদ্ধ। এই জুলাই যুদ্ধকে পুঁজি করে একটি বলয় তৈরি হয়। এ বলয়টি বাংলাদেশটাকে তাদের কব্জায় নিয়ে নেয়। দেশের মানুষ জুলাই আন্দোলনে তাদের পাশে ছিল। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ছাড়া সকল দল তাদের পাশে ছিল। কিন্তু জুলাই যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারা এটা প্রথম প্রথম প্রায় অস্বীকার করলেও পরে মৌন সমর্থন দেয়।
আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ কার্ডের মতো তারাও জুলাই যুদ্ধ কার্ড নিয়ে মাঠে নামে। দেশের সকল মানুষ তাদের নিয়ে গর্ব করে। তারা বনে যান ন্যাশনাল ফিগারে। জুলাইযোদ্ধা শুনলেই মাথা নুইয়ে যায়। তারা দেশের হিরো। তারা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখতে থাকে। একদিন এই জুলাইযোদ্ধারাই হবে দেশের নিয়ন্ত্রক। দেশ এগিয়ে যাবে তরতর করে। দেশে আর কোনোদিন বিভাজনের রাজনীতি কায়েম হবে না। একদল আরেক দলকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেবে না। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সব আশাই নিরাশায় পরিণত হয়। অন্যদিকে জুলাইযোদ্ধারা সেই কার্ড আঁকড়ে ধরে। শুরুতেই তারা ভুল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেয়। শুধু যোগ দেয়া নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বঙ্গভবনে বসে অন্তর্বর্তী সরকারে কারা আসবে, জুলাইযোদ্ধাদের কয়জনকে সরকারে জায়গা করে দিতে হবে- এসব নিয়ে আলোচনা করে। রীতিমতো বার্গেনিং করে। শেষ পর্যন্ত প্রথমে তিনজন ও পরে একজন সরকারে যোগ দেয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই সরকারে থাকা এক উপদেষ্টা চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
শুধু তাই নয়, তার পিএসও চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া অন্যদের নিয়েও নানা বিষয়ে বিতর্ক বড় হতে থাকে। এ বিতর্কের মাঝেই জুলাইযোদ্ধারা নতুন দল গঠন করে। যার নাম ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি। সংক্ষেপে এনসিপি। প্রশ্ন হলো-দল করা কি এত জরুরি ছিল? আরও কিছু সময় কি অপেক্ষা করা যেতো না? এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে এ সময়ে দল করাতে সমস্যা কি? সমস্যা হলো দল করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রতি আমজনতার যে ভালোবাসা, সহানুভূতি, শ্রদ্ধা তা ভাগ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা তাদের ওপর থেকে অনেকেই সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কেন এমন হলো? কারণ আমজনতা চেয়েছিল তারা প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশ পুনর্গঠনে চাপে রাখবে। অতীতের সকল জঞ্জাল সাফ করবে অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে। কিন্তু কিছুই হয়নি। বরং নতুন দল করায় তাদের নজর অন্যদিকে সরে গেছে। তাদের মাঝে বাসা বেঁধেছে সরকার গঠনের ইচ্ছা। আর সরকার কিংবা সরকারের বাইরে এনসিপি’র নেতারা দল গুছানো, কীভাবে সরকারে যাওয়া যায় তা নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া সে সময় মব কালচার সৃষ্টি করে দেশে এক নতুনমাত্রা যোগ করে জুলাইযোদ্ধারা। আরেকটি ভুল করে তারা। সেটি হলো- কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। প্রতি জেলায় ডিসি অফিসকে তাদের নিজেদের অফিস বানিয়ে ফেলে। তাদের কথায় ডিসি-এসপিদের চলতে হয়েছে। জনগণ এসব দেখে ভীত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। আবার এনসিপি’র কেন্দ্রীয় নেতা গিয়ে তাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনেন। মানুষ বলতে থাকে ‘যেই লাউ সেই কদু’। শুধু তাই নয়, মামলা বাণিজ্যেও তাদের নাম জড়িয়ে পড়ে। যতই দিন যেতে থাকে ততই দুর্নামের তকমা লাগতে থাকে কপালে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বেও তাদের চেষ্টা ছিল তীব্র। সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাদের দিকে এমন অভিযোগের তীরও ছুড়ে দেন। সংসদের কথা যখন এলোই তখন এটাও বলা দরকার নির্বাচনের আগে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। একবার বিএনপি’র সঙ্গে জোট আরেকবার জামায়াতের সঙ্গে জোট করার তোড়জোড় দেখেছে দেশবাসী। এর আগে তিনশ’ আসনেই তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার ঘোষণা দেয়। মনোনয়নপত্র বিক্রিও হয়। এক রিকশাচালকও মনোনয়নপত্র কিনে আলোচনায় আসেন।
সবচেয়ে বড় খেলা দেখায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকে। যে জুলাই সনদের জন্য এতকিছু করলেন জুলাইযোদ্ধারা। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিশাল আয়োজনে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। যে জুলাই সনদে বিএনপি সবচেয়ে বেশি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল সেই বিএনপিও গিয়ে হাজির হয়। কিন্তু সে অনুষ্ঠান বয়কট করে এনসিপি। তবে কোনো কারণ উল্লেখ না করে তারা বুঝেশুনে স্বাক্ষর করবেন বলে তখন জানিয়েছিলেন। অবশ্য নির্বাচনের পর তড়িঘড়ি করে গিয়ে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। অতিকথনও তাদের একটি অভ্যাস। দেশের মানুষ অতিকথন পছন্দ করেন না। যেটি তাদের অনেক নেতা করছেন। অনেক নেতার কথায় মাধুর্যতার লেশমাত্র দেখা যায় না। তারা মঞ্চে দাঁড়ালেই আক্রমণাত্মক কথা বলেন অন্য দলকে বিশেষ করে বিএনপিকে টার্গেট করে। এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না।
জুলাই আন্দোলন কিংবা বিপ্লবের পর দেশ তো ভিন্নধারায় চলার কথা। দলে দলে বিভক্তি, হিংসা, প্রতিহিংসা তো মাটির নিচে চাপা পড়ার কথা ছিল। অন্য এক বাংলাদেশ উপহার দেয়ার লক্ষ্যেই তো জুলাই বিপ্লব। যে বিপ্লবের ঢেউয়ে ভেসে গেছে সকল অন্যায়, অনিয়ম আর অবিচার। স্বৈরশাসনের তখতে-তাউস কেঁপে উঠেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভেবেছিল এ স্বৈরশাসন থেকে বাংলাদেশ কোনোদিনই মুক্তি পাবে না। কিন্তু জুলাইযোদ্ধারা দেশের মানুষকে মুক্ত করে দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ নেয়ার সুযোগ করে দেয়। তাদের মাধ্যমে যখন সেই আগের চেহারা দেখা যায় তখনই মানুষ আঁতকে উঠে। বিষণ্ন হয়ে উঠে তাদের মন। নিরাশার চোরাবালিতে আটকে যায়।
যে কারণে এনসিপি ছেড়ে তাদের অনেক জনপ্রিয় নেতানেত্রী দল ত্যাগ করেন। তাদেরও কথা এনসিপি জুলাইয়ের স্পিরিট থেকে দূরে সরে গেছে।
যাই হোক, জুলাইকে স্মরণ করে রাখতে জুলাইযোদ্ধাদের সংগঠন এনসিপি জুলাই জুড়ে সারা দেশে কর্মসূচি ঘোষণা করে। ধারাবাহিক এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের সমাবেশ শেষে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা হয়। একপর্যায়ে বিএনপি-এনসিপি নেতাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়। হয় সংঘর্ষ। এতে এনসিপি’র শীর্ষ দুই নেতা সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আহত হন। অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে হামলা থেকে রেহাই পান। এখানে প্রশ্ন হলো-এই যে হামলা এটা কি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য? দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সভা-সমাবেশ, কর্মসূচি পালন করতে পারেনি বলেই তো জুলাই এসেছিল। তাহলে এখন কেন সেই একই রূপ দেখবে দেশবাসী? আবার কোনো দল কেন সভা-সমাবেশ থেকে অন্যদলকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেবে? তারা তাদের দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জনগণের সামনে তুলে ধরবে। সরকারের ভুলগুলো তুলে ধরবে।
গণতন্ত্র এ শিক্ষাই দেয়। হামলা, ব্যারিকেড দিয়ে কারও কর্মসূচিতে বাধা দিলে তো মানুষ বিগত দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথাই মনে করবে। হবিগঞ্জে যা হয়েছে তা যেন এখানেই সমাপ্ত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো যেন একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করে। তারা যেন এক টেবিলে বসে আড্ডায় মেতে উঠে। দেশকে এগিয়ে নিতে একসঙ্গে বসে পরিকল্পনা করে। এমনটাই আশা করে দেশবাসী। আর পেছনে ফেরা নয়, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিতে কথার লাগাম টেনে ধরতে হবে। অতিকথন বন্ধ করতে হবে। তাহলেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য স্বমহিমায় উজ্জ্বল হবে। আপামর দেশবাসী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করে। সবাইকে সহনশীল হতে হবে। ধৈর্যশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে কাউকে আক্রমণ করলেই বড় নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হলে অনেক গুণের মধ্যে ধৈর্য হলো অন্যতম একটি গুণ।