অনেকেই ধারণা করেছিলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে যে জট লেগেছে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে তার সুরাহা হবে; কিন্তু বিরোধী দলের একদফা লংমার্চের পরও সেটি হয়নি, হওয়ার লক্ষণও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সংসদে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধের সুযোগে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শক্তি ঢুকে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন।
বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার দাবি জানানোর পাশাপাশি জুলাই হত্যার বিচারকাজে ধীরগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তৃতায়ও ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনরাবির্ভাব ঠেকানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
বিরোধী দল মাঠে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও সংসদে নরমগরমেই কথা বলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সরকারি ও বিরোধী দল জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রশ্নে মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারলেও ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনরাগমন ঠেকাতে মোটামুটি কাছাকাছি অবস্থানে আছে।
আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করা গিয়েছিল, বিরোধী দল আনুপাতিকহারে সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি পদ পাবে। কিন্তু তাদের একটি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির পদ বণ্টন না হওয়ার পর বিরোধী দলকে জোরালো প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না। সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার বা নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সংসদীয় কমিটির ভূমিকাই প্রধান।
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সভাপতির পদ বণ্টিত হলে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পেতো। সনদ অনুযায়ী পদ বণ্টন নিয়ে গত ৩০শে আগস্ট সংসদে বিতর্ক হয়েছিল। সরকারি দল বলেছিল, বিরোধী দল সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে তাদের জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেয়া হবে। তবে বিরোধী দল ওই কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি। বিরোধী দল শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে।
সরকারি দলের দাবি, বর্তমান আইনে বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দিতে হবে, এ রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জুলাই সনদ অনুযায়ী আইন পরিবর্তন করা হলে তারা আনুপাতিকহারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিতে রাজি আছে। কিন্তু বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে কোনো নাম দেয়নি। তারা মনে করেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি সরকারি দলের ইচ্ছাই দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেবে, যা জুলাই সনদের পরিপন্থি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, অতীতে যেসব সংসদে ‘অনুগত’ বিরোধী দল ছিল, সেসব সংসদেও বিরোধী দল থেকে একাধিক সভাপতি পদ নেয়া হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত সংসদ সেই দৃষ্টান্তও অনুসরণ করতে পারলো না।
এবারে সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় আছেন, এরকম কয়েকজন সংসদ সদস্যকেও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেয়া হয়েছে, যা সংসদীয় রীতির পরিপন্থি। যিনি মালিক তাকেই বিচারকের আসনে বসানো হয়েছে। স্পিকার ও ৮ বারের সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করবে আইনসভার কাছে। নির্বাহী বিভাগ যদি নিজেই কমিটির সভাপতি হয়, তাহলে কার কাছে জবাবদিহি করবে? অতীতে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিজ মন্ত্রণালয়ের বাইরের কোনো মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হতে পারতেন না। এবারে সেটিও করা হয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ তাদের পাওয়ার কথা। এর সঙ্গে সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যোগ করলে বিরোধী দলের মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা।
বহু বছর ধরে সরকারি দলের কাছ থেকে ডেপুটি স্পিকার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছিল। অতীতে কোনো দল সেটা পূরণ করেনি। এবারে সরকারি দল প্রস্তাব দিলেও বিরোধী দল গ্রহণ করেনি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অজুহাত তুলে।
সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে জাতীয় সংসদে চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে আছে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬’ ও এসআরবি বা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটেলিয়ান বিল।
এসব বিল বা আইন নিয়ে জাতীয় সংসদে যে ধরনের বিতর্ক হওয়ার কথা, সেটা হয়নি। প্রথম তিনটি বিল পাসের আলোচনায় বিরোধী দল অংশই নেয়নি। ওয়াক আউট করেছে। শেষ বিলটির ‘মৃদু’ সমালোচনা করে বলেছে নতুন বোতলে পুরনো মদ। কিন্তু তারা এই প্রশ্নটি করেননি যে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ বাহিনী কেন ব্যর্থ হলো? কেন অন্য বাহিনী তৈরির প্রয়োজন পড়লো? কেন তাদের পূর্বাপর সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলো?
আলোচিত চারটি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি করা হয়েছে বৃদ্ধ ও অসহায় বাবা-মা’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এটি অতি মানবিক প্রশ্ন। বাবা-মা জীবিত থাকতে সন্তানদের কাছে জমি বা স্থাবর সম্পদ কেন হস্তান্তর করেন? কখনো স্বেচ্ছায় করেন, কখনো পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে। আগে থেকে লিখে না দিয়ে গেলে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি দখল করে নিতে পারেন-এমন আশঙ্কাও থাকে। আবার লিখে দেয়ার পরও সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। যেমন ধরুন-বাবা কন্যা সন্তানকে কোনো সম্পত্তি লিখে দিলেন, বিয়ের পর সেই সন্তানের বিয়ের পর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনও সম্পদ লিখিয়ে নিতে পারেন। তখন সম্পত্তি দাতার কিছু করার থাকে না।
সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাচ্যের দেশগুলোতে যত উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা, মারামারি-কাটাকাটি, পশ্চিমে তা দেখা যায় না। সেখানকার বাবা-মায়েরা জমি-সম্পদের চেয়ে সন্তানকে গড়ে তোলাকেই বড় সম্পদ মনে করেন। অনেক বিত্তবান ব্যক্তি সমুদয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জনগণের কল্যাণে দিয়ে যান; হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেন। কিন্তু প্রাচ্যের বাবা-মায়েরা ভাবেন সন্তানের জন্য বাড়ি-গাড়ি তাকেই করে যেতে হবে। সন্তানদের নামে সবকিছু লিখে দিয়ে অনেক বাবা-মা বিপদেও পড়েন। একাধিক সন্তান থাকলে কে বাবা-মাকে দেখবেন, তা নিয়ে ঝগড়াঝাটি চলতে থাকে।
প্রতি বছর ১লা অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে সংবাদমাধ্যমগুলোতে অসহায় বাবা-মা’র কাহিনী আমরা গণমাধ্যমে পড়ি। টেলিভিশনে দেখি। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমকে শেষ আশ্রয় হিসেবে নিলেও বিত্তবান সন্তানদের কাছে যান না বা যেতে পারেন না।
নতুন আইন করার পেছনে আরও একটি যুক্তি আছে। সম্পত্তি লিখে দেয়ার আগে সন্তানেরা প্রবল উৎসাহে বাবা-মা’র সেবাযত্ন করে থাকে। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর করার পর কেউ দেখে না। এই প্রেক্ষাপটে সবারই উচিত জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটির পক্ষে অবস্থান নেয়া। কিন্তু বিরোধী দল ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই ঠুনকো অজুহাত তুলে বিরোধিতা করেছে। ধর্মীয় বিধান প্রযোজ্য সম্পত্তি হস্তান্তরকারী মারা যাওয়ার পর। জীবিত থাকতে নয়।
বিরোধী দলের কেউ কেউ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, ২০১৩ সালের ভরণপোষণ আইন দিয়েও সম্পত্তি হস্তান্তরকারী ব্যক্তির সুরক্ষা হতে পারে। এটি হলো অনেকটা নিজের সম্পত্তি অন্যকে দান করে তার কৃপা ভিক্ষা করা। কোনো আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তি এটা করতে চাইবেন না।
আইনের ৫ (১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তার সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং সে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এই আইনের ব্যবহার আমাদের দেশে কদাচিত হয়।
অনেক বাবা-মা অত্যন্ত কষ্টে থাকলেও সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। আবার করলে যে প্রতিকার পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
আজ যে দলের সদস্যরা ধর্মের দোহাই দিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের বিরোধিতা করছেন, সেই দল পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের পারিবারিক আইন সংশোধনেরও বিরোধিতা করেছিল। তাদেরই সহযোগী কোনো কোনো দল ও সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, কমিশনের সদস্যদের বিচারও দাবি করেছিল। সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। আর এখন নারী ও পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিরোধী দলের কোনো কোনো নেতা সরকারের পতন ঘটানোরও আওয়াজ তুলেছেন। তাদের মনে রাখা উচিত যে, একটি নির্বাচিত সরকারের যতই ব্যর্থতা বা দুর্বলতা থাকুক, ছয় মাসের মাথায় আন্দোলন করে তার পতন ঘটানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশে অন্তত সে রকম নজির নেই। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একদফার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, একতরফা নির্বাচনের পর। সেটা সফল করতে বিরোধী দলকে আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যা পরিণতি পায় ছিয়ানব্বইয়ের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর। নব্বই দশকের সেই আন্দোলন সম্পর্কে জোটের নবীন সদস্যরা না জানলেও জামায়াতের নেতারা ভালো করেই জানেন। কেননা, তখন তারা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, বিরোধী দল এখনই লংমার্চের মতো কঠোর কর্মসূচি কেন নিলো, তাও যখন সংসদ অধিবেশন চলমান ছিল? সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নির্বাচনের আগে সব দলই সংসদকে কার্যকর করার কথা বলেছিল। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই বিরোধী দল দাবি আদায়ে সংসদের বদলে রাজপথকেই বেছে নিলো।