রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। সরকারি চিঠিপত্র, নথি ও দাপ্তরিক যোগাযোগে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর নামের আগে এসব সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে নিছক ভাষাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও দার্শনিক তাৎপর্যকে ছোট করে দেখা হবে। রাষ্ট্রের ভাষা কখনোই কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; রাষ্ট্রের ভাষার মধ্যেও ক্ষমতার দর্শন, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রকাশ পায়।
তাই ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ সংস্কৃতি থেকে সরে আসা একটি প্রতীকী পরিবর্তন হলেও এর মধ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতার সংস্কৃতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশ্ন হলো-এই পরিবর্তন কি কেবল সরকারি চিঠিপত্র ও নথির ভাষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যেও একটি নতুন দর্শনের সূচনা হবে?
প্রজাতন্ত্রের মৌলিক দর্শন হলো-রাষ্ট্র জনগণের এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চূড়ান্ত বৈধতার উৎস জনগণ। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের মালিক নন; কোনো পদাধিকারী রাষ্ট্রের প্রতীকী সমার্থকও নন। রাষ্ট্রীয় পদ জনগণের কাছ থেকে অর্পিত একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এখানেই ‘পদ’ ও ‘ব্যক্তি’র মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি অনুধাবন করা জরুরি।
পদটি সাংবিধানিক; ব্যক্তি সেই পদের অধিষ্ঠাতা। রাষ্ট্রপতির পদ রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীও একটি সাংবিধানিক পদ। কিন্তু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করেন, তিনি একই সঙ্গে একজন নাগরিক। তার ব্যক্তিগত মর্যাদা একজন নাগরিক হিসেবে অক্ষুণ্ন থাকবে; আর পদাধিকারী হিসেবে তার অতিরিক্ত মর্যাদা ও ক্ষমতার ভিত্তি হবে সংবিধান।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পদকে সম্মান করা হবে, কিন্তু পদাধিকারী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করা হবে না।
এই পার্থক্যটি হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ছায়ায় চলে যায়। তখন ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিকল্প হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তির সমালোচনা রাষ্ট্রের সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির ইচ্ছার অনুসারী হয়ে পড়ে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, ব্যক্তিপূজা এবং ক্ষমতার কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি।
অন্যদিকে, প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত ভাষা হলো নাগরিকের ভাষা। এখানে রাষ্ট্রীয় পদ মর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু পদাধিকারী ব্যক্তি সংবিধান ও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
এই জায়গায় আরেকটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন-রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংবিধানের অধীন। সংবিধান কোনো ব্যক্তির অনুগ্রহে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সৃষ্টি করে না; বরং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত করে। তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার সীমা আছে; সেই সীমার নাম সংবিধান।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্র নন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র নন। সরকার রাষ্ট্র নন। কোনো রাজনৈতিক দলও রাষ্ট্র নন। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, সরকার বা দলের সমার্থক নয়; রাষ্ট্র হলো জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংগঠিত রূপ।
এ কারণেই ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দের আনুষ্ঠানিক ব্যবহার থেকে সরে আসার বিষয়টি আমাদের রাষ্ট্রচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে-আমরা কি সত্যিই ব্যক্তির মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় পদের মর্যাদা থেকে আলাদা করতে পারছি?
কোনো ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন তিনি কোনো রাজকীয় বা অতিমানবিক মর্যাদার অধিকারী হন না; তিনি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা থেকে অর্পিত একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়, এটি জনগণের অর্পিত ক্ষমতা। ফলে ক্ষমতার সঙ্গে যেমন কর্তৃত্ব আছে, তেমনি তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত রয়েছে দায়িত্ব, সীমাবদ্ধতা ও জবাবদিহি। পদ যত উচ্চ, দায়িত্ব তত গভীর; ক্ষমতা যত বিস্তৃত, জবাবদিহিও তত কঠোর।
প্রজাতন্ত্রে ক্ষমতার মর্যাদা আসে ক্ষমতার প্রদর্শন থেকে নয়, ক্ষমতার সংযম থেকে। রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায় নাগরিককে ভয় দেখানোর মধ্যে নয়, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করার মধ্যে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়ে ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে।
সুতরাং ভাষার এই পরিবর্তনকে বৃহত্তর রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে প্রতীকী পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাবে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যক্তির প্রাধান্য বন্ধ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নয়, সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছে অনুগ্রহপ্রার্থী হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা নাগরিকের প্রভু নন; তারা জনগণের সেবক এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের ধারক।
তৃতীয়ত, ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যত বেশি, জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বেশি।
চতুর্থ, আইনের শাসনকে বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই অপরাধে ব্যক্তি ও পদভেদে ভিন্ন বিচার হলে প্রজাতন্ত্রের ভাষা যতই বদলানো হোক, ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে না।
রাষ্ট্রীয় দপ্তর হবে নাগরিকের অধিকার বাস্তবায়নের স্থান, ক্ষমতার প্রদর্শনের স্থান নয়।
এখানে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টিও নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল থাকবে, পদের সাংবিধানিক মর্যাদাও থাকবে; কিন্তু সেই প্রটোকল যেন ব্যক্তিকে অতি-মহিমান্বিত করে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি না করে।
এই সংস্কারের পরিধি শুধু নির্বাহী বিভাগের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বিচারালয়ের ভাষা ও আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। আদালত ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান-কোনো রাজদরবার নয়। তাই বিচারকদের উদ্দেশ্যে ‘মাই লর্ড’, ‘হুজ লর্ডশিপ’ কিংবা ‘হে প্রভু’ ধরনের সামন্ততান্ত্রিক ও প্রভুত্বসূচক সম্বোধন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক-সমতার দর্শনের সঙ্গে কতোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বিচারকের মর্যাদা তার ব্যক্তিগত মহিমা থেকে আসে না; আসে বিচারিক পদ, সংবিধান, আইন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থেকে। একজন বিচারক সম্মানের অধিকারী-কিন্তু তিনি প্রভু নন, নাগরিকের ঊর্ধ্বে কোনো সার্বভৌম সত্তাও নন। আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রতি সাংবিধানিক আনুগত্য থাকবে; কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন ব্যক্তিপূজা বা প্রভুত্বের ভাষায় প্রকাশ না পায়।
সুতরাং সরকারকে নির্বাহী বিভাগের ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ সংস্কারেই থেমে গেলে চলবে না। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে-নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগে-ক্ষমতার ভাষা, সম্বোধন ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যে সামন্ততান্ত্রিক, ঔপনিবেশিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবশেষ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
নির্বাহী বিভাগে ‘স্যার’ সম্বোধনের সংস্কৃতিকেও নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে এই সম্বোধন নিছক সৌজন্যের ভাষা না থেকে ক্ষমতার দূরত্ব ও প্রভুত্বের সংস্কৃতির প্রকাশ হয়ে ওঠে। নাগরিককে ‘স্যার’ বলার বাধ্যবাধকতার মধ্যদিয়ে যেন তাকে নিজের রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও অধস্তন বা অনুগ্রহপ্রার্থী হিসেবে অনুভব করতে না হয়।
কারণ প্রজাতন্ত্রে কোনো ব্যক্তি প্রভু নন; সবাই নাগরিক। রাষ্ট্রীয় পদ মর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু কোনো পদাধিকারীই জনগণের ঊর্ধ্বে নন।
আদালতের মর্যাদা রক্ষার সর্বোত্তম উপায় বিচারককে ‘প্রভু’ বানানো নয়; বরং বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করা। বিচারকের প্রতি সম্মান থাকবে, কিন্তু সেই সম্মানের ভাষাও হবে প্রজাতন্ত্রের ভাষা-আইন, সংবিধান ও নাগরিক মর্যাদার ভাষা।
শুধু ভাষা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের পথে ভাষার পরিবর্তন একটি সূচনা হতে পারে।
কারণ ক্ষমতার সংস্কার প্রথমে মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনে, তারপর রাষ্ট্রের ভাষায়, এরপর প্রতিষ্ঠানের আচরণে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তার প্রতিফলন ঘটে।
আমাদের সামনে তাই এখন একটি বড় প্রশ্ন-আমরা কি কেবল ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ বাদ দিতে চাই, নাকি ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ মানসিকতাকেও বিদায় জানাতে চাই?
শব্দের পরিবর্তন যদি মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটায়, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে।
আমাদের রাষ্ট্রকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা থেকে প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিকতায়, আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে জবাবদিহির সংস্কৃতিতে এবং প্রভুত্বের সংস্কৃতি থেকে নাগরিক মর্যাদার সংস্কৃতিতে নিয়ে যেতে হবে।
আর এখানেই ‘Moral Republic’ বা নৈতিক প্রজাতন্ত্রের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
নৈতিক প্রজাতন্ত্র হলো এমন রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার বৈধতার সঙ্গে নৈতিকতাও যুক্ত; যেখানে নাগরিকের মর্যাদা, ক্ষমতার সংযম ও জনকল্যাণই রাষ্ট্রের মূলনীতি।
স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক সুবিচার’-এই ত্রয়ী মৌলিক দর্শনকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
তাই ‘মহামান্য ও মাননীয়’ শুধু দু’টি শব্দকে বিদায় জানানো নয়; এটি হতে পারে একটি পুরনো ক্ষমতার মানসিকতাকে বিদায় জানানোর সূচনা।
ভাষায় প্রজাতন্ত্র, প্রতিষ্ঠানে প্রজাতন্ত্র এবং আচরণে প্রজাতন্ত্র-এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে প্রকৃত নাগরিকের রাষ্ট্র।
আর সেই রাষ্ট্রই হবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত Moral Republic- নৈতিক প্রজাতন্ত্র।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com