চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তা দেখে মনে হতে পারে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে সব ব্যবধান বুঝি ঘুচে গেল। যদি এমনটাই হয়, তাহলে শান্তিতে ভরে যাওয়ার কথা। বুধবার স্থানীয় সময় রাতে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট বেস অ্যানড্রুজে অস্বাভাবিক এক ঘটনা ঘটে। এ রাতে সেখানে ঝড়ো বাতাস বইছিল। তারই মাঝে সেখানে উপস্থিত হন ট্রাম্প। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সেখানে স্বাগত জানান। বিমান থেকে নামার সিঁড়ির কাছেই শি’কে অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প। দুই নেতা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। এরপর পাশাপাশি লালগালিচা ধরে হাঁটেন তারা। তবে পুরো আয়োজনের মধ্যে সামান্য ছন্দপতনও ঘটে। দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় একটি বিমান আকাশের উপর দিয়ে প্রচণ্ড শব্দে উড়ে যায়। আকস্মিক সেই শব্দে ট্রাম্পকে কিছুটা চমকে গিয়ে মুখ কুঁচকাতে দেখা যায়। তারপরও এই দৃশ্যপট এমন একটি বার্তা দেয় যে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশের দুই নেতা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যে একত্র হয়েছেন। সময়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একই সময়ে শিল্প খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খুব শিগগিরই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিদেশি কোনো অতিথি যুক্তরাষ্ট্রে গেলে সরাসরি বিমানবন্দর বা কোনো সামরিক ঘাঁটিতে সাধারণত ট্রাম্পকে উপস্থিত দেখা যায় না। অতিথির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় হোয়াইট হাউসে। কিন্তু শি জিনপিংকে স্বাগত জানাতে তিনি সরাসরি বেস অ্যানড্রুজে। এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষক মহল সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন অনেক সময় বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। শি’র এই রাষ্ট্রীয় সফরকে ১৯৮০’র দশকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের বৈঠকের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কারণ, ওই বৈঠকগুলো শেষ পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধকে শান্তিপূর্ণ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ট্রাম্প-শি বৈঠক তেমনটা ঘটাতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সংঘাতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ধারাবাহিকভাবে শুল্ক বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে চীনও মার্কিন পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এসব পদক্ষেপের কারণে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য ০.২ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও দুই দেশই নিজেদের শুল্কের তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দিয়েছে এবং বাণিজ্যযুদ্ধের একটি সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই যে বাণিজ্য যুদ্ধ তার কতোটা সমাধান হয়, তা এক বড় প্রশ্ন। তবে চীনের প্রেসিডেন্টকে অভিভূত করে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প।
তিনি শি’র সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তারা ব্যক্তিগত আলোচনার সময় তাইওয়ান, ইরান, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আলোচনা করেছেন। রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। ফলে সেখানে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে তা ‘রুদ্ধ’ অবস্থায়ই থাকবে, এমনটা মনে করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ট্রাম্পের আয়োজনে যোগ দিয়েছেন শি জিনপিং। অনেকেই মনে করছেন সম্প্রতি ট্রাম্প বেইজিং সফর করেছেন। সেখানে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন শি। তারই প্রতিদান দিচ্ছেন ট্রাম্প। কিন্তু এ কথা মাথা থেকে ঝেরে ফেললে চলবে না যে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাতে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবটা এবং উচ্চকক্ষ কংগ্রেসের ১০০ আসনের প্রায় অর্ধেক আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেই নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে চলে এসেছে। এমন অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে, তার ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে ক্ষমতার বাকি সময় সরকার চালাতে প্রচণ্ড চাপে থাকবেন ট্রাম্প। এ কারণে তিনি মার্কিনিদের বিস্মিত করতে, তাদের মন গলাতে ব্যতিক্রমী সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন। শি জিনপিংকে অভিবাদনও তারই অংশ হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শি জিনপিংকে যতই বন্ধু, গ্রেট পারসন বলে সম্বোধন করুন না কেন ট্রাম্প, দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর। এটা বড় কোনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে আসাকে বিঘ্নিত করবে।
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে দেয়া বক্তব্যে চীনের নেতা শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা তুলে ধরেন। শুরুতেই তিনি চীনের চীনামাটির বাসন সংগ্রহের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের বিরুদ্ধে চীনা ও মার্কিন বাহিনীর যৌথভাবে লড়াইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি একে ‘রক্ত ও আগুনের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর শি ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের কথা স্মরণ করেন। নিক্সন ও চীনের তৎকালীন নেতা মাও সেতুংয়ের সেই ঐতিহাসিক করমর্দন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিল। শি বলেন, নদীর প্রবাহ কখনো থামে না, তেমনি ইতিহাসও কখনো স্থির থাকে না। এরপর তিনি ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বলেন- আসুন, আমরা একসঙ্গে চীন-মার্কিন বন্ধুত্বের সুন্দর ফুলগুলোকে লালন করি। আসুন, আমরা একসঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় রচনা করি। তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে কাজ করতে হবে, আমাদের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে, সময়ের প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে এবং বৃহৎ দেশগুলোর পারস্পরিক সহাবস্থানের জন্য একটি নতুন পথ অনুসন্ধান করতে হবে। জবাবে নৈশভোজে ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট শি এবং ম্যাডাম ফ্যাং পেং-এর সম্মানে বিশেষ আয়োজন হিসেবে আমি এই কক্ষে উপস্থিত সবাইকে পেছনের ওই সুন্দর পর্দার ওপাশে, দরজার দিকে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে চাই। জায়গাটি আলোকসজ্জায় দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে’-ইস্ট রুমে একথা বলেন ডনাল্ড ট্রাম্প।
কিন্তু যতই তারা সম্পর্ক উন্নত করার কথা বলুন না কেন, ওই যে বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্ক আরোপ এ বিষয়ে এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত বড় কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে সিএনএনে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের সম্মেলন এমন কোনো চুক্তি দিয়ে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে না, যা মানবজাতিকে রক্ষায় ১৯৮০-এর দশকের পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস চুক্তির মতো ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সময়ে এমন কোনো উদ্যোগের মধ্যে এআই উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা আরোপ কিংবা দুই দেশ নিজেদের প্রযুক্তি খাত সম্পর্কে পারস্পরিক স্বচ্ছতা বাড়িয়ে আস্থা ও নিরাপত্তা তৈরির বিষয় থাকতে পারতো। তারপরও সম্মেলনটি সবাইকে চমকে দিতে পারে- এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সে ক্ষেত্রে চীনকে তার প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে যেতে হবে। কারণ, সাধারণত চীন বৈঠকের আগে দীর্ঘ ও জটিল কূটনৈতিক আলোচনা করে সম্ভাব্য ফলাফলগুলো নিশ্চিত করে নেয়।
বাস্তবে, তাই একটি ভালো ফলাফল বলতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যবিরতি আরও কিছু সময়ের জন্য বাড়ানো, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে স্থিতিশীলতা তৈরিতে নতুন উদ্যোগ এবং এআই, ফেন্টানিলের প্রবাহ, বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলার বিষয়ে ছোটখাটো কিছু উদ্যোগকে বোঝাতে পারে। কিন্তু প্রত্যাশা এত কম কেন- বিশেষ করে যখন গোটা বিশ্ব দেখছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে নেতৃত্ব নেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে? এআই ইস্যুটি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যকার দূরত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উভয় দেশই মনে করে, শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হতে পারে। একই সঙ্গে তারা বুঝতে পারছে, দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এর গুরুত্ব কতোটা। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যে (যাদের) এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে।’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে অর্থবহ কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপে দুই দেশই অনিচ্ছুক। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এআই প্রতিযোগিতায় চীন এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ফলে শিল্পের গতি দুই দেশ মিলে কমিয়ে দেয়ার কোনো চুক্তিতে বেইজিং রাজি হবে না।
উভয় পক্ষই বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চায়। কিন্তু একে অপরের কাছ থেকে ছাড় আদায় করার মতো যথেষ্ট প্রভাব বা চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও কোনো পক্ষের নেই। ইরান যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত বছর তিনি দেখেছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করার হুমকি দিলে তার বাণিজ্য উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, শি’র নিজের দেশে ক্ষুব্ধ ভোটার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তার ক্ষমতা অভ্যন্তরীণভাবে অত্যন্ত কঠোরভাবে সুরক্ষিত। তবে চীনের আবাসন খাতের সংকট এবং অর্থনৈতিক সমস্যাও তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।