ইউরোপের রাজপথে আবারো জমছে ক্ষোভ। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে প্রতিবাদের স্লোগান, আর চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্বেগ! এই দৃশ্যের কেন্দ্রে রয়েছে নতুন প্রজন্ম। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুত জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বৃহত্তর অসন্তোষের রূপ নিয়েছে। ইতালি, বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় এনেছে শিক্ষা এবং আবাসনের সংকটকে। তবে এসব আন্দোলন একই নেতৃত্বে পরিচালিত কোনো একক ইউরোপীয় আন্দোলন নয়; দেশভেদে তাদের দাবি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা। অভিন্নতা রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে। দেশে দেশে বেড়েই চলছে জনরোষ। রাজপথে নামছেন সাধারণ মানুষ। সেই বিক্ষোভ কখনো হয়ে উঠছে সহিংস। কিন্তু কেন?
প্রশ্ন হলো, কেন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমৃদ্ধ এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য পরিচিত ইউরোপের তরুণদের একটি অংশ আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন? কেন শিক্ষার অধিকার, একটি স্থিতিশীল চাকরি, সামর্থ্যের মধ্যে বাসস্থান কিংবা সম্মানজনক জীবনযাপনের মতো মৌলিক প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অভিযোগে তারা রাজপথে নামছে? আর এই ক্ষোভ মোকাবিলায় ইউরোপের সরকারগুলো কতোটা প্রস্তুত?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিক্ষোভের দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর বাইরে গিয়ে দেখতে হবে তরুণদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের আস্থার অবস্থা।
ফ্রান্স: শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে বৃহত্তর অসন্তোষ
১৭ই অক্টোবর ২০২৬, শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং আগের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠী এতে অংশ নেয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের অবনতিশীল পরিবেশ, বৈষম্য এবং জনসেবায় বিনিয়োগের ঘাটতি ছিল প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন দেশ জুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। একই দিন বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। ফলে বিক্ষোভের ব্যাপকতা যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে জননিরাপত্তা, পুলিশের ভূমিকা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও।
তবে এই আন্দোলনকে শুধু সহিংসতার ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর সামাজিক প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়। প্রতিবাদের প্রাথমিক পর্যায়ে প্যারিসের দরিদ্র ও শ্রমজীবী অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট এবং অবকাঠামোগত দুরবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ সামনে আসে। পরে তা শিক্ষা খাতের সীমা অতিক্রম করে জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্নে বিস্তৃত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ যখন মজুরি, আবাসন, জনসেবা ও অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে বিস্তৃত হয়, তখন বোঝা যায়, অসন্তোষের পেছনে একাধিক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সেই জমে থাকা ক্ষোভকে প্রকাশের উপলক্ষ করে তুলতে পারে।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে। তরুণদের একাংশের কাছে শিক্ষা আর শুধু ডিগ্রি অর্জনের পথ নয়; এটি ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে। আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছি, তখন তা পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য মুদ্রণে যাচ্ছে। বুধবার কাতার সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন বলেছেন, ২৪শে অক্টোবর শনিবার দেশ জুড়ে যে বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিকল্পিত রয়েছে, তাতে যারা “বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি” সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের তা করতে দেয়া হবে না। ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ বক্তব্যকে ‘বোকামিপূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন। ২২শে অক্টোবর সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য জানায়। ফ্রান্সে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর সহিংসতার জন্য কারা দায়ী, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ বিতর্কে অভিবাসী ও উন্মুক্ত সীমান্তনীতিকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। সোমবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপ সীমান্ত বন্ধ করে অপরাধীদের বের করে না দিলে মহাদেশটি ধ্বংসের মুখে পড়বে। ফ্রান্স ও ইতালির অস্থিরতার জন্য দেশগুলোতে আসা মানুষকে দায়ী করেন তিনি। তবে কাতার সফরে গিয়ে ম্যাক্রোন বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণে ফ্রান্সে দাঙ্গা হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিদেশি নেতাদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করলেও তিনি সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি। ফ্রান্সে বিক্ষোভে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরাও ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
ফরাসি রাষ্ট্রীয় সমপ্রচারমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ বলেন, ২০২৭ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরাসি রাজনীতির সমীকরণ অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সোশ্যালিস্ট, মধ্যপন্থি এবং প্রথাগত ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের সংকটে আছে। সেই শূন্যতা পূরণ করেছে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি এবং অতি বামপন্থি এলএফআই পার্টি। বলা যায়, ফরাসি রাজনীতি অতি বাম ও কট্টর ডানপন্থিদের বৃত্তে আটকে গিয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোনের রাজনৈতিক দল ও জোট থেকেও বড় কোনো প্রার্থী মাঠে নেই। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত সবগুলো জনমত জরিপেই বড় ব্যবধানে কট্টর ডানপন্থি আরএন পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী মারিন লো পেন এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বর্ষীয়ান বাম রাজনীতিবিদ জঁ-লুক-মেলনশো’র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস মিলেছে।
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা নিয়ে তিনি বলেন, চলমান ছাত্র আন্দোলন ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত বিক্ষোভগুলো মূলত প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোন দ্বিতীয় মেয়াদের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট এবং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের উদাহরণ।
জীবনযাত্রার ব্যয়: আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না খরচ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামপ্রতিক বিক্ষোভে একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে-দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর চাপ। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়। তরুণদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ তাদের অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন, কেউ সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন, আবার কেউ অনিশ্চিত বা স্বল্পমেয়াদি চাকরির ওপর নির্ভরশীল।
ইউরোনিউজের ১৯শে অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত খাদ্য ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের দাম ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি দেশে ন্যূনতম মাসিক মোট মজুরি দিয়ে কেনা যায় এমন খাদ্যের পরিমাণ কমেছে। তবে এই হিসাব কর ও বাসাভাড়ার মতো অন্যান্য ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করে না; ফলে এটি পরিবারের সামগ্রিক আর্থিক চাপের পূর্ণ চিত্র নয়।
এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেই বাজারদর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। দাম বাড়ার গতি কমতে পারে, কিন্তু পণ্য ও সেবার মূল্য উচ্চ অবস্থানে থেকে গেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। আয় যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে একজন কর্মজীবী তরুণের জন্য মাসের শেষে সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, নিয়মিত খরচ সামলানোও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এই চাপের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবার গঠন, স্বাধীনভাবে বসবাস, উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইউরোপের তরুণদের প্রতিবাদের তাৎপর্য এখানেই। তারা কেবল দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবি জানাচ্ছে না; তাদের অসন্তোষের মধ্যে এমন একটি প্রত্যাশাও রয়েছে যে কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক অবদান একজন মানুষকে অন্তত একটি স্থিতিশীল জীবন গড়ার সুযোগ দেবে।
আবাসন সংকট: স্বাধীন জীবনের পথে বড় বাধা
তরুণদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় কারণ আবাসন। ইউরোপের অনেক শহরে বাড়িভাড়া এবং বাড়ি কেনার ব্যয় তরুণদের সামর্থ্যের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মসংস্থান ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্রগুলোতে বাসস্থানের চাহিদা বেশি থাকায় শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীদের ওপর চাপ তৈরি হয়।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সামপ্রতিক বিক্ষোভে আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া এবং কম মজুরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রিসের এথেন্সসহ বিভিন্ন শহরেও শিক্ষার্থীরা সাশ্রয়ী আবাসন এবং শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। গ্রিসের একজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাসিক ১২০ ইউরোর আবাসন-সহায়তা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়ার অর্ধেকও মেটানো সম্ভব হয় না। এই বক্তব্য দেশটির সব শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে সহায়তার পরিমাণ ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধানের প্রশ্নটি সামনে আনে।
আবাসন সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকলেও অন্য শহরে থাকার ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। চাকরি পাওয়ার পরও আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়ায় চলে গেলে সঞ্চয়, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনার জন্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। আবার অনেক তরুণকে দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয়, যদিও তারা আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বাধীন হতে চান।
এখানে সমস্যাটি শুধু বাড়ির সংখ্যার নয়; কোথায় বাড়ি রয়েছে, কারা তা কিনতে বা ভাড়া নিতে পারছেন এবং আয়ের কতো অংশ আবাসনে ব্যয় হচ্ছে-এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থানের সুযোগ যেখানে কেন্দ্রীভূত, সেখানে সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে না পারলে তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই আবাসনকে কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ বা বাজারের বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার সামাজিক মাত্রা পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
শিক্ষা: সুযোগের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতার বাধা
শিক্ষা ইউরোপের সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা, পড়াশোনার ব্যয় এবং শিক্ষা জীবন শেষে চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা সেই ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
ফ্রান্সের সামপ্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষক সংকটের অভিযোগ ছিল অন্যতম সূচনা। শিক্ষার্থীরা শুধু তাৎক্ষণিক সুযোগ-সুবিধা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার মান এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বেলজিয়ামেও শিক্ষাব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ হয়েছে। অন্যদিকে গ্রিসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরা যোগ দিয়ে বিদ্যালয়ের অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা খাতের সমস্যা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন এর প্রভাব একটি প্রজন্মের ওপর পড়তে পারে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়তে পারেন। আবার উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরও উপযুক্ত চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে।
তবে সব শিক্ষার্থী একই অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছেন, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। ইউরোপের দেশগুলোর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোথাও সরকারি সহায়তার পরিধি বেশি, কোথাও শিক্ষার ব্যয় ও আবাসনসংক্রান্ত চাপ তুলনামূলক বেশি। তবু সামপ্রতিক প্রতিবাদগুলো দেখাচ্ছে, শিক্ষার সুযোগকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে না পারার আশঙ্কা বহু তরুণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, শিক্ষাকে কেবল বাজেটের একটি খাত হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা। আজকের শিক্ষার্থীর দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও জীবনমানের সঙ্গে আগামী দিনের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও জড়িত।
চাকরি আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ কতোটা নিশ্চিত?
তরুণদের অসন্তোষের আলোচনায় বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও সমস্যাটিকে শুধু চাকরি আছে কি নেই-এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কাজের ধরন, মজুরি, চুক্তির স্থায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও বিবেচনা করা জরুরি।
কেউ চাকরি পেলেও যদি আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে তার আর্থিক নিরাপত্তা সীমিত থাকতে পারে। আবার অস্থায়ী বা অনিশ্চিত কর্মসংস্থান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে তরুণরা শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও প্রত্যাশিত স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেন না।
এখানে একটি প্রজন্মগত প্রশ্নও রয়েছে। তরুণদের অনেকেই আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু সেই সুযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা কতোটা সম্ভব হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়লেও আবাসন, সঞ্চয় কিংবা পরিবার গঠনের মতো লক্ষ্য যদি ক্রমাগত দূরে সরে যায়, তাহলে ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রচলিত ধারণা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এই সংশয় রাজনৈতিক অসন্তোষেও রূপ নিতে পারে। কারণ, তরুণরা যখন মনে করেন যে, প্রচলিত নিয়ম মেনে পড়াশোনা, কাজ এবং কর প্রদানের পরও একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হচ্ছে না, তখন তারা নীতিনির্ধারকদের কাছে জবাবদিহি দাবি করতে পারেন।
অবশ্য সব সমস্যার সমাধান সরকারের একক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম, উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগ এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সরকার কীভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে, জনসেবার মান রক্ষা করছে এবং সুযোগের বৈষম্য কমাচ্ছে-তা রাজনৈতিক আস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবাদের অধিকার ও সহিংসতার প্রশ্ন
বিক্ষোভের পেছনে বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিযোগ থাকলেই আন্দোলনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। একইভাবে, কিছু বিক্ষোভকারীর সহিংস আচরণের কারণে সব অংশগ্রহণকারীর দাবি অগ্রাহ্য করাও যুক্তিসংগত নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
ফ্রান্সের ১৭ই অক্টোবরের বিক্ষোভে বহু মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার মান নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। একই সময়ে কিছু স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জনসম্পদ।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সহিংসতা মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার ক্ষতি করে এবং আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করে দিতে পারে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠলে তা জনসাধারণের আস্থা আরও দুর্বল করতে পারে। ফ্রান্সে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র ও বলপ্রয়োগ নিয়ে তদন্তের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
সুতরাং রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নয়; শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা, সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। একইভাবে, আন্দোলনকারীদেরও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং অন্যের অধিকার ও সম্পদের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে। যে সমাজে সরকার ও নাগরিক-উভয় পক্ষই গণতান্ত্রিক সীমারেখা মেনে চলে, সেখানে সংঘাত থেকে সমাধানের পথে যাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে।
রাজনৈতিক অনাস্থা: ক্ষোভের সুযোগ নিচ্ছে কারা?
সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন চাপ সৃষ্টি করে। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ দেশটির আর্থিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আসন্ন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইতিমধ্যে আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলো সরকারের নীতি ও বিক্ষোভ মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
সরকারি পক্ষ বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য উগ্র গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির সমালোচনা করেছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল আন্দোলনের পেছনে রয়েছে-এমন অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আন্দোলনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সহিংস ঘটনার দায়-এসব আলাদা বিষয়, যেগুলোর মূল্যায়নে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অনাস্থার একটি ঝুঁকি হলো, নাগরিকদের বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা পিছিয়ে গিয়ে বিতর্কটি দলীয় দোষারোপে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। তখন কে কার পক্ষে, কে কার বিপক্ষে? সেই প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে; অথচ আবাসন কতোটা সাশ্রয়ী, শিক্ষায় কীভাবে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কীভাবে রক্ষা করা হবে, এসব মূল প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়।
আরেকটি ঝুঁকি হলো, অর্থনৈতিক হতাশা থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে অভিবাসন, পরিচয় বা নিরাপত্তার প্রশ্নে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা। অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে বাস্তব রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যালয়ের অবস্থা কিংবা আবাসন সংকটের মতো জটিল সমস্যাকে কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন। বরং এতে সামাজিক বিভাজন বাড়ার আশঙ্কা থাকে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা তাই শুধু বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নয়; নাগরিকদের উদ্বেগ শুনে কার্যকর নীতি তৈরি এবং সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত।
ইউরোপ কি একই সংকটের মুখোমুখি?
ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও গ্রিসে সামপ্রতিক প্রতিবাদের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে মিল রয়েছে। কিন্তু এই মিলকে একক ইউরোপীয় আন্দোলনের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রতিবাদের ইতিহাস আলাদা।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের দাবি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পর্তুগালে আবাসন ও মজুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রিসে শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং শিক্ষায় বিনিয়োগের দাবি সামনে এসেছে। ইতালি ও বেলজিয়ামেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। অর্থাৎ, উদ্বেগের কিছু সাধারণ ক্ষেত্র থাকলেও সেগুলোর কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান দেশভেদে ভিন্ন।
এই পার্থক্য স্বীকার করেই বৃহত্তর প্রবণতাটি বোঝা সম্ভব। ইউরোপের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে না। অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে উন্নত রাষ্ট্রেও সামাজিক সংঘাত তৈরি হতে পারে। তরুণদের আন্দোলনকে তাই শুধু সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি এর ভিত্তিতে ইউরোপ জুড়ে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও অযৌক্তিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই প্রতিবাদগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে কোন সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
ইউরোপের সামনে কী?
ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শুধু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন বা বিক্ষোভ স্থল নিয়ন্ত্রণ করে সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উদ্বেগ দূর না হলে অসন্তোষ আবারো প্রকাশ পেতে পারে।
প্রথমত, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার ঘাটতি থাকলে সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ সংঘাত কমাতে সহায়ক হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আবাসনকে সামাজিক নীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সাশ্রয়ী ভাড়ার বাসস্থান, শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর আশপাশে আবাসনের সুযোগ বাড়ানো তরুণদের চাপ কমাতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে স্থানীয় বাস্তবতা, সরকারি অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর।
তৃতীয়ত, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব কোন আয়ের মানুষের ওপর কতোটা পড়ছে, তা বিবেচনা করে সহায়তা ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা দরকার। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
চতুর্থত, সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জনসেবার মান নিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে। সবশেষে, তরুণদের শুধু নীতির সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, নীতি প্রণয়নের অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তৈরি করা কঠিন।
ইউরোপের রাজপথে তরুণদের প্রতিবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। উন্নত অবকাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নিরাপত্তার ঐতিহ্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমস্যা মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে তরুণরা যখন মনে করেন যে, পরিশ্রম ও শিক্ষার বিনিময়ে প্রত্যাশিত নিরাপত্তা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে, তখন সেই হতাশা ব্যক্তিগত অসন্তোষের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
ফ্রান্সের বিক্ষোভ এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একই সময়ে ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশে প্রতিবাদ দেখিয়েছে, দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় এবং জনসেবার মান নিয়ে উদ্বেগ অনেক সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে এসব ঘটনাকে এক সূত্রে বেঁধে একক আন্দোলন বা অনিবার্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বুঝতে হবে। ইউরোপের সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু কীভাবে রাজপথ শান্ত রাখা যায়, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-কীভাবে তরুণদের জন্য শিক্ষা, কাজ, আবাসন ও সম্মানজনক জীবনযাপনের বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করা যায়। কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের উদ্বেগের জবাব দেবে এবং কীভাবে গণতান্ত্রিক সংলাপের মাধ্যমে সামাজিক বিভাজন কমানো সম্ভব হবে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে সরকারের নীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর। তরুণদের ক্ষোভকে কেবল বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলে তার পেছনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। আবার প্রতিবাদের নামে সহিংসতা ও জনসম্পদের ক্ষতিকে উপেক্ষা করলেও সমাধানের পথ সংকুচিত হবে।
ইউরোপের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো- প্রতিবাদের কারণগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ রক্ষা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা। কারণ, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু তরুণদের ব্যক্তিগত সংকট নয়; তা সমাজের অর্থনীতি, গণতন্ত্র এবং পারস্পরিক আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
রাজপথের এই ক্ষোভ ইউরোপের ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাবে, তা এখনই নির্ধারণ করে দেয় না। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দেয়, তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান কমানো এখন আর শুধু সামাজিক নীতির বিষয় নয়; এটি ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও বড় পরীক্ষা।