নিউ ইয়র্কের আকাশে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে। বাংলাদেশ কথা বলেছে। জাতিসংঘের মঞ্চে দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ বিতর্কের বক্তব্য ঘিরে ছিল কূটনৈতিক ব্যস্ততা। একের পর এক বৈঠক, উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সব মিলিয়ে সফরটি ছিল কর্মসূচিতে ঠাসা।
কিন্তু নিউ ইয়র্কে কয়েকদিন কাটিয়ে ফিরে আমার মনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরেছে, সেটি খুব সরল- বাংলাদেশ আসলে কী পেলো?
কারণ জাতিসংঘের বিশাল মঞ্চে একটি দেশের নেতা যত জোরালো বক্তব্যই দিন না কেন, কয়েক ডজন বৈঠক যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, কূটনৈতিক করমর্দন যত আকর্ষণীয়ই হোক, এসবের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় পরে।
চুক্তি হলে, সেটি বাস্তবায়ন হলে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এলে, বিনিয়োগ বাস্তবে এলে। কর্মসংস্থানের কথা উঠলে, কর্মসংস্থান তৈরি হলে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলা হলে, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হলে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি উঠলে, অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে।
নিউ ইয়র্কের আলো ঝলমলে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ঢাকায়, চট্টগ্রামে, কক্সবাজারে, গ্রামের মাঠে, কারখানায়, হাসপাতালে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিউ ইয়র্কের বক্তব্যের দূরত্ব কতোটা- সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বব্যবস্থা নানা সংকটে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য- 'Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All.’
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক আত্মপ্রকাশের গুরুত্ব আলাদা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪শে সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের বক্তব্য দেন। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে তার প্রথম ভাষণ। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু, রোহিঙ্গা, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। কিন্তু আমার চোখে জাতিসংঘের এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বক্তব্যের চেয়ে বক্তব্যের পরের প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হিসাবে নিউ ইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ-সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক।
বৈঠকগুলোর আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয় ছিল বলে সরকার জানিয়েছে। সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু কূটনীতিতে সংখ্যাই সব নয়।
১১টি দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এটি একটি তথ্য। কিন্তু সেই বৈঠকের ফল কী? কোন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হলো? কোথায় বিনিয়োগের দরজা খুললো? কোন বাণিজ্য বাধা কমলো? কোন জ্বালানি সহযোগিতা বাস্তবায়নের পথে গেল? কোন দেশ রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সফরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জবপড়াবৎু, Restoration, Reconstruction- ৩ আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে এসেছে।
অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের এই ধারণার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও যুক্ত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড ও ইউনিভার্সাল কার্ডের মতো পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির কথাও এসেছে। আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের সামনে এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার চেষ্টা।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ফ্যামিলি কার্ড কারা পাবেন? কৃষক কার্ড কীভাবে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও আয়কে প্রভাবিত করবে? স্বাস্থ্যকার্ডের সঙ্গে হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার সম্পর্ক কী হবে? স্টার্টআপ তহবিলের অর্থায়ন কীভাবে হবে? ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কীভাবে এগোবে? যুবকদের জন্য কতো কর্মসংস্থান তৈরি হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জাতিসংঘের মঞ্চে দেয়া কঠিন নয়, কঠিন হলো বাস্তবে দেয়া।
নিউ ইয়র্কে জলবায়ু প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি- সবই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি বাংলাদেশের কূটনীতিতে আবেগের বিষয় নয়; এটি বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সফরের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু কূটনীতির আসল পরীক্ষা হবে অর্থায়নে। বাংলাদেশ কতোটা জলবায়ু অর্থায়ন পাবে? কোন প্রকল্পে সেই অর্থ যাবে? কীভাবে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে?
যে মানুষ নদীভাঙনে ঘর হারিয়েছে, যে কৃষক লবণাক্ততার কারণে জমি হারিয়েছে, যে পরিবার ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে- তাদের জীবনে সেই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির প্রভাব কতোটা পৌঁছাবে? জাতিসংঘের মঞ্চে জলবায়ু ন্যায়বিচার চাওয়া এক বিষয়। সেই ন্যায়বিচারের অর্থ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়া আরেক বিষয়। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য এমন একটি ইস্যু, যেখানে কূটনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্ট। জাতিসংঘ সফরে রোহিঙ্গা সংকটকে উচ্চপর্যায়ে তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আলোচনায় নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের অবস্থান, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং টেকসই সমাধানও মিয়ানমারকেই কেন্দ্র করে হতে হবে। কিন্তু কক্সবাজারের বাস্তবতা আরও কঠিন। শরণার্থী শিবিরে বছরের পর বছর ধরে থাকা মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর চাপ রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও প্রত্যাবাসনের পথকে কঠিন করে রেখেছে।
তাই আমার চোখে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক কাজ হলো, শুধু বক্তব্য দেয়া নয়, একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপের কাঠামো তৈরি করা। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং মিয়ানমার সব পক্ষকে একই কূটনৈতিক সমীকরণে আনা ছাড়া এই সংকটের সমাধান কঠিন।
ওয়াল স্ট্রিট থেকে বিনিয়োগের বার্তা: প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনীতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিশেষ করে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান, সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের দরকার বিনিয়োগ। দরকার নতুন শিল্প। দরকার কর্মসংস্থান। দরকার প্রযুক্তি। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীকে শুধু বাংলাদেশের সম্ভাবনার গল্প বললে হবে না। তারা জানতে চাইবেন, ব্যবসা করতে কতো সময় লাগে? বিদ্যুৎ কতোটা নির্ভরযোগ্য? করব্যবস্থা কেমন? মুনাফা ফেরত নেয়া কতোটা সহজ? জমি পাওয়া যায় কি? আদালতে বিরোধ হলে কতো দ্রুত সমাধান হয়? অর্থাৎ বিনিয়োগের জন্য কূটনৈতিক দরজা খোলা দরকার, কিন্তু দরজার ভেতরে পরিবেশ তৈরি করাও দরকার।
নিউ ইয়র্কে সেই দরজা খোলার চেষ্টা হয়েছে। এখন ঢাকায় কাজ হলো বিনিয়োগকারীকে ভেতরে আনার মতো পরিবেশ তৈরি করা।
নিউ ইয়র্ক সফরের সবচেয়ে আলোচিত অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর একটি ছিল বিমানের বহর সম্প্রসারণ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১১টি অতিরিক্ত বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য চুক্তি করেছে বলে প্রতিবেদন এসেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ বিমান রয়েছে। একইসঙ্গে ১০টি এয়ারবাস কেনার বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। অর্থাৎ বিতর্কটি কেবল বোয়িং বনাম এয়ারবাস নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত বাংলাদেশের জন্য কোন সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক? কোন বিমান কোন রুটে লাভজনক? জ্বালানি ব্যয় কতো? রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কতো? পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ ব্যয় কতো? স্পেয়ার পার্টস ব্যবস্থাপনা কতোটা সহজ? অর্থায়নের শর্ত কী? বিমানগুলো কোন সময়ে হাতে আসবে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই বিমানগুলো লাভজনকভাবে পরিচালনা করার মতো রুট ও ব্যবস্থাপনা কি বিমানের আছে? কারণ বিমান কেনা সহজ। বিমান লাভজনকভাবে চালানো কঠিন। তাই এয়ারবাস বা বোয়িং যে সিদ্ধান্তই হোক, সেটি বাংলাদেশের প্রয়োজন, যাত্রী, রুট, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ভিত্তিতে হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বাইরে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের আরেকটি চিত্রও আমি দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে তাকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি ছিল। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ২২শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর পরও প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল দৃশ্যমান। একইসঙ্গে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও স্লোগানের ঘটনাও সামনে আসে। এ দৃশ্য নতুন নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসেও দৃশ্যমান। মতভেদ থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। প্রতিবাদ থাকবে, স্লোগান থাকবে, সরকারের সমর্থন থাকবে। বিরোধিতাও থাকবে। কিন্তু মতপ্রকাশ যখন ব্যক্তিগত কটূক্তি বা উত্তেজনায় গড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে- আমরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তুলে ধরছি? ২৪শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ঘিরে একটি ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে। প্রকাশিত ভিডিওতে একদল বাংলাদেশি প্রবাসীকে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়। প্রতিবেদনে তাকে ‘বাংলাদেশি সন্ত্রাসী’ ও ‘প্রতারক’ ধরনের শব্দে কটূক্তি করার দাবি করা হয়েছে। ভিডিওতে হাজ্জাজকে শান্ত থাকতে দেখা যায় এবং তিনি প্রকাশ্য বাদানুবাদে জড়াননি। তবে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এই ঘটনাকে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখার চেয়ে আমি অন্যভাবে দেখি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেমন দেখায়, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবাদ অবশ্যই অধিকার। কঠিন প্রশ্ন করাও অধিকার। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা উত্তেজনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে না। বরং দেশের বাইরে এমন দৃশ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনেরই একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। নিউ ইয়র্ক সফর ঘিরে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও সংবাদ পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি কে এম ওয়াহিদুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্ন থামাতে বললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় প্রশ্নোত্তর, হট্টগোল ও সংবাদ পরিবেশনের ধরন নিয়ে অভিযোগ ও নানা আলোচনা শুরু হয়।
বিমানের বহর সম্প্রসারণে বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানানোর পর আমি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাই। ২৫শে সেপ্টেম্বর রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্স থেকে আসা সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রশ্ন করি বোয়িংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার কি এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার কথা ভাবছে? এ বিষয়ে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত আছে কিনা? জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের এয়ারবাসও প্রয়োজন।’ তার এই বক্তব্যে এয়ারবাসের উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এলেও, কবে কেনা হবে? এসব বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিনও উপস্থিত ছিলেন।
এখানে আমার কাছে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাছে সাংবাদিকের প্রশ্ন কখনো কখনো অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন গণতন্ত্রেরই অংশ। বোয়িং, এয়ারবাস, বিনিয়োগ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রশ্ন- যে প্রশ্নই হোক, উত্তর দেয়ার সর্বোত্তম পথ হলো তথ্য। ভুল তথ্য থাকলে সংশোধন করা যায়। অসত্য দাবি থাকলে নথি দেখানো যায়। প্রশ্নের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হলে তার জবাবও রাজনৈতিকভাবে দেয়া যায়। কিন্তু প্রশ্নকেই সমস্যা হিসেবে দেখলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ধারণাটি দুর্বল হয়।
বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলে, তখন সংবাদ সম্মেলনও সেই মূল্যবোধের পরীক্ষার একটি ছোট মঞ্চ।
জাতিসংঘের মঞ্চে শুধু বাংলাদেশের বক্তব্য নয়, অন্যান্য বিশ্বনেতার বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আন্তর্জাতিক আইন, শান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয়ের সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। দু’টি বক্তব্যের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা আছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জলবায়ু ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমানায় আটকে নেই। আমাদের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক। আমাদের শ্রমবাজার আন্তর্জাতিক। আমাদের জলবায়ু ঝুঁকি আন্তর্জাতিক। আমাদের রোহিঙ্গা সংকটও আন্তর্জাতিক। তাই বাংলাদেশের কূটনীতিও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে এগোতে হবে।
তাহলে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কী পেলো? এখন ফিরে আসি মূল প্রশ্নে। নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে- এটি বলা যায়। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটকে আবার উচ্চপর্যায়ে আনা হয়েছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি সামনে এসেছে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, জনশক্তি, জ্বালানি ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিমান পরিবহন খাতেও বড় সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এগুলো এখনো মূলত সুযোগ, প্রতিশ্রুতি ও প্রক্রিয়া। চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়। সেই প্রাপ্তি নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নে।
প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। তার পাঁচদিনের সফর শেষ হয়েছে। এখন আর নিউ ইয়র্ক নেই। নেই জাতিসংঘের বিশাল হল। নেই কূটনৈতিক করমর্দনের ক্যামেরা। আছে ঢাকা। আছে প্রশাসন। আছে অর্থনীতি। আছে মানুষের প্রত্যাশা। এখন সরকারকে দেখাতে হবে, ৩-আর শুধু বক্তৃতার শব্দ নয়; বাস্তব রাষ্ট্রনীতি। দেখাতে হবে, ফ্যামিলি কার্ড মানুষের হাতে পৌঁছায়। দেখাতে হবে, কৃষক কার্ড কৃষকের কাজে লাগে। দেখাতে হবে, স্বাস্থ্যকার্ড স্বাস্থ্যসেবা সহজ করে। দেখাতে হবে, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সত্যিই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছে। দেখাতে হবে, বিমান কেনার সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক পছন্দ নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সিদ্ধান্ত। দেখাতে হবে, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থনকে বাস্তব কূটনৈতিক চাপে পরিণত করা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির যে কথা বলা হয়, দেশের ভেতরেও তার প্রতিফলন রয়েছে।
নিউ ইয়র্কে আমি যা দেখেছি, তার মধ্যে বাংলাদেশের দু’টি ছবি পাশাপাশি ছিল। একটি ছবি জাতিসংঘের মঞ্চের। সেখানে বাংলাদেশ তার স্বার্থের কথা বলছে। নতুন রাষ্ট্রচিন্তার কথা বলছে। বিনিয়োগ চাইছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার চাইছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চাইছে। বিশ্বের সঙ্গে অংশীদারিত্ব চাইছে।
অন্য ছবিটি নিউ ইয়র্কের রাস্তায়। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে। উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে। দু’টি ছবি পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং একই বাংলাদেশের দুই বাস্তবতা। একটি বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজের নতুন পরিচয় তুলে ধরতে চায়। আরেকটি বাংলাদেশ নিজের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। তাই আমার কাছে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘সাফল্য’ নয়। শব্দটি হলো, জবাবদিহি।
নিউ ইয়র্কে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার জবাব দিতে হবে ঢাকায়। যে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে, তার ফল দেখতে হবে কারখানায়। যে কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, তার ফল দেখতে হবে তরুণের হাতে। যে জলবায়ু ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে, তার ফল দেখতে হবে নদীভাঙা মানুষের জীবনে। যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে, তার ফল দেখতে হবে কূটনৈতিক অগ্রগতিতে। আর যে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে, তার প্রমাণ দেখতে হবে সরকারের আচরণে। এখন সময় ঢাকায় সেই কথার হিসাব দেয়ার। কারণ একটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা শুধু তার নেতার বক্তৃতায় তৈরি হয় না। তৈরি হয় তার প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত এই সফরের ইতিহাস লেখা হবে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ ভবনে নয়। লেখা হবে ঢাকার রাস্তায়, গ্রামের মাঠে, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে, কারখানায়, বিমানবন্দরে, ব্যাংকে, হাসপাতালে এবং সাধারণ মানুষের ঘরে। নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কী বলেছে, তা আমরা শুনেছি। এখন দেখতে হবে, বাংলাদেশ কী করতে পারে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com