কলকাতার চিঠি

দিশাহারা মমতা

পরিতোষ পাল | মতামত
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
দিশাহারা মমতা

এক সময় অগ্নিকন্যা হিসেবে তাকে অভিহিত করা হতো। বিরোধী নেত্রী হিসেবে আগুনের গোলায় শাসক দলকে ছত্রভঙ্গ করেছেন বারে বারে। শুধু তাই নয়, তার বিধ্বংসী আন্দোলনের ধাক্কায় ৩৪ বছরের বাম শাসনের শিকড় উপড়ে গিয়েছিল। আর মাথা তুলতে পারেনি বাম দলগুলো।  আর তারপর ১৫ বছর ধরে তিনি দাপটে রাজ্য শাসন করেছেন। সব ব্যাপারে তার কথাই ছিল শেষ কথা। 
 

সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ গৃহবন্দি। কথাটা তিনি নিজেই বলেছেন। গত ৫ মাসে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তার দিশাহারা অবস্থা। নানাভাবে চেষ্টা করেছেন ঘুরে দাঁড়তে কিন্তু সফল হন নি। আর তার  এখন ভরসা বিচারব্যবস্থা। জনগণের আস্থা ছেড়ে বিচারব্যবস্থায় তিনি আস্থা রেখেছেন। 
 

ভারতের ইতিহাসে বহু রাজনীতিবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে দলের ভাঙনের মুখে পড়েছেন। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং সগৌরবে ক্ষমতায় ফিরেছেন। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পারবেন কি সগৌরবে জনতার দরবারে ফিরে আসতে? আসলে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার পরাজয় যে এমন ভয়াবহ হবে সেটা তিনি নিজেও ভাবতে পারেন নি। বরং তিনি বারে বারে বলেছেন, আগের চেয়ে বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবেন। কিন্তু বিজেপি’র সাজানো ঘুঁটির সামনে তিনি পর্যুদস্তই হন নি তাকে দলের মধ্যে ভাঙনের মুখে পড়তে হয়েছে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়েছে। আর মমতার দল পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। এখন তারা মমতা ছাড়া। 
 

অবশ্য দলের মধ্যে ভাঙনের বীজ মমতা নিজেই বপন করেছিলেন তার শাসন কালের মাঝামাঝি সময়ে। তিনি তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের মধ্যে যেদিন থেকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিলেন সেদিন থেকে দলের মধ্যে চোরাস্রোত বইতে শুরু করেছিল। আজকে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই শুভেন্দু অধিকারী সেদিন ছিলেন দলের মমতার পরই তার অবস্থান। কিন্তু মমতা অভিষেককে দলে জায়গা পাকা করে দিতে নানাবিধ উদ্যোগ নেয়ার আঁচ পেয়েই শুভেন্দু মমতাকে ছেড়ে চলে এসেছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। সেদিন থেকে শুভেন্দু মমতাকে উচিত শিক্ষা দিতে সক্রিয় হয়েছেন। কিন্তু ততদিনে মমতা ভাইপো স্নেহে প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েন। আর তাই শুভেন্দু চলে যাওয়াকে তিনি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন নি বা চান নি। পিসীর প্রশ্রয়ে অভিষেক দিনে দিনে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। দলের নীতিনির্ধারণেই তার ভূমিকা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই অভিষেক দলের মধ্যে নানভাবে ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন অহংকারী ও স্বৈরাচারী। তাই দলের যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা এক সময় মমতার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদেরও অভিষেক অবজ্ঞা করতে শুরু করেছিলেন। আর দলের অন্যান্য নেতারা ছিলেন অভিষেকের কাছে অচ্ছুৎ। 

 

এরই মাঝে ভোট কুশলি প্রশান্ত কিশোর ও পরবর্তী সময়ে প্রতীক জৈনকে দলের অনেকটা দায়িত্ব দিয়ে অভিষেক ক্যামাক স্ট্রিটে অফিস তৈরি করে করপোরেট ঢঙে দল পরিচালনা করতে শুরু করেছিলেন। মমতা সব বুঝেও আপাত সাফল্যের আশায় সব মেনে দিয়েছিলেন। বরং তার ও ভাইপোর হাত দরেই রাজ্যে জাঁকিয়ে বসেছিল দুর্নীতি। সিন্ডিকেট ব্যবসা, বালি ও কয়লা চুরি এমনকি চাকরি চুরিতেও জড়িয়ে পড়েছিল দলীয় নেতারা। এক সময় মমতাকে বলতে শোনা গিয়েছিল যা কামাবি তার ২৫ শতাংশ অন্ত লেকে দিবি। আর এটাই ধ্রুব মনে করে দলের ছোট-বড় নেতারা সব রকম চুরিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে দলের দুর্নীতি এক প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছিল। এমনকি যে ভোট পরামর্শক সংস্থাকে দিয়ে সব স্তরে প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে নেতাদের কর্তৃত্ব নির্ধারণ করেছিলেন তারাও জড়িয়ে পড়েছিল অর্থের বিনিময়ে সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে। এভাবেই দলের মধ্যে আসতে শুরু করেছিল কোটি কোটি রুপি। দলের ভাঁড়ার পরিপুষ্ট হচ্ছে দেখে মমতাও খুশি ছিলেন। কিন্তু এইসব কর্মকাণ্ডকে ভাতা ও অনুদানের নানাবিধ প্রকল্পের মাধ্যমে  চাপা দেয়ার চেষ্টা হলেও তা এক সময় ক্ষোভের ধিকিধিকি আগুনকে নেভাতে পারেনি। 
 

জনগণের মধ্যেকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সম্বল করেই বিজেপি মাঠে নেমেছিল। মমতার এক সময়ের লেফটেন্যান্ট শুভেন্দু দলের মধ্যকার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত থাকার ফলে আঘাত করতে শুরু করেছিলেন ইস্যু ধরে ধরে। তবে তখনো পর্যন্ত মমতার জন সমর্থনে ভাটা না পড়লেও দলের মধ্যেও যে অভিষেককে নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল সেটাই নির্বাচনে পরাজয়ের পরে বিস্ফোরণের আকার ধারণ করে। নির্বাচনে হেরে যাবার পর অভিষেকের সমালোচনায় সকলে মুখ খুলতে শুরু করলেও প্রথম জনপ্রতিনিধিদের সভায় যখন মমতা সকলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিষেককে স্যালুট জানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন সেদিনই সকলের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। আর তার কয়েকদিনের মধ্যে দলে ভাঙন শুরু হয়। এক সময়ে সিপিআইএমের তরুণ নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের মধ্যে প্রথম মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। দলের নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রথমে ৫৮ জন ও পরে ৬৫ জন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখান। দিল্লিতেও সাংসদদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। মমতার একসময়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কাকলি ঘোষদস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জন সাংসদ মমতাকে ছেড়ে চলে আসার ঘোষণা দেন। এমকি দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও যোগ দেন বিদ্রোহী শিবিরে। পরবর্তী সময়ে এরা সকলেই বিজেপি’র পরামর্শে যোগ দেন অনামী দল  এনসিপিআইয়ে। 

 

রাজ্যে বিদ্রোহী বিধায়করা মমতাকে উপদেষ্টা করে নতুন ভাবে চলার কথা বললেও মমতার অভিষেক নির্ভরতা বুঝতে পেরে সকলেই আলাদাভাবে বৈঠক করে দলের নতুন সংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেন। মমতা এই সময়ে অনেকটা অসহায়ের মতো নতুন করে কমিটি তৈরি করার ঘোষণা দিয়েছিলেন একাধিকবার। প্রত্যেকবারই যাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাদের অনেকে দায়িত্ব ছেড়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। একসময় মমতা যাকে অনেকটা নির্ভর করতেন সেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও দলের রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব ছেড়ে নাম লেখান ঋতব্রত শিবিরে। আর এভাবেই মমতাকে ছেঁটে বিদ্রোহীরা সাবেক কৃষিমন্ত্রী অরুপ রায়কে সভাপতি করে নতুন দলের কর্মসমিতি তৈরি করেন। এরই মধ্যে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দাবি জানিয়েও মমতা হেরে যান। বিধানসভার স্পিকার ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেন। এরপর আদালতে গিয়েও মমতা কোনো সুরাহা পান নি। আবার আসল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি জানিয়ে ঋতব্রত গোষ্ঠী নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানালে মমতা আরও বিপাকে পড়ে যান। তিনি আদালতে ও নির্বাচন কমিশনে বারে বারে বিরোধ মীমাংসার দাবি জানান। কিন্তু নির্বাচন কমিশন গোটা বিষয়টিকে গভীর  পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। বরং রাজ্যের দুই উপনির্বাচনের আবহে মমতার দলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করে নতুন নাম ও প্রতীক নিতে বাধ্য করেছে। নিজের হাতে তৈরি দল ও নিজের হাতে আঁকা ঘাসের উপর জোড়া ফুল প্রতীক হারিয়ে মমতা একেবারেই হতাশ হয়েছেন। 
 

দলের উঠে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই দেখে এখন মমতা সমাজমাধ্যমকেই আশ্রয় করেছেন। যে জনগণের ব্যাপক সমর্থনে তিনি এক সময় আপ্লুত ছিলেন তিনি এখন রাস্তায় নামতেও সাহস পাচ্ছেন না। দু’ একবার বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে যেভাবে পাল্টা বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন তারপর থেকে আর রাস্তায় বেরোনোর সাহস দেখাতে পারছেন না। দলের নেতাদের অধিকাংশও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নয়তো পুরনো বহুবিধ পাপের দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এদের সকলের বিরুদ্ধে জোর করে জমি দখল, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ এমন নানা রকমের অভিযোগ রয়েছে। ৭০০ কোটি রুপির ভাঁড়ার সত্ত্বেও দলের অধিকাংশ অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে রয়েছে। মাত্র তিনটি অ্যাকাউন্টের অর্থ দিয়ে দল চালাতে হচ্ছে। তবে স্বাধীনভাবে নয়। আদালতের দেয়া প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে। 
 

সার্বিকভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মমতার পাশে এখন গুটিকয়েক বিধায়ক ও সাংসদ। তবুও মমতা নানা কৌশল নেয়ার চেষ্টা করে আদালতে বা প্রশাসনের হাতে নাকালই হচ্ছেন। আর তাই এখন মমতা কালীঘাটের ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠান্ডাঘরে বসে মোবাইল ঘেঁটেই সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ট্রেড মিলের শরীর চর্চাও তেমনভাবে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আর তাই চোখেমুখে ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে। একসময় যে বাড়িতে দলীয় নেতা ও কর্মীদের ভিড় লেগে থাকতো সেই বাড়ি এখন ধু-ধু ফাঁকা। কয়েকজন নেতা নিয়ম করে মমতার সঙ্গে দেখা করেন ঠিকই কিন্তু কেউ কোনো পথ বাতলাতে পারছেন না। মমতার কাছ থেকেও সঠিক দিশা পাচ্ছেন না। 

 

মতামত'র অন্যান্য খবর