কূটনীতি

গ্রিনল্যান্ড চুক্তি,আর্কটিকে নয়া সমীকরণ

ড. মাহফুজ পারভেজ | মতামত
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
গ্রিনল্যান্ড চুক্তি,আর্কটিকে নয়া সমীকরণ

পৃথিবীর মেরুপ্রান্তের গ্রিনল্যান্ড সহসা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এসে হাজির হয়েছে এবং বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এলাকাটি এক ভূরাজনৈতিক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম অ-মহাদেশীয় দ্বীপ। প্রায় ২১.৬৬ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল ভূখণ্ডের প্রায় ৮১ শতাংশই বরফে ঢাকা। অথচ ২০২৬ সালের ১লা জুলাই সেখানে বসবাস করছিল মাত্র ৫৬,৯৪৫ জন মানুষ। ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার অংশ হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি ডেনমার্কের রাজ্যের স্বশাসিত অঞ্চল। এর রাজধানী নুক। অধিকাংশ মানুষ বরফমুক্ত উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। মাছ ধরা ও সামুদ্রিক সম্পদ দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব শুধু তার আয়তন বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নয়। এটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিকের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং উত্তর মেরুর কাছাকাছি হওয়ায় এর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ছোট জনসংখ্যার এই বিশাল বরফভূমি আজ জলবায়ু পরিবর্তন, খনিজ সম্পদ, আর্কটিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রিনল্যান্ড তাই শুধু বরফের দ্বীপ নয়-এটি ভবিষ্যৎ আর্কটিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। 
 

বরফের দ্বীপ কেন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে

 

গ্রিনল্যান্ড-বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ, যার ৮০ শতাংশের বেশি বরফে ঢাকা হলেও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রধানত তিনটি কারণে: (১) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন সমুদ্রপথ উন্মোচন, (২) বিপুল খনিজ সম্পদ, এবং (৩) আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক গুরুত্ব। সমপ্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তিনি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে “নিরাপত্তার স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ” দেবে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে দ্বীপে “বড় সামরিক উপস্থিতি” গড়ে তোলা শুরু করবে। এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন এবং বিরল মৃত্তিকা সম্পদের ভূকৌশল-সবকিছু নতুন মাত্রা পেয়েছে।

 

চুক্তির পটভূমি: ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড আগ্রহের ইতিহাস
 

এই চুক্তি হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দাভোসে ভাষণ দেয়ার সময় ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড “কিনে নেয়ার” বা “দখল করার” ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। এই বক্তব্য ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরে একটি সংকট তৈরি হয়। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন তখন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন-গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেনও জানিয়েছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবেন। এরপর কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন চলে। ট্রাম্প প্রথমে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। পরে দাভোসে বলেছিলেন, তিনি “শক্তি ব্যবহার করবেন না” এবং ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে “ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামো” প্রতিষ্ঠা করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, “এখন থেকে কোনো মার্কিন প্রতিপক্ষ গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে না, সামরিক উপস্থিতি রাখতে পারবে না, বা সংবেদনশীল বিনিয়োগ করতে পারবে না-আমাদের স্পষ্ট লিখিত অনুমতি ছাড়া।”
চুক্তির মূল বিষয়বস্তু
 

চুক্তির মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ-
 

প্রথমত, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে “নিরাপত্তার স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ” দেবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়-এই নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে অধিকার রয়েছে তার চেয়ে কতোটা বেশি?
দ্বিতীয়ত, সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে “বড় সামরিক উপস্থিতি” গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। দ্বীপটির আর্কটিক নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।
 

তৃতীয়ত, বিরল মৃত্তিকা ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, মার্কিন লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো প্রতিপক্ষ গ্রিনল্যান্ডে সংবেদনশীল বিনিয়োগ করতে পারবে না। এটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের বিরল মৃত্তিকা সরবরাহের ওপর প্রায় একতরফা নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে। তবে দ্বীপের বৈরী জলবায়ু, সীমিত খনন অবকাঠামো এবং স্থানীয় বিরোধিতার কারণে দ্রুত চুক্তি করা কঠিন হতে পারে।
 

চতুর্থত, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। ফ্রেডেরিকসেন বলেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ড ও তার জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে স্বীকৃতি দেয়। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি “আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে আমাদের অভিন্ন নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং তাই এটি ন্যাটো ও ইউরোপের জন্যও চমৎকার।”
 

দ্বন্দ্ব: কে নিয়ন্ত্রণ করবে আর্কটিক?
 

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-ট্রাম্পের দাবি এবং ডেনমার্কের ব্যাখ্যার মধ্যে ব্যবধান। ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ পাবে। অন্যদিকে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন সমপ্রচার সংস্থা ঞঠ২-কে বলেছেন, “বৃহৎ পরিসরে এটি ন্যাটোই হবে-যারা আর্কটিকের দেখভাল করবে।” এই ব্যবধান তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো-যুক্তরাষ্ট্র চায় গ্রিনল্যান্ডে একতরফা নিয়ন্ত্রণ, অথবা অন্তত প্রাধান্য; ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড চায় এই নিয়ন্ত্রণ ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যে থাকুক। এই ব্যবধান ভবিষ্যতে কূটনৈতিক টানাপড়েনের কারণ হতে পারে।
 

কৌশলগত গুরুত্ব: কেন গ্রিনল্যান্ড?
 

গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এখানে পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা যায়-
প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন সমুদ্রপথ। গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্কটিক মহাসাগরে নতুন নৌপথ উন্মোচিত হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম প্যাসেজ এবং উত্তর সমুদ্রপথ (ঘড়ৎঃযবৎহ ঝবধ জড়ঁঃব) এখন আরও অ্যাক্সেসযোগ্য হয়ে উঠছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে এই পথগুলো সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এই নতুন সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বিরল মৃত্তিকা ও খনিজ সম্পদ। গ্রিনল্যান্ডে বিরল মৃত্তিকা, ইউরেনিয়াম, লোহা, সোনা, তেল ও গ্যাসের বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি-বিশেষ করে ইলেকট্রিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, স্মার্টফোন ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম-উৎপাদনে বিরল মৃত্তিকার চাহিদা ক্রমবর্ধমান। চীন বিরল মৃত্তিকা বাজারে প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে, তাই যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প সরবরাহের সন্ধানে রয়েছে।
 

তৃতীয়ত, সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা। গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে একটি কৌশলগত সেতু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে এই দ্বীপের সামরিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বর্তমানে রাশিয়া ও চীনের আর্কটিক কর্তৃত্ব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ।
 

চতুর্থত, পিটুফিক স্পেস বেস। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫১ সাল থেকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে-যা বর্তমানে পিটুফিক স্পেস বেস নামে পরিচিত। এই ঘাঁটি মহাকাশ নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা এবং আর্কটিক অপারেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
 

পঞ্চমত, চীন-রাশিয়ার আর্কটিক প্রাধান্য হ্রাস। চীন নিজেকে “নিয়ার-আর্কটিক” রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং আর্কটিক কাউন্সিলে পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছে। রাশিয়া আর্কটিক উপকূল বরাবর সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদার করতে চাইছে।
 

ন্যাটোর অভ্যন্তরে টানাপড়েন
 

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি ন্যাটোর অভ্যন্তরে গভীর টানাপড়েন তৈরি করেছে। ডেনমার্ক ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার মিত্র ডেনমার্কের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়, তবে এটি জোটের মূল ভিত্তি-পারস্পরিক নির্ভরতা ও আস্থা-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
 

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হুমকি যখন আসে, তখন ইউরোপে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট করে দেন-গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখেন। বর্তমান চুক্তিটি সেই সংকটের একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে-কিন্তু আস্থার ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য-‘‘ন্যাটোই আর্কটিকের দেখভাল করবে”-এটি স্পষ্ট বার্তা যে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের 

একতরফা নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে রাজি নয়।
 

বিরল মৃত্তিকা বাজার: অর্থনৈতিক প্রভাব
 

চুক্তির ঘোষণার পর গ্রিনল্যান্ড-সংশ্লিষ্ট বিরল মৃত্তিকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার মূল্য সোমবার লাফিয়ে বাড়ে। কারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন-যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। গ্রিনল্যান্ডের বৈরী জলবায়ু, সীমিত অবকাঠামো, কঠিন ভূগোল এবং স্থানীয় পরিবেশগত বিরোধিতা খনন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় ইনুইট সমপ্রদায় ইতিমধ্যে খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
 

তাছাড়া, বিরল মৃত্তিকা খনন ও প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং ব্যয়বহুল। চীনের বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াকরণে যে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে, তা অর্জন করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ককে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করতে হবে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থান
 

এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো-গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব এবং তার জনগণের ইচ্ছা। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ২০০৯ সালের স্ব-শাসন আইন অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব পার্লামেন্ট ও সরকার রয়েছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক দায়িত্ব ডেনমার্কের হাতে থাকলেও, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন।
 

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেন চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন-গ্রিনল্যান্ড কার্যত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হবে, আর স্থানীয় জনগণ ও তাদের অধিকার সেখানে গৌণ হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত
 

এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময় বেছে নেয়া হয়েছে-জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে। বিশ্ব নেতারা নিউ ইয়র্কে সমবেত হচ্ছেন, যেখানে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র  চুক্তি স্বাক্ষর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
 

এই প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং আর্কটিক শাসনব্যবস্থার একটি পরীক্ষা। জাতিসংঘের চার্টার অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অপর রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া দখল করা বৈধ নয়। এই চুক্তি যদি সত্যিই গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু যদি এটি কার্যত একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্বেগের কারণ হবে।
 

বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
 

গ্রিনল্যান্ড চুক্তি বাংলাদেশের জন্য দূরের ঘটনা মনে হলেও এর কয়েকটি পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে-
প্রথমত, বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ শৃঙ্খল। বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স শিল্প বিরল মৃত্তিকা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরল মৃত্তিকা প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক সরবরাহ ও মূল্যে প্রভাব ফেলবে, যা বাংলাদেশের শিল্পে প্রতিফলিত হবে।
 

দ্বিতীয়ত, আর্কটিক সমুদ্রপথ। নতুন আর্কটিক সমুদ্রপথ উন্মোচিত হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য-বিশেষ করে পোশাক শিল্প-নতুন বাণিজ্যপথ ও সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, মহাশক্তির প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়ার আর্কটিক প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করবে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে বাংলাদেশকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে হবে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাওয়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে-যা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সরাসরি হুমকি। গ্রিনল্যান্ডের ভাগ্য বাংলাদেশের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত।
 

বরফের নিচে লুকানো ভূরাজনীতি
 

গ্রিনল্যান্ড চুক্তি আর্কটিক অঞ্চলে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে; ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চাইছে; আর চীন ও রাশিয়া আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে।
 

এই চুক্তি কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কূটনৈতিক বিজয়? নাকি এটি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের আরও অবক্ষয়ের সূচনা? নাকি এটি আর্কটিক শাসনব্যবস্থার একটি নতুন মডেল?
 

উত্তর নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর
 

চুক্তির সঠিক ব্যাখ্যা-যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিয়ন্ত্রণ নাকি ন্যাটোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা; গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সার্বভৌমত্ব ও পরিবেশগত স্বার্থ কতোটা সম্মানিত হবে; এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো-চুক্তিটি জাতিসংঘ চার্টার ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে কিনা।
 

এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করছে আগামী দিনের রাজনীতি, যা বরফের নিচে লুকিয়ে আছে ভূরাজনীতির এক নতুন অধ্যায় হিসেবে। সেই অধ্যায়ের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কেবল আর্কটিকের নয়; সমগ্র বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। 
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন গ্রিনল্যান্ডে নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে দু’টি নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও সংস্কার করতে পারবে, পিটুফিক স্পেস বেস সমপ্রসারণের সুযোগ পাবে, সারা দ্বীপ ও আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন সামরিক বিমান ও জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার পাবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশকে-বিশেষত রাশিয়া বা চীনকে-সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা কৌশলগত খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হবে না, যা কার্যত আর্কটিক অঞ্চলে মার্কিন ভেটো ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবে; তবে চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে-কোনো ভূখণ্ড হস্তান্তর হয়নি-এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সংসদে অনুমোদনের পর এটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।
 

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

 

মতামত'র অন্যান্য খবর