ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ কীভাবে একটি সরকারকে উৎখাত করেছিল? শেখ হাসিনার সঙ্গে কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন দুই ভারতীয় এবং এক বাংলাদেশি সাংবাদিক। তাদের যৌথ প্রয়াসে প্রকাশিত হয়েছে ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব আনফিনিশ্ড রেভল্যুশন’ নামে ২৭৫ পৃষ্ঠার একটি বই। দিল্লির একটি বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বইটি। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া ফেলেছে বইটির বিষয়বস্তু। রয়েছে নানা অজানা কাহিনী।
বইটির অন্যতম লেখক দীপ হালদারের সঙ্গে হঠাৎ দেখা কলকাতায়। দীপ কলকাতার ছেলে হলেও দিল্লিতেই থাকেন। এক সময় ইন্ডিয়া টুডের এক্সিকিউটিভ এডিটর ছিলেন। বর্তমানে দ্য প্রিন্ট অনলাইন নিউজ পোর্টালের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর। দীপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর একজন নিয়মিত বিশ্লেষক।
দীপের অনুরোধে দক্ষিণ কলকাতার একটি ক্যাফেতে কফির কাপে আড্ডা হলো। বই লেখার প্রেক্ষাপট, বইয়ের নামকরণ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে এক ঘণ্টা পেরিয়ে যায় তা খেয়ালও করিনি। কথা শুরু হয়েছিল বইটির নামকরণ নিয়ে। দীপের কথায়, আসলে এই নামকরণের বিষয়টি আমার এক কাশ্মীরি বন্ধুর কাছ থেকে এসেছিল। নামটি নিয়ে অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছেন জানি। কিন্তু ইনশাআল্লাহ অর্থ তো আল্লাহ বা ঈশ্বরের ইচ্ছা।
বইটি রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি একটি গল্প বলেন। বাংলাদেশি সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম খোকন ইন্ডিয়া টুডের ঢাকা সংবাদদাতা ছিলেন। আমিও ছিলাম ইন্ডিয়া টুডেতে। সেই শহিদুলের কাছ থেকে একটি ফোন পেয়ে চমকে উঠি তার করুণ আর্তিতে। তার কিছু লেখা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় এবং তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেই কাহিনী শোনার পর আমরা (আমি, জয়দীপ মজুমদার ও শহিদুল হাসান খোকন) বইটি লেখার কথা ভাবি। খোকন বইয়ের ভূমিকাতেও তার জীবনের ঝুঁকি এবং পালিয়ে আসার লড়াইয়ের কাহিনীটি লিখেছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়। চাকরির কোটা নিয়ে ছাত্রদের বিক্ষোভ এক গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয় যা লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দেয় এবং পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পর একসময় অপ্রতিরোধ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।
তিনি বলছিলেন, প্রথমেই আমরা ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার মতামত জানার কথা ভাবি। এক সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আসার প্রায় এক বছর কেটে গেছে এবং আমরা জানতে চেয়েছিলাম যে, তিনি ক্ষমতায় না থাকার পর বাংলাদেশ সম্পর্কে তার অনুভূতি কী। হাসিনা জুলাই বিপ্লব এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মতামত আমাদের জানান। আমরা তার মন্ত্রীদের, তার নিরাপত্তা বিভাগের সদস্যদের এবং বাংলাদেশি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি, যারা তার প্রতি অনুগত। তারাই আমার সহ লেখক জয়দীপ মজুমদারকে হাসিনার চলে যাওয়ার দিন তার সরকারি বাসভবনের ভেতরের দৃশ্যগুলো পুনঃনির্মাণ করতে সাহায্য করে। এরপর আমরা হাসিনার রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলি, তারা আমাদের বলেন কেন তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনা ঘটিয়ে আসছেন।
সাংবাদিক দীপ হালদারের মতে, বইটি সেই অসাধারণ বছরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ঘটনাক্রম। এটি বেকারত্ব, কর্তৃত্ববাদ এবং পরিবারতন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান হতাশা কীভাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল তা তুলে ধরেছে। বইটির জন্য একান্ত কথোপকথনে হাসিনা ছাত্রদের ক্রোধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তার পতনের ষড়যন্ত্রের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার উত্তরসূরি নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে দীপ বলেন, এক বছর পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব অভ্যন্তরীণ শান্তি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠেছে। এমনকি দেশটি বিশাল আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে আমরা বইটিতে বলার চেষ্টা করেছি যে, কীভাবে দ্বারপ্রান্তে থাকা একটি জাতি নিজেকে পুনঃনির্ধারণ করার চেষ্টা করে, কেন এই যাত্রাটি বিপদের মধ্যে ডুবে গেছে। বাংলাদেশকে বোঝার জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটিও উঠে এসেছে বইয়ে। তবে আমাদের বই হাসিনা, তার ভুল বা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়।
অমি শুধু স্রোতা হিসেবে শুনছিলাম একটি বইয়ের অন্তরঙ্গ কাহিনী। দীপ এবার চলে আসেন বর্তমান ছাত্র-নেতৃত্বের কথায়। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
আড্ডা এতটাই জমে উঠে যে, এরপরেই দীপ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অনর্গল বলে যান তার মতামত। একজন ভারতীয় সাংবাদিকের দৃষ্টিতে তার সেই মতামত বেশ কৌতূহলী করে আমাকেও। তার মতে, বাংলাদেশ আবারো ২০০৭-২০০৮ সালের মাইনাস টু ফর্মুলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। তাদের দু’জনের ছেলেও দেশে নেই। আওয়ামী লীগ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেন এখনো বাংলাদেশে ফিরে আসছেন না- তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। সবাই জানে, তারেক রহমানের জীবনের হুমকি বাংলাদেশের ভেতর থেকেই রয়েছে, বাইরে থেকে নয়। কিন্তু কেউ এটা বলছে না। বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির উত্থান নিয়ে দীপের মূল্যায়ন, এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে জামায়াত প্রতিষ্ঠান দখল করে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিচার বিভাগ থেকে শিক্ষা, আমলাতন্ত্র থেকে সামরিক বাহিনী, জামায়াতের অনুগামীরা সর্বত্র। গত এক বছরে তারা খুব সুচতুরভাবে এটা করেছে। বিএনপি’র বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য নানা অভিযোগ উঠছে বিএনপি’র কিছু কিছু নেতার বিরুদ্ধে। কল্পনা করুন, তারেককে ৭০০০ বিএনপি কর্মীকে শাস্তি দিতে হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত সবসময় অত্যন্ত সুশৃঙ্খল থেকেছে। বাংলাদেশকে ইসলামবাদের দিকে অর্থাৎ পাকিস্তানের কাছাকাছি এবং কৌশলে ভারত থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
দীপ বলেন, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের আদর্শ হারিয়ে গেছে। যদি বাংলাদেশের আত্মাকে বাঁচাতে হয়, তাহলে বিএনপিকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে। তাদের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বীসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং বাংলাদেশ যে গাড্ডায় পড়েছে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা। দীপ বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে বিএনপিকে সবার সঙ্গেই বসতে হবে। আমাকে এখানেই আড্ডা থামাতে হলো। দুজনই ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এলাম।