সাম্প্রতিক

জোটের রাজনীতিতে অশনিসংকেত

শামীমুল হক | এক্সক্লুসিভ
জানুয়ারী ১০, ২০২৬
জোটের রাজনীতিতে অশনিসংকেত

দীর্ঘ সতের বছর জেঁকে বসা স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। এটা নতুন কোনো খবর নয়। নতুন খবর হলো আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দলগুলো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছে। এখানে স্বৈরাচারী আমলের আভাস পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো-এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? অন্তর্বর্তী সরকার নানা চাপের মধ্যে তাদের সময় পার করছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। দলগুলো থেকেও রয়েছে নানা আবদার। আর সরকারের কাছে যে হারে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দাবি-দাওয়া তা দেখে বুঝা যায় গত ১৭ বছর কিছুই হয়নি। শুধু ডাণ্ডা দিয়ে আন্দোলনকারীদের ঠান্ডা করা হয়েছে। এমনকি ভয়ে কেউ তাদের অধিকার আদায়ের কথাও বলতে পারেনি। আজ দেশ যখন নির্বাচনমুখী তখনো জোট নিয়ে দেন-দরবার চলছে দলগুলোর মধ্যে। জামায়াত এখন ১১ দলীয় জোট নিয়ে মাঠে। কিন্তু এখন তাদের শরিকদের সঙ্গে সিট ভাগাভাগি নিয়ে দেন-দরবার চলছে। জামায়াতের সঙ্গে যোগ দিয়েছে এনসিপি। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের নিয়ে গঠিত এ দলটি শুরুতে বিএনপি’র সঙ্গে জোট করতে দেন-দরবার করেছে। কিন্তু আসন সমঝোতায় বনিবনা না হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধে। এই জোট বাঁধা নিয়ে এনসিপিতে ঘটে বিস্ফোরণ। একাধিক নেতা এনসিপি ছেড়ে চলে যান। অনেকেই আবার এর বিরোধিতা করে নীরব রয়েছে। আবার জামায়াতের সঙ্গে এখনো ইসলামী আন্দোলনের আসন সমঝোতা হয়নি। এ নিয়ে চলছে মন কষাকষি। এরপর বিএনপি’র সাবেক এমপি মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান হুট করে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের হাতে ফুল দিয়ে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। অবশ্য তিনি বলেছেন, জামায়াতে যোগ দিলেও তিনি নির্বাচন করবেন না। সবচেয়ে বড় চমক দেখায় কর্নেল অলি আহমদ। এলডিপি’র প্রধান অলি আহমদ গত ১৭ বছর বিএনপি’র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করে এসেছেন। আসছে নির্বাচনে বিএনপি জোটে থেকেই নির্বাচন করবেন। 

 

এমনটাই কথা ছিল। কিন্তু এলডিপি’র সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি রেদোয়ান আহমেদ হঠাৎ বিএনপিতে যোগ দেন। বিষয়টি কর্নেল অলি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাননি। এলডিপি’র বৈঠকে যোগ দেন রেদোয়ান। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় এলডিপি এককভাবে নির্বাচন করবে। এতে স্বাক্ষরও করেন রেদোয়ান আহমেদ। এরপর আমি একটু আসছি বলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পরে তাকে দেখা যায় বিএনপিতে যোগ দিতে। ওদিকে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও যোগ দেন বিএনপিতে। নির্বাচন ঘিরে এতসব ঘটনা দেশের মানুষকে হতবাক করে দিচ্ছে। আসলে জোট বা সমমনা দলগুলো তাদের প্রধান দলের কাছে যে আসন দাবি করে তা নিয়েই শুরু হয় গণ্ডগোল। এ গণ্ডগোল থেকেই এ জোট থেকে ওই জোটে জাম্প দেয় ছোট দলগুলো। প্রধান দল হিসাব করে জোটের প্রার্থীকে ওই আসনে মনোনয়ন দিলে কতোটুকু রেজাল্ট ঘরে আসবে? তিনি কি পারবেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করতে? ওদিকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে আগামী ২১শে জানুয়ারি। এর আগে ১৯শে জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। ২০শে জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ। এরপরই প্রার্থীরা ছুটবেন প্রতীক হাতে ভোটারদের দরবারে। এখানে বলতে হয় জামায়াতের প্রার্থীরা আরও বহু আগেই তাদের প্রচারণা শুরু করেছেন। তাদের নারী কর্মীরাও ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট চাইছেন। কেন জামায়াতকে ভোট দেবে তাও সবিস্তারে ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছে। জামায়াতের বিউটি হলো- জোট গঠনের পর তাদের ঘোষিত প্রার্থী নিজ থেকেই জোটের শরিকদের আসন ছেড়ে দিচ্ছেন। এমনকি জোটের প্রার্থীকে নিয়ে জনতার দরবারে হাজির হচ্ছেন। এ বিষয়টি তাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু গোলমাল বাধে বিএনপিতে। শরিকদের ছেড়ে দেয়া আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সমমনা দলের প্রার্থীরা। কারণ প্রায় প্রতিটি আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে লড়তে প্রস্তুতি নিয়েছেন। 

 

এ নিয়ে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দ্বারস্থ হয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুর। তিনি তারেক রহমানকে তার আসনের চিত্র তুলে ধরে এর সুরাহার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপিতে যোগ দেয়া রাশেদ খানও একই অভিযোগ জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে। রাশেদ খান ঝিনাইদহ থেকে নির্বাচন করবেন। তার আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী  রয়েছে। এ নিয়ে রাশেদ খান চিন্তিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন হেভিওয়েট দুইজন। একজন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। আরেকজন তরুণ দে। এখানে বিএনপি’র সমর্থন পেয়েছেন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের জুনায়েদ আল হাবিব। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বিএনপি থেকে লড়ছেন ড. রেজা কিবরিয়া। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া। এ দু’জনের সমর্থকদের মধ্যে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। বিএনপি’র উচিত এখনই এর সুষ্ঠু সুরাহা করা। সকলকে কেন্দ্রে ডেকে এনে তাদের সঙ্গে বুঝাপড়া করা। তা না করে বহিষ্কার করে কোনো লাভ হবে না। বরং পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে। 

 

এতে নিজেদেরই ক্ষতি হবে। এদিকে জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও জোটের প্রার্থীদের চাওয়া পাওয়া নিয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে। কেউ কেউ জামায়াত জোট ছাড়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। সিলেটে জামায়াতের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে খেলাফত মজলিসের। খেলাফত চায় দু’টি আসন। তাদের দেয়া হয়েছে একটি। অন্যদিকে জামায়াত বলছে তারা জরিপ চালিয়ে দেখেছেন সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে ৫টিতেই জনপ্রিয়তায় তাদের ধারে কাছে কেউ নেই। তাই তারা এ পাঁচটি আসন নিজেদের জন্য রেখে দেবেন। এ নিয়ে খেলাফত মজলিস অভিমান করে আছেন। ওদিকে সিলেটে জামায়াতের কাছে এনসিপি একটি আসন চেয়েছে। কিন্তু শরিক দলের অন্য নেতারা বলেছেন সিলেটে পাস করার মতো এনসিপি’র কোনো নেতা নেই। নির্বাচনকে ঘিরে এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি অনেক দল ও জোট। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারের নির্বাচন এতটা সহজ হবে না। জোট আর সমমনাদের নিয়ে মূল দল বেকায়দায় থাকবে। শেষ পর্যন্ত কি হয় তা দেখতে আগামী ১৯শে জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। 
 

ওদিকে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্রায় দিনই গুলিতে নিহত হচ্ছে কোনো না কোনো দলের নেতা। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। এসব হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আরও সংঘাতময় হয়ে উঠবে পরিবেশ। তাই এক্ষুণি গোটা দেশকে নিরাপত্তা বলয়ে আনা জরুরি। মনে রাখতে হবে দীর্ঘদিন পর মানুষ তাদের ভোট প্রয়োগ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ নির্বাচনকে কোনোভাবেই কলঙ্কযুক্ত করা যাবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
 

নির্বাচন মানেই হলো ভোটের উৎসব। সব সময় দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পরই এই উৎসব ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। কিন্তু এবার ভোট উৎসবের দেখা নেই এখনো। ভোটাররা অবশ্য আশা করছেন নির্বাচনী প্রচারণার দিন থেকেই সেই উৎসব শুরু হবে। এর আগে দলগুলো তাদের আসন সমঝোতা, বিদ্রোহীদের নিয়ে বসে একটা সমাধানে পৌঁছাতে চেষ্টা করবে। এবার নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জামায়াত জোটের লড়াই হবে। এটা নিশ্চিত বলা যায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী আচরণ মানুষ কখনো ভুলবে না। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নিচ্ছে। অনেক আসনে তাদের প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, জাতীয় পার্টি কি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট নিজেদের ঘরে তুলতে পারবেন? আসলে এসব সময়ই বলে দেবে। এখন প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নির্বাচন কমিশন। 
 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর