জোটের রাজনীতিতে অশনিসংকেতের কথা বলেছিলাম গত সংখ্যায়। সত্যিই তা-ই হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত জোটে বিপর্যয় দেখেছে দেশবাসী। এখনো যার রেশ চলছে। ইসলামী আন্দোলন নিজেরা নির্বাচন করছে। জোট না হওয়ার পেছনে তারা জামায়াতকে দোষারোপ করছে। অন্যদিকে কর্নেল অলি সরাসরি বিএনপিকে আক্রমণ করেছে। ওদিকে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের হ্যাঁ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই হ্যাঁ আর না ভোট নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যে বাহাস চলবে- এটা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। এরই মধ্যে জাপা চেয়ারম্যান সরাসরি না ভোটের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সবাইকে না ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ নিয়ে যখন তর্ক-বিতর্ক তুঙ্গে তখন সামনে আসে ঋণখেলাপি ইস্যু। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সারা দেশ থেকে বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আপিল আবেদন করেন। ইলেকশন কমিশন লাগাতার এসব আপিল আবেদনের শুনানি শুনে কারোটা বাতিল আবার কারোটা মঞ্জুর করেন। কিন্তু সেখানে ঋণখেলাপি নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। ইসি ভবন ঘেরাও হয়। এরই মধ্যে ইসি থেকে কয়েকজন ঋণখেলাপিকে আপিলে টিকিয়ে দেন। তারা নির্বাচন করতে পারবেন। সমস্যা বাধে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বেলায়। আপিলে তাকে ঋণখেলাপির দায়ে তার আবেদন নামঞ্জুর করে ইসি। ফলে তিনি নির্বাচন করার বৈধতা হারান। অবশ্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যান। সেখানেও তাকে বৈধতা দেয়া হয়নি। অর্থাৎ তিনি নির্বাচন করতে পারছেন না। এ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপি’র হাসনাত আবদুল্লাহ। এরই মধ্যে সারা দেশের প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রতীক পেয়ে গেছেন। ২২শে জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে তার প্রচারণা শুরু করেন। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামেন। প্রথম সমাবেশ সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে বুদ্ধিদীপ্ত বয়ান। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যুক্তি সমাবেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এর আগে সিলেটের জামাই হিসেবে তারেক রহমান তার শ্বশুরবাড়িতেও গেছেন। সেখানে সিলেটের দামানকে সিলেটের ঐতিহ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। তারেক রহমানের প্রথম এ সফর ও নির্বাচনী প্রচারণা গোটা সিলেট বিভাগকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কিশোরগঞ্জের ভৈরবসহ আরও কয়েকটি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তব্য শুনেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন তারেক রহমানের বক্তব্য শুনতে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রথম জনসভা শুরু করেন ঢাকা থেকে। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের আসনে হয় এ সমাবেশ। সেখানেও জামায়াত ভোটারদের মন কাড়তে চেষ্টা করেন। তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একদিন পর ২৩শে জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচনী সফর শুরু করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই। টানা ১৮ দিনের সফরে তিনি দেশের সকল বিভাগের উল্লেখযোগ্য জেলা ও আসনে সফর করবেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ উলামায়ে কেরাম, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মীসহ সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হবেন। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে বৃহস্পতিবার হেফাজতের আমীর এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও নায়েবে আমীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়ায় মোবারকবাদ জানান। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী একই বিবৃতিতে দেশের অন্যান্য হকপন্থি দাবিদার সকল ইসলামী দলকে মওদুদীবাদী জোট ত্যাগ করার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমরা হেফাজতের পক্ষ থেকে ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে সহীহ আকিদা বিশ্বাসী ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে ইসলামপন্থিদের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছি। মওদুদীবাদী জামায়াতকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। বাতিলপন্থিদের কারও সঙ্গে জোট না করতে সতর্ক করেছি। তিনি বলেন, মওদুদীবাদী জামায়াতের খপ্পর থেকে বের হয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সঠিক রাজনৈতিক পথচলা তৈরি করতে পারায় বিশেষ মোবারকবাদ জানাই। জামায়াতের সঙ্গে থাকার কারণে এদেশের ইসলামপন্থার বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। পীর সাহেবের সিদ্ধান্তের কারণে সেই ক্ষতির পথ অনেকটাই বন্ধ করবে।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে এখন আকাশে বাতাসে নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ তো প্রশ্ন ছুড়ে দেন আসলেই কী নির্বাচন হবে? আরে সকল প্রক্রিয়া শেষে এখন চলছে প্রচারণা। এ সময় এসে এমন প্রশ্ন কীভাবে মনে আসে? কেন আসে? আবার ভারত থেকে শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে অবৈধ অভিহিত করে সকলকে নির্বাচন বয়কট করার ডাক দিয়েছেন। এ দেশের মানুষ অবশ্য হাসিনার কথাকে এখন আর গুরুত্ব দেয় না। হাসিনা নিজেকে এমন জায়গায় নামিয়ে এনেছেন যে, তিনি এখন আর হিসাবের খাতায় নেই। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে তার অডিও প্রকাশ হয়েছে। যার সবক’টিতেই তিনি প্রতিহিংসার বাণী ছড়িয়েছেন। এতে করে মানুষ তার প্রতি চরম ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ এক/এগারোর নির্বাচনের উদাহরণ টেনে আনেন। বলেন, সে সময় যে পাতানো নির্বাচন হয়েছিল এমন কোনো নির্বাচন হতে যাচ্ছে কিনা? মানুষকে কীভাবে বুঝাবেন এক/এগারো আর বর্তমান সময় এক না। আকাশ পাতাল পার্থক্য। নির্বাচন যথাসময়ে হবে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবেই হবে। তবে লন্ডন থাকাকালীন বিএনপি চেয়ারম্যান যে বলেছিলেন এবারের নির্বাচন কঠিন হবে। পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে এমনটাই মনে হচ্ছে। বিএনপি তার সমমনাদের জন্য বেশক’টি আসন ছেড়েছেন। কিন্তু অনেক আসনেই বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এমন বেশক’টি আসনে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন জোটের প্রার্থীরা।
বাংলাদেশের মানুষ বড্ড বেশি সন্দেহবাতিক। ২১শে জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, এবার ভোট গণনায় কিছুটা দেরি হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকে বিষয়টি জানানো হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখানে শুধুমাত্র তো নির্বাচন হচ্ছে না, সঙ্গে একটা গণভোট হচ্ছে। ফলে দুইটা ভোট গণনাই একসঙ্গে শুরু হবে। এর সঙ্গে আছে পোস্টাল ব্যালট। এ জন্য কিছুক্ষেত্রে ভোট গণনায় কিছুটা দেরি হতে পারে। প্রেস সচিব বলেন, এই বছর অনেক কিছু নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আমরা চাচ্ছি যে, খুব ভালোভাবে ভোটগণনা হোক, সেক্ষেত্রে কিছু বিলম্ব হতে পারে ভোট গণনায়। আর যায় কোথায়? সন্দেহবাতিক মানুষদের মনে সন্দেহ কাজ করছে। কেন দেরি হবে? এখানে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হবে কিনা? ইত্যাদি, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। যেখানে প্রেস সচিব নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেখানে কেন সন্দেহ থাকবে। আর এটা তো বাস্তব। এবার একই সঙ্গে দু’টি ব্যালট এবং পোস্টাল ভোট। সব মিলিয়ে দেরি তো হবেই।
ওদিকে নির্বাচনের দিন ১২ই ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে আগেই। এর সঙ্গে ১১ই ফেব্রুয়ারিও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে আর ১০ই ফেব্রুয়ারি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ছুটি থাকবে। ২২শে জানুয়ারি কেবিনেট বৈঠকে এ ছুটি অনুমোদন করা হয়েছে। নির্বাচনী সকল কাজই প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১৭ দিন। আর প্রচারণা চলবে ১৫ দিন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করে নিতে হবে। এভাবেই চলে যাবে দিন। আসবে ভোটের উৎসব। তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। তাদের মনে অনেক ক্ষোভ। নিশ্চয় এবার তারা ভোট দিয়ে মনের জ্বালা মিটাবেন। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়ী করবেন। পাশাপাশি আগের মতো আর একদিনের বাদশাহ হতে ভোটাররা রাজি নয়। পাঁচ বছরের বাদশাহ হতে চান তারা।