সা ফ ক থা

‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক’- নির্বাচনে

হাসান মামুন | এক্সক্লুসিভ
জানুয়ারী ১০, ২০২৬
‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক’- নির্বাচনে

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে এবং সেটা ঘিরে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ হামলা হওয়ার পর অনেকের মনেই নির্বাচন নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এরই মধ্যে আবার বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে বিপুল গণসংবর্ধনা লাভ করায় জনমনে আস্থা জাগে যে, দেশটি নির্বাচনের দিকে যাবে। মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি। আর বাংলাদেশ বিষয়ে ওয়াকিবহাল দেশি-বিদেশি প্রায় সব মহলে এ ধারণা প্রবল যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপিই ক্ষমতাসীন হবে। গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার মুহূর্ত থেকে তারা আবার নির্বাচন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। এটি বানচালের চেষ্টা এখনো কোনো মহল থেকে থাকলে বিএনপি কোনোভাবেই সেটা সহ্য করবে না। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও অবশেষে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ স্থির হয়েছে, শুধু তা-ই নয়; এবার এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। অবশ্য জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নটি এত প্রবলভাবে উপস্থিত যে, গণভোট কিছুটা আড়ালে চলে গেছে। যারা রাষ্ট্র সংস্কারে সবিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, তারা এ নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। হালে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা গণভোট বিষয়ে প্রচারণা জোরদারের তাগাদা দিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকেও বলা হয়েছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে। রাষ্ট্র সংস্কারে যারা একমত হয়েছে, সেইসব দলের তো এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার সুযোগ নেই। তবে ইশতেহারে যে অবস্থানই নিক, কোনো কোনো দলের সমর্থকরা বেশি করে ‘না’ ভোট দিতে পারেন। এতে না জয়যুক্ত হলেই সংস্কারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে, এ ধারণা ভুল। যারাই ক্ষমতায় আসুক, সংস্কার বিষয়ে তাদের অবস্থান তো সবার জানা। সে অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ মানুষ আশা করবে। সংস্কারের পথেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগোতে হবে। 
 

নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে আর এতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তার নিজের ৩১ দফা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিও কি জোরদার হবে না? সব হিসাবনিকাশ উল্টে দিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে তাদেরকেও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবির মুখে পড়তে হবে। কেননা, জামায়াত ও জোটে তার মিত্র দলগুলো (বিশেষত এনসিপি) বিএনপি’র চাইতেও বেশি করে সংস্কার চাইছিল। বিএনপিকে তারা ‘সংস্কারবিমুখ’ দল বলেও চিত্রিত করতে চাইছিল। এ অবস্থায় সংস্কারের পথে যাত্রার বিষয়ে এক ধরনের আশাবাদ রয়েছে। তবে তার আগে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে হবে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন না হলে না গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, না সংস্কার কিছুই অর্জন করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে দেশ অধিকতর সংকটে নিপতিত হবে। 
 

প্রশ্ন হলো, তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র দাখিলের পরও কি নির্বাচন বানচালের শঙ্কা রয়েছে? এক বা একাধিক মহল কি এখনো নির্বাচন বানচাল করে অন্য লাইনে হাঁটার ফন্দি আঁটছে? এ বিষয়ে নানা কথা বিক্ষিপ্তভাবে শোনা গেলেও তা নিয়ে আলোচনা করা কঠিন। তবে এমন শঙ্কা থাকলেও এক তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের চাপেই তা অনেকখানি কেটে গেছে। রাজধানীতে বিপুল গণসংবর্ধনার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে সরাসরি নির্বাচনের প্রসঙ্গ না এলেও শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ওপর খুবই গুরুত্ব আরোপ করায় দেশের সিংহভাগ মানুষ স্বস্তি অনুভব করছে। একটা অবনতিশীল পরিস্থিতিতে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পেয়ে সেটা লুফে নিয়েছে তারা। এদের সবাই যে, বিএনপি বা সেই জোটভুক্তদের ভোট দেবে, তা নয়। তবে তারা আস্থাশীল হয়েছে গণতন্ত্রে উত্তরণের বিষয়ে। এটি ঘটলে বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। বাড়বে কাজের সুযোগ। দিনের শেষে মানুষ তো একটা কর্মমুখর দেশ দেখতে চায়। ইতিবাচক বাংলাদেশ দেখতে তারা আগ্রহী। 
 

অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষ যে পরিমাণ আস্থা রেখেছিল, তাতে তারা হতাশই হয়েছে বেশি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগহীনতা, নিষ্ক্রিয়তা আর ব্যর্থতাই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যত দিন গেছে, এসব নিয়ে আলোচনাও বেড়েছে। সরকারটির ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বারবার, বিভিন্ন ঘটনায়। সরকার দক্ষিণপন্থি দল ও গোষ্ঠীর প্রভাবে চলছে বলে সমালোচনা বেড়েছে ক’মাস যেতে না যেতেই। দক্ষিণপন্থিরা বিতর্কিত হয়েছে ক্রমে; সরকারও সমালোচিত হয়েছে তাদের প্রশ্রয় দেয়া কিংবা তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকায়। জনজীবনের সংকটও এ সময়ে বেড়েছে। বেড়েছে নিরাপত্তাহীনতার বোধ। শুধু ক্ষমতাচ্যুত পক্ষ নয়; আক্রান্ত হয়েছে বিভিন্ন দুর্বল জনগোষ্ঠী। যদিও বৈষম্য দূরীকরণের অঙ্গীকার সামনে আনা হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার পতনের সময়। বর্তমান শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। অবনতি ঘটেছে দারিদ্র্য পরিস্থিতির। 
 

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেই আর জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হলেই এ পরিস্থিতির অবসান হবে না। তবে নির্বাচিত সরকারকে জাতীয় সংসদে এবং এর বাইরেও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কিছু না কিছু সংস্কার করে বিরোধী দলকে দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখার একটা জায়গা করে দিতে হবে তাদের। যারাই ক্ষমতায় আসুক; গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশটি আর আগের ধারায় পরিচালনা করা যাবে না। পররাষ্ট্রনীতিতেও ‘বাংলাদেশপন্থি’ হতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বিষয়ে অত্যন্ত নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে থাকা ভারতও বলছে, তারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। কাজ তাদের এখনো করতে হচ্ছে ইউনূস সরকারের সঙ্গে। বিশেষত বাণিজ্য করতে হচ্ছে। লাভজনক বিবেচনায় আমরাও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগ হাতছাড়া করছি না। দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়াটাই মূল কথা। এটা বাদ দিয়ে তো কোনো পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণেও একই কথা প্রযোজ্য। 
 

এ সমস্ত কিছু সামনে রেখেই নির্বাচনের দিকে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে হবে বাংলাদেশের মানুষকে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি তারা কোন দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে চায়, সে বিষয়ে জরিপও পরিচালিত হচ্ছে। সবশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে ইচ্ছুক। জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন থাকে। সময়ান্তরে জরিপের ফল বদলে যেতেও দেখা যায়। নির্বাচনের শেষদিকে একটা তরঙ্গ ওঠে আর তাতে বাস্তবতা অনেক সময় বদলে যায়। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ভোটের তফাৎ এত বেশি পরিলক্ষিত যে, তাতে জনমত খুব বেশি বদলাবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত সুবিপুল জানাজার প্রভাব একটি বড় বিষয়। মিডিয়া আর আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অবস্থানও মনে হচ্ছে বিএনপি’র দিকে। দলটির দিকে হেলে আছে দেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে মুক্তবাজার অর্থনীতি বিকাশের পথ করে দেয়া হয়েছিল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারে জোর দিয়েছিলেন তারা। বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণিও এটা জানে। বিএনপি’র ‘মধ্যপন্থার রাজনীতি’ তাদের আকর্ষণ করছে এখনো। 
 

দেশের তরুণ ভোটারদের মনোভাব বোঝা অবশ্য সহজ নয়। বিগত তিনটি নির্বাচন যথাযথভাবে হলে এটা বোঝা সহজ হতো। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যে ধারার ফল হয়েছে, সেটা জাতীয় নির্বাচনে কতোখানি প্রতিফলিত হবে? শিক্ষিত আর স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত তরুণরা অভিন্ন মনোভাব পোষণ করছে, সেটা কিন্তু বলা যাবে না। শিক্ষিত তরুণরা নিজ নিজ পরিবারের লোকদের প্রভাবিত করতে সক্ষম, এটাও বলতে হবে। এ-ও দেখা গেছে, একই ব্যক্তি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে থাকে। নারী ভোটাররা কী মনোভাব পোষণ করছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা তো জনসংখ্যার অর্ধেক; ভোটারেরও অর্ধেক। তারাও অবিভাজ্য সত্তা নয়। তাদের মধ্যে নানামুখী প্রবণতা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এদেশের মানুষ যেকোনো ধরনের উগ্রপন্থার বিরোধী। গণ-অভ্যুত্থানের পর অল্প সময়ে তারা উগ্রপন্থার বিষময় ফলও দেখতে পেয়েছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি কারা বেশি করেছে; সেটাও নিশ্চয় তারা বিচার করে দেখবে। এসব অভিযোগ বিএনপি’র একাংশের বিরুদ্ধেই বেশি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েও তারেক রহমান এটা বন্ধ করতে পারেননি। এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব অবশ্য সরকারের। সেটা তারা কেন নেননি, এর সদুত্তরও দেননি সরকারের মুখপাত্ররা। 
 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এর চাইতে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা কি হতে পারতো? নাকি যে সামাজিক-রাজনৈতিক গঠন বা পরিস্থিতি দেশে বিরাজ করছে, তাতে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক? এ ক্ষেত্রে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শক্তি এবং মাঠে থাকা সব দলের সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও বড় ভূমিকা রেখেছে। এ দুই গোষ্ঠীর পক্ষপাতকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের কারণে নির্বাচন আয়োজনেও অনেক বিলম্ব হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল একটি দক্ষিণপন্থি দল, যাদের অতীত প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে তাদের অবস্থান বারবার নেতিবাচক ফল দিয়েছে বলে এবারো সেটাই হবে, এমনটা অবশ্য বলে দেয়া যায় না। হালে তাদের তরফ থেকে আবার নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার ধরনের কিছু একটা গড়ে তোলার ওপর বক্তব্য রাখা হয়েছে। হাসিনা সরকার পতনের পরও কিন্তু জাতীয় সরকার হয়নি। তেমন কিছু হলে কী অভিজ্ঞতা হতো, সেটাও আমরা জানি না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনই যেমন নির্বাচন; তেমনি নির্বাচনের ফল অনুযায়ী সরকারি ও বিরোধী দল মিলে সংসদ পরিচালনাই গণতন্ত্র বলে স্বীকৃত। আমরা এর অনুসরণই দেখতে চাইবো আগামী নির্বাচনের পর। 
 

ইউনূস সরকার ও তার আমলে গঠিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অবিচল থাকা। কোনো মহল যেন এ পথ থেকে জাতিকে বিচ্যুত করতে না পারে। শেখ হাসিনা গং জাতিকে নির্বাচন থেকে বঞ্চিত করে অবশেষে নিজেদের চরম পতন অনিবার্য করে তুলেছিল। নতুন পরিস্থিতিতে যে নির্বাচন হতে চলেছে, সেটাকে সাফল্যমণ্ডিত করেই আগেকার সেই অপকর্মের জবাব দিতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে এর ফল জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সবাই মেনে নেবে। সে অনুযায়ী দেশ পরিচালনাই প্রত্যাশিত। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ গঠনে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে, যদি সবাই মিলে এটাকে সফল করে তুলতে পারি। সরকার ও ইসি’র ভূমিকা এ ক্ষেত্রে মুখ্য। মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ভূমিকা রয়েছে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায়। জনগণের ইচ্ছায় তারা নিজ নিজ অবস্থান মেনে নেবে, এই বোধ জোরালো হতে হবে দলগুলোর মধ্যে। জনমতের পরোয়া না করে চলার পরিণতি কারও জন্য সুখকর হবে না। 
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর